
শওকত আলী
চাঁদপুরে দলিত সংখ্যালঘুদের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। তারা স্বাধীনতার পূর্বে ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এদেশে নিরাপদে থাকতে পারছেনা। তাদের জানমাল ও জীবনের উপর বারবার হুমকী আসতে থাকে। তাই তারা জীবন বাঁচাতে নিরাপত্তা না পেয়ে এ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া তাদের মা-বোনের ইজ্জতও রক্ষা পচ্ছেনা। এক শ্রেণীর প্রভাবশালী গোষ্ঠি ও ব্যাক্তিরা তাদের লোভের চাহিদা মিঠাচ্ছে এদেশের সংখ্যালঘুদের মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন করে। এদের কাছ থেকে শিশুরা পর্যন্ত রক্ষা পচ্ছেনা বলে অভিযোগ রয়েছে। এরা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্র ছায়ায় থেকে অর্থ ব্যয় করে সমাজের সচেতন মানুষগুলোকে নিজেদের সমর্থনে নিয়ে এ নির্যাতন করে যচ্ছে। এরা সমাজ সভ্যতাকে জিম্মি করে রেখেছে। এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও অভিযোগ করে কোন ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে দলিত ও সংখ্যালঘুরা জানান।
চাঁদপুর শহর ও শহরতলীর দলিত হরিজন সম্প্রদায়ের ও সংখ্যালঘুদের নেতা ও বিভিন্ন নির্যাতিত এবং ভোক্তভোগী মানুষের কাছে গিয়ে তাদের দীর্ঘ অসহায়ত্বের কথা ও দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও ক্ষোভের কথা শুনতে গিয়ে তারা জানান, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা এদেশে শত-শত বছর পূর্ব থেকে বসবাস করে যাচ্ছিল।
কালের পরিবর্তনে জমি জামার দাম বেরে যাওয়া এদেশের প্রভাবশালী ও বিত্তবানরা তাদের পেশিশক্তি ব্যাবহার করে সাধারণ মানুষ সহ সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘর জমি জামা দখল করতে থাকে। তারা দলিত ও সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন ভাবে নির্যাতনও চালায়। তারা জাল দলিল তৈরী করে ও জোড়পূর্বক সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার পায়তারায় লিপ্ত হয়ে পড়ে।
চাঁদপুরের দলিত হরিজনদের মালিকানা জায়গা তেমন না থাকায় তারা সরকারি জায়গা বা পৌরসভার জায়গায় বসবাস করতে থাকে। এ জায়গায় তারা কষ্ঠ স্বিকার ও গাদাগাদি করে বসবাস করছে। তাদের বাসস্থান ও পূর্ণ বাসন সরকার না করায় তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে যাচ্ছে। এছাড়া দলিতদের মধ্যে ঋষি, মনিঋষি, রবিদাস সহ বিভিন্ন বর্ণের লোকদের শত-শত বছর বসবাস যেমন রয়েছে, তেমনি তারা এদেশে তথা চাঁদপুরে ব্যাক্তি মালিকানায় তাদের সম্পত্তি রয়েছে। যে সম্পত্তি নিজেদের নামে রয়েছে তার খাস খতিয়ান ভূক্ত। তারা সিএস আরএস ও বর্তমানে বিএস খতিয়ান ভূক্ত বৈধ মালিকানায় রয়েছে। ১৯৪৭ সাল থেকে সংখ্যালঘুদের উপর বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন হলেও স্বাধীনতার পর এ নির্যাতন বহুগুনে বেড়ে যায়। যারফলে তারা এদেশ ত্যাগ করে সনাতন ধর্মীয় রাষ্ট্র ভারতে চলে যেত বাধ্য হয়েছে। তাদের আকুতি স্বাধীনাতার সংগ্রামে ও মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের হানাদার বাহীনির সাথে এদেশে সংখ্যলঘুরাও দেশ মাতৃকার টানে, জন্মভূমী রক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো দেশ রক্ষার জন্য। এদেশ তারা রক্ষাও করতে পেড়েছে। সে স্বাধীন দেশে তারা এখন পরাদিনের মতো বসবাস করতে হচ্ছে। নিজেদের বাড়িঘর সম্পত্তি রক্ষা করতে না পেরে কমদামে বিক্রি করে, অনেকে শুধু জীবন নিয়ে বাঁচার জন্য দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এদেশের মুক্তিযোদ্ধারা সংখ্যলঘুদের ব্যপারে কোন প্রতিবাদ করছে না বলে তাদের অভিযোগ। যারফলে তারা এদেশে আরো অবহেলার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তারা সুযোগ খুঁজতে থাকে কখন তাদের সঠিক সময় হয় দেশ ত্যাগ করতে। সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর, সম্পত্তি ও তাদের উপর তুচ্চ ঘটনা নিয়ে নির্যাতন করা হয়। এমনকি মা- বোনের ইজ্জত লুন্ঠন ও জীবনের নিরাপত্তার সঠিক দিক নির্দেশনা না পাওয়ায় প্রকৃত পক্ষে দেশ ত্যাগ করতে তারা বাধ্য হয়। এ স্বাধীন দেশটি গণতান্ত্রিক দেশ হলেও সংখ্যলঘুদের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র প্রয়োগ হচ্ছে না।
চাঁদপুরের প্রবীন ব্যক্তিদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, চাঁদপুর জেলার অধিকাংশ উপজেলা হিন্দু শাসিত ছিল। যেমন-কচুয়া, মতলব, শাহরাস্তি, ফরিদগঞ্জ ও চাঁদপুর সদর। এ সব এলাকা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা পুর্বের চাইতে অনেকাংশে কমে গেছে। এখনো এসব এলাকায় বহু সংখ্যক সনাতন ধর্মাবলম্বী বহু পরিবার বসবাস করছে। যারা আতঙ্কে ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাতে হয়। তারা জানান, সংখ্যলঘুদের এ দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছে এবং করে যাচ্ছে। দুর্বৃত্তরা ও প্রভাবশালীরা এদের বাড়ি ঘর ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জোর পূর্বক দখল, তাদের বাসা বাড়ি ভাড়া নিয়ে ভাড়া না দিয়ে তুচ্ছ ঘটনার সৃষ্টি করে তাদের উপর নির্যাতন করছে। এমনকি তাদের সুন্দরী নারীরা কু-প্রস্তাবে রাজি না হলে তাদেরকে জোর পূর্বক ধর্ষন ও শ্লীলতাহানি করে হয়রানি করা হয়। এসব কারনে চাঁদপুরের দলিত সংখ্যলঘুরা হয়রানির শিকার হয়ে এদেশ ত্যাগ করে। আর এ জন্য সংখ্যলঘুদের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে এ দেশ থেকে। চাঁদপুর এক সময় সনাতন ধর্মের লোকদের আয়ত্বে ছিল। তারা এদেশ শাসন করত তার নির্দশন রয়েছে এ জেলার অনেক স্থানে। এখনও কচুয়ার উজানিতে রয়েছে বেহুলার পারিবারিক জীবনের ব্যবহৃত পাটা পুতা, কচুয়ার কোয়া নামকস্থানে রয়েছে মনসা মুরা (বাঁশ জার) যেখানে অসংখ্য সাপের বসবাস। এ মনসা মুড়ায় সনাতন ধর্মীয় লোকেরা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় এখানে পুজা দিয়ে থাকে। পুজার সময় সাপের পানাহারের জন্য অনেকে দুধ নিয়ে আসে। একটি নির্দিষ্ট স্থানে এখানে পুজা দিয়ে থাকে। পুজার সময় সনাতন ধর্মীয় লোকেরা সাপের পানাহারের জন্য অনেকে দুধ নিয়ে আসে। ফরিদগঞ্জের রয়েছে, নীল কুঠি, বিভিন্ন স্থানে রয়েছে বড় বড় মঠ, জমিদার বাড়ির নির্দেশন, দুধ দিয়ে গোসল করার পুকুরসহ বিভিন্ন নির্দেশন। শাহরাস্তিতে এখন পড়ে রয়েছে বহু জমিদার বাড়ি। বড় বড় মঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপশনাগার, মেহের কালীবাড়ি, আন্ধার মানিকঘর, কচুয়ায় আরো রয়েছে বিশাল রথ। যেখানে এখনও জেলার বড় আকারের রথ যাত্রা হয়ে থাকে। সনাতন ধর্মের মানুষেরা সেখানে যায় রথ যাত্রায় অংশ গ্রহণ করতে। মতলবে রয়েছে বড় বড় মঠ ও পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি। এখানে সনাতন ধর্মীয় মানুষের এখনও অসংখ্য বসবাস রয়েছে। মতলবের গান্ধি ঘোষের নাম পুরো জেলার মানুষ জানে। গান্ধি ঘোষের খির জেলাসহ দেশের অন্যতম খির হিসেবে সু-সাধু বলে প্রচলিত রয়েছে। চাঁদপুর সদর উপজেলার নতুন বাজার ও পুরান বাজারে অসংখ্য সনাতন ধর্মীয় সংখ্যলঘুদের বসবাস রয়েছে। পুরান বাজারে প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ীরাই রয়েছেন যারা সনাতন ধর্মীয় লোক। নতুন বাজারে সংখ্যালঘুদের নামে বহু মহল্লার ও প্রতিষ্ঠানের নাম করণ রয়েছে। যেমন-পালপাড়া, ঘোষপাড়া, লেডি প্রতিমা মিত্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মধুসুদন বালক উচ্চ বিদ্যালয়, মধু বাবুর নামে মধু রোড রেলওয়ে ষ্টেশন, পাল বাবুদের নামে ঐতিহ্যবাহী পাল বাজার, বাবুহাট, ঘোষেহাট, সাহা বাবু নামে সাহাতলী রেলওয়ে ষ্টেশন, পুরান বাজারে রয়েছে হরিসভা, পালপাড়া, ঘোষপাড়া, প্রতাপসাহা বাড়ি, মঠখোলা, গাঙ্গুলীপাড়া, উত্তর শ্রীরামদী, পূর্ব শ্রীরামদী, জমিদার নিশি বাবুর নামে রয়েছে নিশি বিল্ডিং ও এর আশপাশে অসংখ্য স্থাপনা। পন্ডিত পাড়া, কুন্ডু বাড়ি, দাস পাড়াসহ বহু প্রতিষ্ঠান ও এলাকার নামকরণ রয়েছে। সনাতন ধর্মীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের নিদর্শন আজো দন্ডিয়মান অবস্থায় রয়েছে।
চাঁদপুর রেলওয়ে হরিজন কলোনির শ্রী শ্রী মহাবীর রাধা কৃষ্ণ মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক বিধান চন্দ্র হরিজন (জনি) বলেন, এদেশ থেকে দলিত সংখ্যালঘুরা ভারত যেতে তাদের ইচ্ছে নেই। শুধুমাত্র একশ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যাক্তি ও দূর্বৃত্তরা বৈষম্য সৃষ্টি করে এদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করে। যার ফলে এ সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সষ্য শ্যামলা প্রাকৃতির সৌন্দর্যে ভরা আমাদের প্রিয় জন্ম ও মাতৃ ভূমী বাংলাদেশ। যা’ মায়ের চেয়েও বেশি আপন আমাদের মাতৃভূমী। এমন একটি দেশ যা’ পৃথিবীর মধ্যে ৬টি ঋতুর বহনের মাধ্যমে আমাদের দেশের সৌন্দর্য্যকে অনেক মধুময় করে তুলেছে। সেই দেশ ছেড়ে কোন দলিত বা সংখ্যালঘু সমাজ যেতে ইচ্ছুক নয়। কিন্তু কালের পরিবর্তনের কিছু বৈষম্যধারী লোকদের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন কারনে এদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এদেশ ত্যাগকে যা’ আমাদের মৃত্যুর যন্ত্রনা থেকেও বেশী মনে হয়। এর প্রতিকার হচ্ছে সরকার যদি দলিত জনগোষ্ঠির জন্য আলাদা ট্রাস্টের মাধ্যমে জান মাল ও জীবনের নিরাপত্তার প্রদানের মাধ্যমে সর্বাধিক তদারকি করে ও খোজ খবর রাখে তা হলে দলিত ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠি হ্রাসের প্রতিকার ঘটবে বলে আমার বিশ^াস। এ প্রতিকারের জন্য প্রথমত সরকার ও জনপ্রশাসন দলিত ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে সার্বিক একটি যোগাযোগ রাখা মূল প্রয়োজন। দেশের গনতন্ত্র মোতাবেক প্রত্যেকটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরনে সরকারের মূখ্য দায়িত্ব। এর মধ্যে যদি সরকার আন্তরিকতার সহিত তাদের হয়ে সঠিক কাজ করে তাহলে অবশ্যই তারা এদেশে থেকে সঠিক ভাবে বসবাস যোগ্য অধিকার পাবে এবং প্রতিকার করা সম্ভব হবে। এ জন্য প্রকৃত পক্ষে সরকারের এসব দেখার দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তারা মনিটরিং করলে এ দেশের প্রত্যেকটি মানুষের মতো দলিত সংখ্যালঘুরা শান্তিতে নিরাপদে বসবাস করতে পারবে এবং তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী যথাযথ স্থানে কর্ম করে মর্যাদার আসনে অদিষ্ট হতে পারবে।
চাঁদপুর হরিজন সমাজ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি আকাশ দাস হরিজন বলেন, চাঁদপুর তথা সারাদেশেই দলিত ও সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের স্বিকার হচ্ছে। তাদের বাড়ি-ঘর দখল ও তাদের বিভিন্ন ভাবে হয়রানি এবং তাদের বাড়িÑঘরে ভাংচুর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। এরা তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমরা এদেশের নাগরিক হয়েও পরাদিনের মতো নিরাপত্তাহীনতায় কাটাতে হয়, এর প্রতিকার প্রয়োজন। তাই প্রথমত সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য বাসস্থান ও পূর্ণবাসন না থাকায় দলিত ও হরিজনরা প্রকৃত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এদেশের সহজ সরল দলিত সংখ্যালঘুরা বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময় নির্যাতনের স্বিকার হতে যাচ্ছে। এ নির্যাতনের একমাত্র বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশের আইনি প্রক্রীয়া শক্তিশালী না হওয়ায় প্রভাবশালী ও দূর্ভৃত্তরা দিনের পর দিন এ নির্যাতন চালাতে পারছে। এর অন্যতম কারণ চিহ্নিত করে কঠোর হতে হবে সরকারকে।
হরিজন সমাজ উন্নয় সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হীরা লাল সরকার মুন্না বলেন, বাংলাদেশে স্বাধীনতার বহু পূর্ব থেকেই আমাদের পূর্ব পুরুষেরা শত-শত বছর যাবৎ এ মাতৃভূমীতে বসবাস করেছে এবং এদেশেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সাথে অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করে জন্ম ভূমি ও মাতৃভূমী রক্ষা করে স্বাধীন একটি দেশ পেয়েছি। এ গণতান্ত্রিক দেশে আমাদের যেমন ভোটার অধিকার আছে তেমনি আমাদের বসবাসেরও অধিকার রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী সরকার আমাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সহ মৌলিক সুবিধা দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিছু বিপদগামী ও প্রভাবশালী ব্যাক্তিরা তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্যের সম্পত্তি দখল করার পায়তারায় লিপ্ত থাকে। সেই শ্রেনীরেই কিছু অসাধু লোক দলিত সংখ্যালঘুদের উপর তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে তাদের উপর নির্যাতন, তাদের বাড়ি ঘর ভাংচুর, লুঠপাট ও অগ্নি সংযোগ সহ তাদের সম্পত্তি দখল করার কাজে লিপ্ত থাকে। এসব কারনেই সংখ্যালঘুরা তাদের ভিটা মাটি ছেড়ে জীবন রক্ষার্থে এ দেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এদেশের আইনি প্রক্রিয়া শক্তিশালী না হওয়ার কারনে অন্যায়কারীরা আরো প্র¯্রয় পেয়ে যায় অন্যায় করার পরও। এদেশের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একশ্রেণীর মানুষের ভুল ধারনার কারনে জাতি, বর্ণ, বৈষম্য নিয়ে দিদ্বা দন্ধ থাকার কারনে সংখ্যলঘুরা নির্যাতনের স্বিকার হয়ে জীবন বাঁচনোর তাগিদে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া এদেশে ব্যক্তির ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের ফলে যা ইচ্ছে তা’ই করার কারনে বসবাসে বাঁধা গ্রস্থ হয় বিধায় সংখ্যালঘুরা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। দলিত সংখ্যালঘুরা ন্যায় বিচার না পাওয়ার কারনে মাতৃভূমী ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এ সম্প্রদায়ের যেসব সংগঠন রয়েছে সেগুলোও কেন্দ্রীয় ভাবে তাদের শক্তি প্রয়োগ করতে পারেনা। তথা শক্তিশালী ও প্রতিবাদী মুখর না হওয়ায় দলিত সংখ্যালঘুরা তাদের অধিকার আদায় করতে পারছেনা, সরকারের নিকট থেকে। এটিও একটি অন্যতম কারন হয়ে দাড়িয়েছে।
অন্যদিকে এদেশে বসবাসরত দলিত সংখ্যালঘুদের তাদের ব্যাক্তি স্বাধীনতার অভাব রয়েছে। তারা তাদের অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ না পাওয়ার কারনে জন্মভূমী, মাতৃভূমী হওয়ার পরও এদেশ থেকে পালিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রশাসনিক সঠিক হস্তক্ষেপ ও আইন সঠিক ভাবে প্রয়োগ করা হলে দলিত ও সংখ্যালঘুরা বৈষম্যের স্বিকার হতে রক্ষা পেয়ে অধিকার ফিরে পাবে। এটাই সরকারের কাছে তাদের কামনা।
পুরাণ বাজার হরিজন যুব ক্লাবের সভাপতি শ্যমল হরিজন জানান, এদেশে সংখ্যালঘুরা শান্তি ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে স্বাধিন ভাবে চলার জন্য ও নিরাপত্তার সুবিধা পেতে চায়। বিভিন্ন সময় দলিত সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘরে হামলা ও বিভিন্ন ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে তারা বাধ্য হয় এ দেশ ত্যাগ করে ভারত চলে যেতে। হিন্দুরা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এদেশে তাদের প্রতি যে নির্যাতন হয়েছে তার পরও স্বাধীনতার পর তারা তাদের মাতৃ ভূমিতে থাকতে চায়। কিন্তু বিভিন্ন কারনে তাদেরকে দেশ ত্যাগ করে যাওয়ার পর্যায় হওয়ায় তারা আর থাকতে চায় না এদেশে। এজন্য তারা ভিটা মাটি ছেড়ে ভারত চলে গেছে এবং অনেকে এখনও যাচ্ছে। অনেক মা-বোনদের উপর নির্যাতন হয়েছিলো তারপরও প্রতিকার তারা পায়নি। এ দেশে থাকার ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধারাও পর্যন্ত তাদের এ করুন দশার কথা তুলে ধরছেনা। তারা এ দেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলো মাতৃভূমির জন্য। দলিত সংখ্যালঘুদের উপর এতই বেশি নির্যাতন হয়েছে যে, কেউ কেউ ভিটা মাটি বিক্রি করে আবার কেউ কেউ ভিটা মাটি রেখেই জীবন বাঁচানোর জন্য ভারতে চলে যায়। এদেশের একশ্রেণীর মানুষের অপকর্মের কারনে তারা এদেশ থেকে চলে গিয়ে পাশর্^বতি সনাতন ধর্মীয় দেশ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। যারা চলে গেছে তাদের এদেশে আর যেন না আসতে পারে, সেজন্য তাদের নাম এদেশ থেকে মুছে দেওয়া সরকারের দরকার। অনেকে বর্তমানে এদেশে এবং ভারতে দু’ জায়গায় নগরিকত্ব নিয়ে এক পা বাংলাদেশে এবং অন্য পা ভারতে রাখছে। যারা এদেশে নির্যাতন সহ্য করেও বর্তমানে রয়েছে তাদেরকে সরকারি ভাবে ব্যাপক নিরাপত্তা ও জান মালের নিরাপত্তা সরকার দিতে পারলে এদেশ থেকে কেউ ভারত যাবে না। তারা এদেশে শান্তিতে থাকতে চায়। অপরদিকে দলিত ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে যারা সরকারি চাকুরী করে তারা ভালো আছে। তারা এদেশ থেকে ভারত যাওয়ার চিন্তাই করছেনা। সরকার সকল দলিত সংখ্যালঘুদের জন্য কঠোর দৃষ্টি দেওয়া একান্ত প্রয়োজন এবং আইনী ভাবে এদের উপর কোন নির্যাতন হলে তাৎক্ষনিক প্রাশাসনিক হস্তক্ষেপ নিলে এদেশ থেকে দলিত সংখ্যালঘু হ্রাস পাবে না।
চাঁদপুর জেলা রবিদাস সম্প্রদায়ের সভাপতি নারায়ন রবিদাস বলেন, স্বাধীনতার পূর্বেই এদেশে আমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রায় ২-৩শ’ বছর যাবৎ বসবাস করেছিলো। সে উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা চাঁদপুরে শহরের নতুনবাজার সিএসডি গোডাউনের নিকট স্বাধীনতার পর থেকে বসবাস করে আসাছি। স্বাধীনতার পর আমাদের প্রতি তেমন এদেশের প্রভাবশালী ও দূর্বৃত্তদের তেমন নির্যাতন ছিলনা। হঠাৎ করে প্রায় ৫ বছর যাবত একটি প্রভাবশালী মহল ভুয়া দলিল সৃষ্টি করে আমাদের এখানে বসবাসরত প্রায় ৫০টি পারিবারকে উচ্ছেদের চেষ্টা করছে। আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় আমাদের সঠিক দলিল পত্র থাকায় এখনো ঠিকে রয়েছি বসবাসরত স্থানে। দলিত ও সংখ্যালঘু বহু পরিবার প্রভাবশালীদের নির্যাতন, জমিজামা দখল, বাড়ি-ঘর ভাংচুর ও লুঠপাট ও অগ্নিসংযোগ করার ফলে জীবন বাঁচাতে এদেশ ত্যাগ করে ভারত চলে গেছে। তারা যে কোন তুচ্ছ ঘটনা নিয়েই আমাদের সাথে লেগে যায় এবং আমাদেরকে নানা ভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন করছে। আমাদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে দেশ ত্যাগ করতে। যেমন, কুমিল্লার নাছির নগরে তুচ্ছ ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ বিনা দোষে বাড়ি ঘর ছাড়া হয়ে পড়েছে। চাঁদপুরে বিভিন্ন ভাবে আমাদেরকে চাপ প্রয়োগ করছে ভিটা মাটি ছেড়ে চলে যেতে। আমাদের এখান থেকে (নতুনবাজর মুচিবাড়ি) বেশ কয়েকটি পরিবার গতকয়েক বছরের মধ্যে ভারত চলে যায়। প্রভাবশালী মহলটি এখান থেকে এখনও আমাদেরকে উঠানোর জণ্য চেষ্ঠা করছে। আইনী প্রক্রিয়ায় তাদের সাথে লড়াই করে এখনো জীবন নিয়ে বেঁচে আছি। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের দলিতদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া একান্ত প্রয়োজন মনে করছি।
অপরদিকে দলিত সংখ্যালঘুরা এদেশ থেকে চলে যাচ্ছে শুধুমাত্র নিরাপত্তা ও আইনি সহযোগীতা না পাওয়ায়। প্রশাসন থেকে সহযোগীতা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া তাৎক্ষনিক কিছু হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের থাকার ব্যবস্থা নিলে আমাদের জন্য ভালো হয়। নয়তো আমাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা থাকে না। বাধ্য হয়ে একদিন হয়তো আমরাও দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যেতে হবে। এ জণ্য সরকারের একান্ত প্রচেষ্ঠা থাকা প্রয়োজন। প্রতিটি জেলায় জেলায় নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিকারের ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করলে দলিত ও সংখ্যালঘুরা দেশ ত্যাগ না করে মাতৃভূমীতে এ স্বাধীন দেশে থাকতে পারবে। এ জন্য প্রশাসনিক উদ্যোগেই পারে দলিত সংখ্যালঘুদের দেশ ত্যাগ না করার অবসান ঘটাতে।
চাঁদপুর হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের চাঁদপুর জেলা সভাপতি জীবন কানাই চক্রবর্তী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এদেশের হিন্দুদেরকে বিভিন্ন অন্যায় ভাবে নির্যাতন করার ফলে তারা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। সরকার তাদের সুরক্ষা দিতে পারেনাই বলে সংখ্যালঘুরা দেশ ত্যাগ করার সিদ্ধান্তে রয়েছে। সব সরকারের সময়েই সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এটি সরকারের পক্ষ থেকে হচ্ছে না, সরকারের নাম ভাঙ্গিয়ে একটি মহল একাজগুলো করে যাচ্ছে। যারা তাদেরকে যেতে বাধ্য করছে তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে এরা চলে গেলে এদের জমি জামা সহায় সম্পত্তি তারা দখল করতে পারবে। এ জন্য সরকারের সাশনতন্ত্রের সংবিধান অনুযায়ী যে সুরক্ষার বিধান রয়েছে সংবিধানে তা সঠিক সু-রক্ষা দিতে পারলে সংখ্যালঘুরা এদেশ ত্যাগ করবেনা। তা না হলে সংখ্যালঘুদের এ জন¯্রােত ধরে রাখা যাবে না। তারা দেশ ত্যাগ করবেই।
