
শওকত আলী,
দেশের দুটি বৃহৎ সেচ প্রকল্প চাঁদপুরে। একশ’ কিলোমিটার নিয়ে চাঁদপুর সেচ প্রকল্প ও ষাট কিলোমিটার নিয়ে মেঘনা ধনাগোধা সেচ প্রকল্প। এ দুটি প্রকল্পের হাজার হাজার একর সরকারি সম্পত্তি বেহাত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক নানা জটিলতায় এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ সম্ভব হচ্ছে না। বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারের মতো সাক্ষী গোপাল হয়ে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর পর্যন্ত অপেক্ষার প্রহর গুণতে হচ্ছে। মূলতঃ উচ্ছেদ কার্যক্রম প্রক্রিয়ার এহেন জটিলতার সুযোগে পাউবোর বেহাত হয়ে যাওয়া সম্পত্তির পরিমাণ দিন দিনই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বর্তমানে এই দখল পরিস্থিতি মতলব উত্তর, চাঁদপুর সদর, হাইমচর ও ফরিদগঞ্জ উপজেলা এলাকায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শুধুমাত্র মতলব উত্তর উপজেলা এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাউবোর ২২৬ টি দখলের অভিযোগের তালিকা ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশ ফোর্সের সমন্বয়ে উচ্ছেদের জন্য সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের দপ্তরে ৬/৭ মাস ধরে ঝুলে আছে। ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী মহলের ব্যাপক চেষ্টা-তদবির এবং চাপে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে মারাত্মক হিমশিম খাচ্ছেন। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাজার হাজার একর সম্পত্তি দখলের মহোৎসবে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গ, শাসকদলের লোকজন কেউই বসে নেই। যে যার যার সুযোগ মতো দখল করে নিয়েছে। স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে বাণিজ্য করে যাচ্ছে। ফরাজিকান্দি ইউনিয়নের বড় হলদিয়া গ্রামের ইসলামিয়া মার্কেটের পূর্ব দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে মেঘনা-ধনাগোদার নির্ধারিত জায়গায় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী রানা সোবহান দলবল নিয়ে চলতি বছরের ২২ মার্চ তার সম্পত্তির সাথে দেয়াল নির্মাণের মাধ্যমে পাউবোর বিরাট এলাকার প্রায় ৩ একর সম্পত্তি দখল করে নেন। একইভাবে এনায়েতনগরে ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের বেড়ি বাঁধের পাশে পাউবোর জায়গার দখল করে স্থান স্থাপনা নির্মাণ করেছেন কামরুল ইসলাম নামে এক প্রভাবশালী। এছাড়া পাউবোর জায়গার দখল করে অবৈধভাবে আনন্দবাজার, বেলতলী, দুর্গাপুরবাজার, ছেঙ্গারচরবাজারের আশপাশসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট নির্মাণ করে বাণিজ্য করছেন এক শ্রেণীর প্রভাবশালী।
চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ওয়াহিদুজ্জামান জানান, এ প্রকল্পের প্রায় ৪শ’ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্যে মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে সকল ধরনের লিজ বন্ধ। তাছাড়া পুরনো লিজও নবায়ন করা হচ্ছে না। চলতি বছরের শুরুতে ফরিদগঞ্জের কামতাবাজার হতে শরখাল, বালিথুবা, চান্দ্রা আটটি পয়েন্টে বেড়ি বাঁধের দু’ পাশে প্রায় সহস্রাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তিনি আরো জানান, সহসাই দোকানঘর, চিরুখা ব্রিজ, রামদাসদী, বহরিয়াবাজারে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের ভেতরে প্রায ৫শ’ একর বোরোফিট খাল দখল করে আছে প্রভাবশালীরা। দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে খালের মধ্যে আড়াআড়িভাবে বাঁশ বা জাল দিয়ে বাঁধ দেয়া হয়েছে। যার ফলে পানি প্রবাহ কমে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক সেচ ব্যাহত হচ্ছে। এভাবেই বিভিন্ন প্রভাবশালী চক্র কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি সীমানা থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার সীমানা পর্যন্ত চাঁদপুর জেলাধীন পাউবোর হাজার হাজার একর সম্পত্তি সহজেই দখল করে নিয়েছে। পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অবগত হলেও তাদের নির্ধারিত উচ্ছেদ কার্যক্রম প্রক্রিয়া তথা আইনী জটিলতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে তারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কিছুই করতে পারছেন না।
এ ব্যাপারে চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আবু রায়হানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, কয়েক দিন আগে আমরা থানায় উচ্ছেদের জন্যে এজাহার করেছি। আমরা পুরো প্রকল্পকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এ অংশ হিসেবে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হতে শুরু করে সকল প্রক্রিয়াই আমরা করবো।
মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আতাউর রহমান জানান, পাউবোর বিধিবদ্ধ আইনের বর্তমান সীমাবদ্ধতা অনুযায়ী আমরা আর আগের মতো তাৎক্ষণিকভাবে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারি না। পূর্বে আমরা অভিযোগ পাওয়া মাত্র উপজেলা প্রশাসন ও থানা প্রশাসন থেকে যথাক্রমে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ ফোর্স নিয়ে সাথে সাথে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারতাম। বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ সুপারের কাছ থেকে পুলিশ ফোর্স নিতে হলে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পাউবো’র বেদখল হওয়া সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য উচ্ছেদ কার্যক্রমের তালিকা প্রস্তুত করে পাঠাতে হয়। এভাবেই বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতে সময় লাগে। কেননা অনেক সময় ম্যাজিস্ট্রেট পাওয়া গেলে পুলিশ পাওয়া যায় না আবার পুলিশ পাওয়া গেলে সময় মতো ম্যাজিস্ট্রেট পাওয়া যায় না। যে কারণে অবৈধ দখলকৃত সম্পত্তি উদ্ধারে কিছুটা সময় লাগে।
শিরোনাম:
বুধবার , ২২ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ , ৯ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এই ওয়েবসাইটের যে কোনো লেখা বা ছবি পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে ঋন স্বীকার বাঞ্চনীয় ।
