
নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় দেশ পরিচালনায় শীর্ষ পদে যেমন থেকেছেন, একই সঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলে দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও নিজের দৃঢ় মনোবল ধরে রেখেছিলেন। জীবনের শেষ ভাগে পরিবার ও নিকটজন ছাড়া কাটিয়েছেন অনেকটা সময়। দেশের স্বার্থে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ বরাবরই থাকবে মানুষের মুখে মুখে। একজন দেশনেত্রীর এই দৃঢ় মনোভাব ও ব্যক্তিত্ব ছুঁয়ে গেছে সাধারণের হৃদয়।
আশির দশক থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও খালেদা জিয়া দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন তাঁর নেতা-কর্মী ও দেশের মানুষকে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের তিরোধানের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল ঐতিহাসিক এক সময়ের। তবে বয়স ও শারীরিক নানান জটিলতাও এই দেশনেত্রীকে তাঁর দৃঢ় মনোবল ও রাজনৈতিক আদর্শ থেকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। তাঁর বাবার নাম এস্কান্দার মজুমদার এবং মায়ের নাম তৈয়বা মজুমদার। তাঁর পৈতৃক ভিটা ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। খালেদা জিয়ার বিবাহপূর্ব নাম ছিল খালেদা খানম, ডাকনাম পুতুল। বিয়ের পর স্বামী জিয়াউর রহমানের নামের সঙ্গে মিলিয়ে নাম নিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। বিএনপির সিনিয়র নেতা-কর্মীরা জানান, রাজনীতি নিয়ে শত ব্যস্ততার মাঝেও খালেদা জিয়া পারিবারিক কর্তব্য পালনে সক্রিয় থাকতেন।
১৯৬০ সালের আগস্টে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সে সময় জিয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। ডিএফআইয়ের অফিসার হিসেবে তখন দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৫ সালে স্বামীর সঙ্গে খালেদা জিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে যান। সে বছর প্রথম পুত্র তারেক রহমানের জন্ম হয়। ১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত তাঁরা করাচিতে ছিলেন। এরপর ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৭০-এর ১২ আগস্ট দ্বিতীয় পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম হয়। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়া হাসপাতালে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান কোকো। ১৯৭০ সালে দেশে ফিরে জিয়াউর রহমান কিছুদিন জয়দেবপুর সেনানিবাসে থাকার পর চট্টগ্রামে পোস্টিং হলে ষোলশহর এলাকায় বসবাস করেন। স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পর বেগম জিয়া চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে ১৬ মে ঢাকায় আসেন। বড় বোন খুরশিদ জাহানের বাসায় ১৭ জুন পর্যন্ত থাকেন। ২ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীতে এস আবদুল্লাহর বাসা থেকে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে দুই ছেলেসহ বন্দি করে। ১৯৭১-এর ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে মুক্তি পান। রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত বেগম জিয়া ছিলেন সাধারণ গৃহবধূ। মূলত দুই পুত্রকে লালনপালন ও সংসারের কাজ করেই সময় কাটাতেন। রাজনীতি নিয়ে চিন্তা দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাঁর দেখা মিলত না। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালেও রাজনীতিতে মাথা ঘামাতেন না বেগম জিয়া। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়ার ছোট বোন সেলিনা ইসলাম বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়ার রাজনীতি নিয়ে কোনো চিন্তাই ছিল না। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ও খালেদা জিয়া কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হননি।’
১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তার ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হন খালেদা জিয়া। প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদাতের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার। এরপর তাঁকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জিয়া হত্যার পর বিএনপি ছত্রভঙ্গ ও দিশাহারা হয়ে পড়ে। এরপর নেতা-কর্মীদের আহ্বানে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালের মার্চে খালেদা জিয়া বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। সে সময় বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে পার্টির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন খালেদা জিয়া। বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে তোলেন এরশাদবিরোধী সাতদলীয় জোট। এ সময় কয়েকবার আটক করা হলেও নিজের অবস্থান থেকে নড়েননি। নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। জীবনের প্রথম নির্বাচনে পাঁচটি আসন থেকে দাঁড়িয়ে সব কটিতেই জয়লাভ করেন খালেদা জিয়া। নয় বছরের রাজনীতি করেই দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে তিনি দ্বিতীয়বারেরে মতো প্রধানমন্ত্রী হন। আন্দোলনের মুখে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস হয় এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি। সে সময় খালেদা জিয়া ছিলেন বিরোধী দলনেত্রী। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। মেয়াদ পূর্ণ করে ২০০৬ সালের অক্টোবরের শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি। ২০০৭-এর ৩ সেপ্টেম্বর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পুত্রসহ আটক হন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্তি লাভ করেন। ২০০৮-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় ঐক্যজোট পরাজিত হয়। আর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোটসহ সমমনা দল বর্জন করে। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। আর ২০২৪-এর নির্বাচন আবারও বর্জন করে দেশের বৃহৎ এই রাজনৈতিক দল।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার ১৭ বছরের সাজা হয় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট সম্পর্কিত দুর্নীতির দুটি বিতর্কিত মামলায়। এরপর তাঁকে বন্দি করে ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে রাখা হয়। দুই বছরের বেশি জেল খেটে অসুস্থতার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাহী আদেশে বিভিন্ন শর্তে মুক্তির পর তিনি গুলশানের বাসায় ওঠেন।
এ সময় বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার আবেদন করলেও সে সময় আওয়ামী লীগ সরকারের তরফ থেকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ সময় বন্দি থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার ভারত পলায়নের পর দেশনেত্রী মুক্তি পান। তাঁকে সীমিত পরিসরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেখা যায়। সবশেষ ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। পরে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে ২৩ নভেম্বর তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়াকে তিনটি আসনে প্রার্থী করেছিল বিএনপি।
বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে কিডনি, যকৃতের রোগ, অস্থির হিমোগ্লোবিন, ডায়াবেটিসসহ বয়স্কজনিত অন্য জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০২১ সালে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। ২০২২ সালে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে বেশ কয়েকবার ভর্তি হন। ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। চলতি বছরের ৫ মে লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরেন। এরপর ১৯ জুন আবার হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে জুলাই, আগস্ট ও অক্টোররে তাঁকে কয়েকবার হাসপাতালে যেতে হয়। সর্বশেষ ২৩ নভেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন আর গতকাল সকাল ৬টায় ৭৯ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন আপসহীন নেত্রী।
একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, নিরলস সংগ্রাম, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় খালেদা জিয়ার আত্মত্যাগ ও সর্বশেষ চরম সংকটে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি শেষ পর্যন্ত কেবল একটি দলের নেত্রী নন, দেশনেত্রী থেকে তাঁর উত্তরণ ঘটে দেশমাতায়। এই মহীয়সী রাজনীতিকের বাংলাদেশের সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক উপাখ্যানের ইতি ঘটল।
