সরজমিনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ঃ
আশিকাটিতে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির ‘১০টাকার চাল ২০ টাকায় বিক্রি’ জেলার ৮৯টি ইউনিয়নের একমাত্র অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়নি
জিয়াউর রহমান বেলাল ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হতদরিদ্রদের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সারাদেশের ন্যায় চাঁদপুর জেলার ৮ উপজেলার ৮৯টি ইউনিয়নেও একযোগে শুরু হয়েছে। কিন্তু উক্ত কর্মসূচির আওতায় জেলার কোন ইউনিয়নে চাল বিক্রির ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম বা কারচুপির সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ পাওয়া না গেলেও গত ২ অক্টোবর ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে চাঁদপুর সদর উপজেলার ২নং আশিকাটি ইউনিয়নে ‘১০ টাকার চাল ২০ টাকায় বিক্রি’ মর্মে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া তথ্য প্রচার করা হয়। এতে বলা হয়, ‘ন্যায্যমূল্যের চাল বিক্রিতে প্রতারণা আশিকাটিতে গরীবের ১০টাকা মূল্যের চাল বিক্রি হচ্ছে ২০টাকায়!’ এহেন তথ্যের কারণে গোটা জেলার সচেতন লোকজনের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন উঠে, প্রধানমন্ত্রীর স্পর্শকাতর কর্মসূচিতেও প্রকাশ্যে এই দুর্নীতি? সর্বত্র দেখা দেয় তীব্র ক্ষোভ। সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রশাসনও নড়ে চড়ে বসে। প্রকৃত ঘটনা জানতে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে পরদিন ৩ অক্টোবর চাঁদপুর সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুভাষ চন্দ্র নম সরজমিনে ঘটনাস্থলে যান। তিনি দিনভর ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের কার্ডধারী নারী ও পুরুষ, উপস্থিত এলাকাবাসী, চেয়ারম্যান, মেম্বারগণ, ইউনিয়নের সচিব, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন এলাকার গণ্যমান্য লোকজন, সংশ্লিষ্ট ডিলারদ্বয়সহ অসংখ্য লোকের সাথে কথা বলেন এবং উল্লেখিত তথ্য বিভিন্নভাবে ব্যাপক যাচাই করেন। শত শত লোকের সামনে অনুষ্ঠিত তদন্তকালে একজনকেও উক্ত অভিযোগের পক্ষে কথা বলতে শোনা যায়নি। এব্যাপারে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং বিভিন্ন টেলিভিশন মিডিয়ার সাংবাদিকরা সরজমিনে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে বিস্তারিত জানতে পারেন।
এলাকাবাসী জানান, এলাকায় সদ্য বাল্যবিবাহ করা ভাগ্নি জামাতা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মনগড়া ও কল্পকাহিনী সম্বলিত তথ্যের অবতারণা করে তথা ফাঁদ পেতে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্যই এহেন সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করে গোটা এলাকায় লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ কারনেই এলাকায় সরকারের ন্যায্যমূল্যের চাল বিক্রি আপাততঃ বন্ধ রয়েছে। আল্লাহ্পাক যেন এই জামাইর বিচার করে। জানিনা আমরা আর চাল পাবো কীনা; তবে বাল্যবিবাহ করা জামাই বাবা এ ধরনের পরিস্থিতির ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি ঘটালে আমরাও তার সমুচিত জবাব দিতে বাধ্য হবো’। এলাকাবাসীও ‘১০ টাকার চাল ২০ টাকায় বিক্রি’র তথ্যটি সর্বৈব মিথ্যা দাবি করে যে-কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সদা প্রস্তুত বলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান। উপস্থিত বিভিন্ন এলাকার লোকজন সাংবাদিকদের আরও জানান, ‘ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের কোথায়ও ১০ টাকার চাল ১০ পয়সাও বেশি নেয়া হয়নি; এমন প্রমাণ কেউ কোথায়ও দেখাতে পারবেন না। ওজনের বিষয়টি নানা কারণে সামান্য হেরফের হতেই পারে। তবে তা সম্পূর্ণ গাছে মাছে নয়। আমরা যারা কার্ডধারী ক্রেতা সাধারণ-ওজনের বিষয়টি মেনে নিয়েই ন্যায্যমূল্যে চাল ক্রয় করেছি। সরকারিভাবে উল্লেখিত তদন্তকালে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, ২নং আশিকাটি ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান মোঃ বিল্লাল হোসেন পাটোয়ারী, ২নং আশিকাটি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি রাজ্জাক ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক আলমগীর সরকার, ইউনিয়ন যুবলীগ যুগ্ম-আহবায়ক সেলিম মাল, ১,২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের (সংরক্ষিত)মহিলা মেম্বার মমতাজ বেগম, ১নং থেকে ৯নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত মেম্বার যথাক্রমে দুলাল মাল, লোকমান মুন্সি, মহসীন মৃধা, বিল্লাল মাল, আলমগীর খান, আলফু খান, কামাল ডাক্তার, আলমগীর হোসেন খোকন ও সামছল প্রধানীয়া, ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সুলতান মাহমুদ, ডিলারদ্বয় যথাক্রমে মোঃ সাদ্দাম হোসেন ও মোঃ আরিফুর রহমান, ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকলীগের যুগ্ম-আহবায়ক মোঃ জসিম মুন্সি প্রমুখ।
এব্যাপারে চাঁদপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ গোলাম মোস্তফা সরকার এ প্রতিবেদককে জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হতদরিদ্রদের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সারাদেশের ন্যায় চাঁদপুর জেলার ৮ উপজেলার ৮৯টি ইউনিয়নেও চলমান রয়েছে। জেলার কোন ইউনিয়ন থেকেই ‘১০ টাকার চাল ২০ টাকায় বিক্রি কিংবা তারও অধিকমূল্যে বিক্রির কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে একমাত্র আশিকাটি ইউনিয়নের অভিযোগের বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। অর্থাৎ ইউনিয়নের কোথায়ও ‘১০ টাকার চাল ২০ ট্কাায় বিক্রি’র প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কর্মসূচি চাঁদপুর জেলার কোথায়ও বন্ধ হয়নি। তবে অভিযোগের কারণে আশিকাটি ইউনিয়নে ন্যায্যমূল্যে চাল বিক্রির কর্মসূচিটি তদন্তের স্বার্থে সাময়িক স্থগিত রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ব্যতিত কোন ইউনিয়নেই তা বন্ধ হবে না। আশিকাটি ইউনিয়নেও কর্মসূচি চলমান রয়েছে’। তদন্তের বিষয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুভাষ চন্দ্র নম এ প্রতিবেদককে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান, ‘অভিযোগ পেয়েই সাথে সাথে আমি ২নং আশিকাটি ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে গিয়ে ব্যাপক তদন্তকার্যক্রম পরিচালনা করি। এসময় ওয়ার্ডগুলোতে বিতরণকৃত ৬২১টি কার্ডধারী ক্রেতা সাধারণ, এলাকার গণ্যমান্য লোকজন, চেয়ারম্যান এবং মেম্বারগণ,রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সংশ্লিষ্ট ডিলারদ্বয়সহ এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন। তদন্তকালে ‘১০ টাকার চাল ২০ টাকায় বিক্রি’ হয়েছে বলে কেউ অভিযোগ করেননি কিংবা এব্যাপারে কেউ কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ দিতে পারেননি। অর্থাৎ ‘১০ টাকার চাল ২০ টাকায় বিক্রি’ হয়েছে তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। অত্যন্ত কঠোরতার সাথে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে এ দায়িত্ব পালন করার জন্য আমাদেরকে সুষ্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত কর্মসূচিমূলক ওই সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম’।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছেঃ ক্ষেতখামারে কাজ থাকবে না-এমন মৌসুমে দিনমজুর, অসহায়, দুস্থ, প্রতিবন্ধী, বিধবা ও বিবাহ বিচ্ছেদের শিকার নারীদের মধ্যে প্রত্যেককে ১০ টাকা দরে মাসে ৩০ কেজি চাল দেয়া হবে। কর্মসূচির লক্ষ্য ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী সেদিন অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন, ‘একজন মানুষও যেন না খেয়ে না থাকে। দুস্থ শব্দটি তিনি চিরতরে বিদায় করার ইচ্ছার কথাও ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুড়িগ্রামে গত ৭ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি উদ্বোধন করেছিলেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, ‘দরিদ্রদের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ন্যায্যমূল্যের এ চাল নিয়ে কোন অনিয়ম বা কারচুপি করা হলে তা কোন অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না’। এব্যাপারে তিনি জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে মনিটরিং টিম গঠন করার এবং যেকোন অভিযোগের ব্যাপারে তদন্তের নির্দেশ প্রদান করেন।
