চাঁদপুর সড়ক বিভাগের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশের সিএন্ডবি খাল পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দিনে দিনে এই খালকে মেরে ফেলা হয়েছে। আর এ কারণে এ মহাসড়কের উপর অবস্থিত অনেক সেতু বা কালভার্টের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। বাস্তবতায় এ খালটি কালের সাক্ষী হয়ে থাকলেও বর্ষা মৌসুমে কিংবা বন্যার পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম এটি। এদিকে এ খালটি প্রকৃতপক্ষে কোনো খাল নয়, শুধুমাত্র সড়ক তৈরির সময় মাটি কাটার কারণে খাল তৈরি হয়েছে, এমনটাই বলছেন সড়কের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তা। আবার সড়কের বার্ষিক লিজ প্রথার কারণে অনেকেই লিজের নামে খালটি ভরাট করে বাড়ি.মার্কেট কিংবা স্থাপনা তৈরি করে নিয়েছে অনেক আগেই। খালটি পুনঃ উদ্ধার করলে এ অঞ্চলের পানি দ্রুত নেমে যাবে আর বন্যা অনেকাংশে কমে যাবে বলে অনেকেই বলছেন।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালে সিএন্ডবি (কমিউনিকেশন এন্ড বিল্ডিং) সংস্থাটি ভেঙ্গে দু ভাগ হয়। একটি অংশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডব্লিউডি) ও অপর অংশ রোডস্ এন্ড হাইওয়ে (আরএইচডি ) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর পরেও স্থানীয়রা এ খালটিকে সিএন্ডবি খাল হিসেবে বলে থাকে। চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়ক তৈরির সময়ে সড়ক বিভাগ সড়কের পাশে এ খাল তৈরি করে। ৯০ দশক পর্যন্ত খালটি এ অঞ্চলের মানুষের কাছে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি ছিলো। ৯০ দশকের পরে সড়কের পাশের জমির দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আর স্থানীয়দের আবাসিক কিংবা ব্যবসায়িক স্থাপনা নির্মাণ করতে গিয়ে খালটি ভরাট করতে শুরু করে। এ খাল ভরাটের ক্ষেত্রে সড়কের লোকজন প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালন করে।
হাজীগঞ্জের উত্তরের কাপাইকাপ এলাকার আবুল খায়ের (৬০), নাসিরকোট এলাকার হোসেন মিয়া (৫৫), মেনাপুর এলাকার রহিম মিয়া (৪৫) ও আবুল খায়ের (৬০) এ খাল সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, স্বাধীনতার পরে আমরা দেশের বাড়ি থেকে হাজীগঞ্জ বাজারে যেতে হলে এ খাল দিয়ে নৌকায় করে যেতাম। মিঠানিয়া খাল ধরে হাজীগঞ্জ বাজারস্থ শ্রীশ্রী রাজালক্ষ্মী জিউর আখড়ার সামনে দিয়ে গাজীর খাদা নামকস্থানে নৌকা ভিড়াতাম। তখন আমরা দেখতাম মতলব, নারায়ণগঞ্জ, দাউদকান্দিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বাণিজ্যিক কাজে বড় বড় নৌকা নিয়ে এ গাজীর খাদায় নৌকা ভিড়াতো। বর্তমানে গাজীর খাদায় জেলা পরিষদের প্রস্তাবিত মার্কেট নির্মাণের লক্ষ্যে বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া ঐ সময় শ্রীশ্রী রাজালক্ষ্মী নারায়ণ জিউর আখড়ার সামনে দিয়ে সিএন্ডবি খালটির অবস্থান ছিলো। এ খালের উপর উঁচুৃ ব্রিজ ব্যবহার করেই আখড়ার পূজারীরা যাতায়াত করতো। এখন এ খালের উপরেই বিশাল আখড়া মার্কেট।
সরজমিনে দেখা যায়, একসময়ের সিএন্ডবি খাল হাজীগঞ্জের গাজীর খাদা (বর্তমানে জেলা পরিষদের প্রস্তবিত মার্কেট) থেকে সোজা ধেররা-বলাখাল-কৈয়ারপুল পর্যন্ত বিস্তৃত। কৈয়ারপুলের রেলক্রসিং পার হয়ে সাতবাড়িয়ার রাস্তার মাথা থেকে শুরু হয়ে বাকিলা-দেবপুর-মহামায়া-পল্লী বিদ্যুৎ-ঘোষের হাট, চাঁনখার দোকান হয়ে সোজা বাবুরহাট বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। বর্তমানে এর বাস্তবতা একেবারে ইতিহাস। খালের এ অংশের মধ্যে বর্তমানে হাজীগঞ্জ বাজার থেকে মিঠানিয়া সেতু পর্যন্ত পুরোপুরি ভরাট হয়ে দখলে চলে গেছে। মিঠানিয়া সেতুর পশ্চিম পাশে এসে প্রথমে খালের উপর সড়ক করে ব্রাক। এর পরে ধেররা এলাকায় পুরো খালকে মেরে মার্কেটসহ বেশ কিছু স্থানে স্থায়ী স্থাপনা ইতিমধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে।
জেলার উত্তর অঞ্চলের পানি দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে ডাকাতিয়ায় নামার একমাত্র মাধ্যম সিএন্ডবি খাল ও সেতু। এই দুটির একটি অচল হয়ে গেলে বর্ষা মৌসুমের কিংবা বন্যার পানি নিষ্কাশনের জন্যে আর কোনো মাধ্যম থাকে না। খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমের পানি সম্প্রতি বছরগুলোতে দেরিতে নামতে দেখা যায়।
অন্যদিকে হাজীগঞ্জ সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এ খালের উপর কেউ স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে উক্ত স্থান লীজ এনেই তাতে বক্স করেই যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে। আর এই লীজের মেয়াদকাল এক বছর। অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী সিএন্ডবি খাল মেরে ফেলার জন্য সড়কের এই পদ্ধতি একাই যথেষ্ট।
অপরদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লীজ না এনে সড়কের লোকদের ম্যানেজ করে খাল ভরাট করে ফেলা হয়েছে এমন উদাহরণ আছে অনেক। এর মধ্যে কৈয়ারপুল এলাকায় অবস্থিত সড়কের উত্তর পাশের স মিলের বর্তমান সড়কটি লিজ না এনে সড়কের লোক ম্যানেজ করেই খাল ভরাট রাস্তা করা হয়েছে। আবার খালের উত্তর পাশে যাদের বাড়ি রয়েছে তারা গেলো এক দশকে বাঁশের সাঁকো ভেঙ্গে খালের উপর সড়ক তৈরি করে নিয়েছে। কিন্তু লিজ কি জিনিস তা তারা জানে না বা জানতে চায়না।
হাজীগঞ্জ উপজেলার বাকিলা বাজারের প্লাজা মার্কেটের স্বত্বাধিকারী আঃ করিম সর্দার বলেন, আমরা সড়ক বিভাগ থেকে লিজ এনে সামনের খালটি নিজেদের খরচে ভরাট করে নিয়েছি। অপর এক প্রশ্নে করিম সর্দার বলেন, সড়ক বিভাগ খাল খননের বিষয়ে ব্যবস্থা নিলে আমার মার্কেটের সামনে সৌন্দর্য বর্ধনকারী সেতু তৈরি করে নেবো। তবুও আমরা চাই খালটি পুনঃউদ্ধার হোক।
খোঁজ নিয়ে ও সরজমিনে আরো দেখা যায়, উক্ত সড়কের হাজীগঞ্জ অংশের আওতাধীন কৈয়ারপুল এলাকায় সড়কের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু রয়েছে। এ সেতুর নিচ দিয়ে দক্ষিণে ডাকাতিয়ায় পানি চলাচল করতো। কৈয়ারপুল এলাকার সিএন্ডবি খালের পূর্ব পাশে স মিল আর পশ্চিম পাশে নতুন নতুন বাড়ি হওয়ায় সড়কের উপর অবস্থিত মূল সেতুটি বন্ধ হয়ে গেছে। সড়ক বিভাগের এ রকম আরো বেশ কয়েকটি সেতু একই কারণে অচল হয়ে গেছে।
সরজমিনে ঘুরে আরো দেখা যায়, সিএন্ডবি খাল পার হয়ে উত্তর দিকে চলে যাওয়া সড়ক সমূহের কিছু অংশে ভরাট করে একেবারে স্থায়ী সড়ক তৈরি করা হয়েছে। আবার কিছু অংশে এখনো সেতুই ব্যবহার হচ্ছে।
এ বিষয়ে চাঁদপুর সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহেদ হোসেন বলেন, আসলে এটি কোনো খাল নয়। এ সড়ক তৈরির সময় মাটির প্রয়োজনে খালটি তৈরি হয়। তারপরেও যারা সড়কের পাশে বাড়ি তৈরি করে তারা যেনো পানি নিষ্কাশনের জায়গা রেখে বাড়ির প্রবেশ পথ তৈরি করে এমন নির্দেশনা তাদের আমাদের দেয়া আছে।

