একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল-২।
আনীত ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি অভিযোগ পৃথক পৃথক ভাবে পাঠ করা শুরু করে ট্রাইব্যুনাল। যার মধ্যে ১টি অভিযোগে, অর্থ্যাৎ জসীম উদ্দীনকে অপহরণ ও হত্যার আভিযোগে ফাঁসির রায় দেয় আদালত।
রোববার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে আনিত ১৩টি অভিযোগের ৩৫১ পৃষ্ঠার রায়ের মোট ১১টি পৃষ্ঠা সংক্ষিপ্ত আকারে পড়ে চূড়ান্ত রায় ঘোষনা করবেন ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
এর মধ্যে ১০টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ১০টি অভিযোগের মধ্যে ২,৩,৪,৬,৭,৯,১০ ও ১৪টি অভিযোগ
এর আগে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আনা হয়। তাকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় রাখা হয়েছে। সকাল ১১টার দিকে তার রায় পড়া শুরু হবে বলে ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে।
এটি হবে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একাদশ রায়। বিচারপতি ওবাইদুল হাসানের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করবেন।
এদিকে এ রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে। রোববার সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনালের ভেতরে, বাইরে ও প্রবেশ পথসহ আশ-পাশে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। এছাড়া সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। সন্দেহ জনক কাউকে মনে হলেই তল্লাশি করছে পুলিশ।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মীর কাসেম আলীর মামলার রায় ঘোষণার জন্য রবিবার দিন ধার্য করেন।
২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ওপেনিং স্টেটমেন্ট উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শুরু হয়। এর পর ১১ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর মীর কাসেম আলীকে ১৪টি ঘটনায় অভিযুক্ত করে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল।
মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
১. মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে আল-বদর বাহিনী ১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর ওমরুল ইসলাম চৌধুরীকে চাকতাইঘাট থেকে অপহরণ করা হয়। এর পর তাকে কয়েক দফায় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেল, পাঁচলাইশ থানার সালমা মঞ্জিল এবং একটি চামড়ার গুদামে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
২. আসামির নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর চাকতাই থেকে লুৎফর রহমান ফারুককে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়।
৩. ২২ অথবা ২৩ নভেম্বর আসামির নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে তার কদমতলা বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়।
৪. ডাবলমুরিং থানার সালাহউদ্দিন খানকে তার নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে আল-বদর বাহিনীর নির্যাতন।
৫. ২৫ নভেম্বর আনোয়ারা থানার আবদুল জব্বারকে তার নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে মীর কাসেম আলীর সামনে হাজির করা হয়। এরপর তাকে নির্যাতন করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
৬. চট্টগ্রাম শহরের একটি চায়ের দোকান থেকে হারুনুর রশিদ নামে একজনকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেল এবং সালমা মঞ্জিলে নির্যাতন করা হয়।
৭. মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে ৭-৮ জন যুবক ডাবলমুরিং থানা থেকে সানাউল্লাহ চৌধুরীসহ দুজনকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়।
৮. ২৯ নভেম্বর রাতে নুরুল কুদ্দুসসহ ৪ জনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন।
৯. ২৯ নভেম্বর সৈয়দ মো. এমরানসহ ৬ জনকে অপহরণ ও নির্যাতন।
১০. আসামির নির্দেশে মো. যাকারিয়াসহ ৪ জনকে অপহরণ ও নির্যাতন।
১১. শহীদ জসিম উদ্দিনসহ ছয়জনকে অপহণের পর নির্যাতন করা হয়। এতে জসিমসহ পাঁচজন নিহত হন এবং পরে লাশ গুম করা হয়। ঈদের দিনের পর জসিমকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়।
১২. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীসহ তিনজনকে অপহরণ করে নির্যাতন করা হয়। এতে দুজন নিহত হন এবং তাদের লাশ গুম করা হয়।
১৩. সুনীল কান্তিকে অপহরণ ও নির্যাতন এবং
১৪. নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে অপহরণ ও নির্যাতন।
২০১২ সালের ১৭ জুন একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মীর কাসেমকে গ্রেফতার করা হয়। এর পর ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
গত বছরের ১৬ মে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন মীর কাসেমের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এর পর ২৬ মে তা আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠনের শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে আদালত।
গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর মীর কাসেমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। এর পর মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয় এবং সেখানেই ১৮ নভেম্বর প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমনের ওপেনিং স্টেটমেন্টের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শুনানি।
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর থেকে এ বছরের ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলামসহ মোট ২৪ জন।
এরা হলেন- সৈয়দ মো. এমরান, মো. সানাউল্লাহ চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী, সুনীল কান্তি বর্ধন দুলাল, শহীদপুত্র শিবু দাস, মৃদুল কুমার দে, প্রদীপ তালুকদার, মুক্তিযোদ্ধা এস্কান্দার আলম চৌধুরী, মো. সালাহউদ্দিন ছুট্টু মিয়া, মো. জাকারিয়া, নাজিমুদ্দিন, মো. হাসান (১), মো. হাসান (২), ফয়েজ আহমেদ সিদ্দিকী, জুলেখা খান, মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর চৌধুরী, হাসিনা খাতুন, এসএম জামাল উদ্দিন, এস এম সরওয়ার উদ্দিন এবং লুৎফর রহমান ফারুক। জব্দ তালিকার সাক্ষী হলেন চট্টগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরির বুক সর্টার কাউসার শেখ, বাংলা একাডেমির সহকারী গ্রন্থাগারিক এজাব উদ্দিন মিয়া এবং বাংলা একাডেমির প্রধান গ্রন্থাগারিক মোবারক মিয়া।
সাক্ষ্য শেষে এদের সবাইকে জেরা করে আসামিপক্ষ।
এর পর ২১ ও ২২ এপ্রিল মীর কাসেম আলীর পক্ষে সাক্ষ্য দেন তিনজন সাফাই সাক্ষী। তারা হলেন— মীর কাসেম আলীর ছোট বোন মমতাজ নুরুদ্দিন, চট্টগ্রামের কোতয়ালী থানাধীন স্টেশন রোডের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী এবং চট্টগ্রামের উত্তর হালিশহরের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের খান।
এর পর তাদের জেরা করেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম।
সাক্ষ্য শেষে গত ২৭ ও ২৮ এপ্রিল এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন।
এর পর ২৯, ৩০ এপ্রিল ও ৪ মে কাসেম আলীর পক্ষে যুক্তি দেন তার আইনজীবী এ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমীন।
সমাপনী যুক্তি উপস্থাপন শেষে চলতি বছরের ৪ মে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) করা হয়।
মীর কাসেম আলী
মীর কাসেম ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ শাখা ইসলামী ছাত্রসংঘের (জামায়াতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন) সভাপতি হন। একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম শহর শাখা ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। ৭ নভেম্বর তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক হন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘ নাম বদলে ইসলামী ছাত্রশিবির নামে আত্মপ্রকাশ করলে মীর কাসেম এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন।
১৯৮০ সালে তিনি রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী নামের একটি বিদেশী বেসরকারি সংস্থার এ দেশীয় পরিচালক হন। ১৯৮৫ সাল থেকে তিনি জামায়াতের শূরা সদস্য।
ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক মীর কাসেম দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান। ওই প্রতিষ্ঠানেরই সংবাদপত্র দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং টেলিভিশন চ্যানেল দিগন্ত টেলিভিশন।
শিরোনাম:
বৃহস্পতিবার , ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ , ৭ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
এই ওয়েবসাইটের যে কোনো লেখা বা ছবি পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে ঋন স্বীকার বাঞ্চনীয় ।

