
শওকত আলী, :
চাঁদপুর নৌ-সীমানার পদ্মা-মেঘনা নদীর ৬০ কিঃ মিঃ এলাকায় সরকারের ইলিশ নিধন নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার ১৬ দিনপরও জেলেদের জালে মা’ ইলিশ ধরা পরছে। সরকার কারেন্ট জাল, গুপ্টি জাল, কোনা জাল নিষিধ করলেও অভিযান শেষ হওয়ারপর হাজার হাজার জেলে নদীতে নেমে অবাধে দিনে এবং রাতে মা’ ইলিশ, টেম্পু ইলিশ ও ১০ ইঞ্চির নিচে ইলিশের পোনা জাটকা নিধন করে যাচ্ছে। তাদের জালে প্রচুর পরিমাণ ইলিশ ধরা পরছে। তবে এ বছরের মা’ ইলিশের সাইজ বিগত বছরের চাইতে অনেক ছোট। বড় আকারের কোনো মা ইলিশ ধরা পরছে না। যে সব মা’ ইলিশ ধরা পরছে সে সব ইলিশের ওজন ৫শ গ্রাম থেকে ৮শ গ্রাম পর্যন্ত। এছাড়া ১০ ইঞ্চির নিচে টেম্পু ইলিশ ধরা পরছে প্রচুর পরিমাণে। টেম্পু ইলিশ প্রতি হালি বিক্রি হচ্ছে ১৬শ/১৭শ টাকা। ৭/৮শ গ্রাম ওজনের ইলিশ গভীর রাতে নদীর পাড়ে বিক্রি হচ্ছে ২৩/২৪শ টাকা হালিতে। জাটকা বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ১৬০/১৮০ টাকা। বড় আকারের জাটকা বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ২২০/২৪০ টাকা পর্যন্ত। গত ১৬ দিন ও অভিযানের ১৫ দিনে লক্ষ লক্ষ ডিম ওয়ালা মা’ ইলিশ নিধন করেছে জেলেরা। যার ফলে এসব ইলিশ কোটি কোটি ডিম ছেড়ে রেনুতে পরিনত করত। আর এসব রেনু পোনা জাটকা ও টেম্পু আকার থেকে কোটি কোটি
বড় ইলিশে রূপান্তরিত হতো। ডিম ওয়ালা মা ইলিশ নিধন করায় ইলিশের বংশ বৃদ্ধিতে বাধাগ্রস্থ হলেও সবচেয়ে বেশি এ বছর। যা প্রমাণ মিলবে আগামী জাটকা মৌসুমে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদ্বয় নদীর পাড়ে ঘুরে এসব ইলিশে পোনা বিক্রি করতে দেখে মন্তব্য করে বলেন, দীর্ঘ ১৫টি দিন নদীতে রাত-দিন অভিরাম অভিযান করে জেলেদের আটক করে কারাগারে পাঠিয়েছিলাম মা ইলিশ রক্ষার জন্য। কিন্তু মা ইলিশ রক্ষা হলো না। অভিযান শেষ হওয়ার সাথে সাথে হাজার হাজার জেলেদের এসব মা ইলিশ নিধন করা দেখে, তারা মন্তব্য করেন মৎস্য কর্মকর্তাদের ও মৎস্য অধীদপ্তরের সিদ্ধান্ত ভূল থাকায় ইলিশ তার ডিম ছাড়া সুযোগ পেলোনা। যার ফলে এ বছর ইলিশে পোনা জাটকা ও বিগত বছরের তুলনায় উৎপাদন লক্ষমাত্রায় যেতে পারবে না। এছাড়া নদীতে ঘুরে দেখা যায়, নদী এখন জেলেদের সম্পন্ন দখলে। জেলেরা পুলিশ সহ বিভিন্ন সংস্থার বাহিনীর উপর মারাত্বক ক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে। এবছর কয়েকশ জেলেকে নদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার অপরাধে সাজা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। যার ফলে পুলিশ সহ কোনো সংস্থার বাহিনী নদীতে নামছে না জেলেদের ভয়ে। এ সুযোগে জেলেরা নিজেদের ইচ্ছে মত যে কোন জাল ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার মন মা’ ইলিশ, টেম্পু ও জাটকা ইলিশ আহরণ করে নিজেরা লাভবান হচ্ছে, বিগত বছরের চাইতে বেশি। গত ৯ অক্টোবর অভিযান শেষ হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৬ দিনেও প্রশাসন নদীতে নেমে অভিযান চালিয়ে জেলেদের অবৈধ্য জাল আটক সহ কোনো তৎপরতা এ পর্যন্ত দেখা যায়নি।
মেঘনায় সারি সারি নৌকায় জেলেরা জাল ফেলে ইলিশ মাছ ধরছে। প্রকৃত জেলেরা গত শনিবার ১০ অক্টোব থেকেই ইলিশ শিকারের গুল্টিজাল নিয়ে নদীতে নেমেছে। চাঁদপুর সদর ও হাইমচর এলাকার অংশে অনেক ইলিশ ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা। বর্তমানে জেলেদের জালে যেসব ইলিশ ধরা পড়ছে তা আকারে একটু ছোট হলেও অধিকাংশ ডিমওয়ালা (মা) ইলিশ। প্রতিটি ইলিশেই ডিম রয়েছে।
কাটাখালীর মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, অন্যান্য বছর জেলেরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ শিকার করলেও এ বছর আইনের প্রতি বেশিরভাগ জেলেই সচেতন ও শ্রদ্ধাশীল ছিলো। তাদের দাবি, জেলেদের সাময়িক সমস্যা হলেও এখন ইলিশ শিকারের মাধ্যমে তা কাটিয়ে উঠতে পারবে।
হরিণা ঘাটের আড়তদার আমান জানান, হরিণা ঘাটে প্রায় ২শ’ জেলে রয়েছেন। প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে জেলেরা অনেক কষ্টের মধ্যেও তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে দিনাতিপাত করেন। এখন তারা ইলিশ শিকারের জন্য মেঘনায় বিচরণ করছে। নদীতে খরা ¯্রােত থাকলে ইলিশ মিলবে বলে আশা করেন এই ব্যবসায়ী।
তবে এ বছর জেলা প্রশাসনের অভিযান অনেকটা সফল হয়েছে কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে অভিযানের সময়সীমা নিয়ে। যদিও এ সময়সীমা সরকারের মৎস্য বিভাগ নির্ধারণ করে থাকেন জেলা প্রশাসন নয়। সময়সীমা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সফিকুর রহমান জানান, সময়সীমার বিষয়টি সম্পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের। সেখানে বিষয়টি আলোচনা হয়ে গেজেট আকারে প্রকাশ হলে হয়তো এটি পরিবর্তন হতে পারে।”
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সফিকুর রহমান জানান, চাঁদপুরের মেঘনা তীরবর্তী চারটি উপজেলায় ৩০ হাজারের অধিক জেলে রয়েছেন। মা ইলিশ রক্ষায় এসব জেলেদের মধ্যে অল্পসংখ্যক আইন অমান্য করে মা ইলিশ শিকার করে। তাদের মধ্যে অনেকেই আইনের আওতায় এসেছে।
সুধি সমাজের দাবি, শুধুমাত্র গবেষকদের ওপর ভিত্তি করে নয়, ইলিশের আড়ৎতদার, জেলে, খুচরা ব্যবসায়ীদের মতামত নিয়ে অভিযানের দিন-ক্ষণ নির্ধারণ করলে মা ইলিশ রক্ষা হবে এবং ইলিশ উৎপাদন প্রতিবছর বৃদ্ধি পাবে। লাভবান হবে, দেশ, জাতি ও ইলিশসংশ্লিষ্ট সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এ ব্যাপারে রোববার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে জেলা প্রশাসক আব্দুস সবুর মন্ডল বলেন, “এবারের অভিযানে শুধু জেলেদের গ্রেফতার, শাস্তি বা জেলে নৌকা ধরাই আমাদের উদ্দেশ্যে ছিলো না, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জেলেদের মাঝে গণসচেতনতা সৃষ্টিই ছিলো আমাদের উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে আমরা পুরোপুরি সফল না বললেও অন্তত ৯৯ভাগ সফল হয়েছি।”
