পরীক্ষার আগের দিন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রশ্নের সমাধান হাতে পেয়ে যায় পরীক্ষার্থীরা। অনেক পরীক্ষার্থীর অভিভাবককে হুবহু প্রশ্ন পেতেও শোনা যাচ্ছে। আর পরীক্ষার দিন বেশির ভাগ পরীক্ষার্থী সমাধান পাওয়া উত্তরপত্র নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত জেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। গত ১৯ নভেম্বর রোববার থেকে শুরু হওয়া প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষায় চাঁদপুর জেলা জুড়ে এ নৈরাজ্য চলছে।
এদিকে পিইসি পরীক্ষায় এ ধরনের নৈরাজ্য ঠেকাতে ও প্রশ্ন ফাঁস সম্পর্কে জানতে হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বৈশাখী বড়ুয়াকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ঢাকায় ডেকে পাঠিয়েছেন। আগামীকাল সোমবার ইউএনও শিক্ষামন্ত্রীর সাথে দেখা করবেন বলে জানা গেছে।
পরীক্ষার্থীদের মধ্যে নকল সরবরাহসহ নানা অনিয়মে জড়িত থাকায় ইতিমধ্যে জেলায় ১৮জন শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। হাইমচর উপজেলায় প্রশ্নের উত্তরপত্র ফটোকপি করার কারণে এক শিক্ষকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। ওই মামলায় পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে।
প্রশ্ন ফাঁস সম্পর্কে চাঁদপুরের ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) মোঃ খোরশেদ আলম বলেন, এটা শুধু চাঁদপুরে নয়, সারাদেশেই একই অবস্থা। প্রশ্নপত্র ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের কী করার আছে। ‘ইন্টারনেটে কোথা হতে আসে’ এ প্রশ্নের জবাবে খোরশেদ আলম বলেন, এ বিষয়ে আপনারা ডিজি স্যারের কাছে জানুন, তাঁরা বলুক, যারা প্রশ্ন করে বিজি প্রেসকে জিজ্ঞাসা করুন। তিনি আরো বলেন, ঊর্ধ্বতন দপ্তরের কর্মকর্তারা সবাই বিষয়টি জানেন। তিনি দাবি করেন, প্রশ্নপত্র প্যাকেট হওয়ার পূর্বেই এটি ফাঁস হয়। জেলা বা উপজেলা পর্যায় থেকে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পিইসি পরীক্ষায় নকল সরবরাহসহ নানা অনিয়মের সাথে জড়িত থাকায় এ পর্যন্ত ৩টি উপজেলার ১৮জন শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে চাঁদপুর সদরের ৪জন, হাজীগঞ্জের ১২ জন ও মতলব দক্ষিণ উপজেলার ২জন শিক্ষক রয়েছেন। আর হাইমচর উপজেলায় প্রাথমিক বিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের উত্তরপত্র ফটোকপি করার সময় স্থানীয় লোকজন হাইমচর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী মোঃ জুয়েল হোসেন ও ফটোকপির দোকানদার সুদর্শন সরকারকে আটক করে পুলিশে দেয়। পরে এ ঘটনায় তিনজনকে আসামী করে হাইচর থানায় মামলা করা হয়েছে।
হাইমচর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আহসানুজ্জামান গতকাল শনিবার বিকেলে মুঠোফোনে বলেন, বিজ্ঞান বিষয়ের জব্দকৃত প্রশ্ন ও উত্তরমালা পরের দিন অনুষ্ঠিত বিজ্ঞান বিষয়ের সাথে হুবহু মিলে যায়। এ ঘটনায় আটক দুইজনসহ হাইমচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মামুন খানকে আসামী করে হাইমচর থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমান হোসেন বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার পর থেকে মামুন খান পলাতক রয়েছেন। তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এ ঘটনার পর থেকে হাইচরে স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা হচ্ছে।
এদিকে হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বৈশাখী বড়ুয়া উপজেলার বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করে প্রচুর নকল উদ্ধার করেছেন। বিশেষ করে হাজীগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়, বাকিলা উচ্চ বিদ্যালয়, বলাখাল জেএন উচ্চ বিদ্যালয়, বড়কুল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও রামপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে প্রচুর নকল উদ্ধার করা হয়। এ প্রসঙ্গে বৈশাখী বড়ুয়া বলেন, আমি প্রতিদিন ৪/৫টি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনে যাই। যেখানে বেশি নকল পাওয়া যায়, সব পরীক্ষার্থীর দেহ সার্চ করে নকল বের করে সেখানেই থাকি। এক প্রশ্নের জবাবে বৈশাখী বড়ুয়া বলেন, যতদূর শুনেছি, জেনেছি ৪/৫টা ফেসবুক পেইজ থেকে প্রশ্নগুলো প্রকাশ করা হয়। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আমি সকাল বেলায় নিজে থানায় উপস্থিত হয়ে প্রশ্নপত্র বিতরণ করি। তিনি আরো বলেন, পরীক্ষা সংক্রান্ত ও নকলের বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ তাঁকে কার্যালয়ে ডেকেছেন। আগামীকাল সোমবার তিনি মন্ত্রীর সাথে দেখা করার জন্য ঢাকায় যাবেন।
বলাখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোঃ মাসুদ হোসেন বলেন, আমার মেয়ে এবার পিইসি পরীক্ষা দিচ্ছে। সে বিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী। কিন্তু যেভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, পরীক্ষার আগে ছেলেমেয়েরা প্রশ্ন ও উত্তরপত্র হাতে পাচ্ছে, এতে ভাল ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য রইল না। হাজীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার আগেই ডেকে বিদ্যালয় থেকে প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র দেয়া হচ্ছে। পরদিন দেখা যায় হুবহু উত্তরপত্র মিলে যাচ্ছে। এ ধরনের পরীক্ষা নেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নাই।
বাকিলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব মোঃ মজিবুর রহমান বলেন, বাংলা বিষয়ের পরীক্ষার দিন ইউএনও স্যার বাচ্চাদের তল্লাশি করে বস্তাভর্তি নকল উদ্ধার করেছেন। এগুলো দেখে মনে হচ্ছে বাচ্চারা আগে প্রশ্নপত্র পেয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মাধ্যমে উত্তরপত্র লিখে নিয়েছেন।
হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বুলবুল সরকার বলেন, নকল সরবরাহ ও বিভিন্ন অনিয়মের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত ১২জন শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজনকে শোকজ করা হয়েছে। তিনি জানান, শোকজ করা তিনজন রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আলমগীর হোসেন, তাহমিনা বেগম ও হাছিনা আক্তারকে পরীক্ষার হলে পরীক্ষার্থীদের বই কেটে নকল সরবরাহ ও খাতায় লিখে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।
