চাঁদপুর:
শরীয়তপুর, মাদারীপুর তথা বৃহত্তর ফরিদপুর হচ্ছে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এ অঞ্চলসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৫ জেলার সড়ক যোগাযোগ সহজতর করতে স্বাধীনতার পর থেকে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জোরালো দাবি ছিল। সেই দাবির প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের সাথে মংলা সমুদ্র বন্দরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পঁচিশ জেলার সড়ক যোগাযোগের যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার।
২০০১ সালের ২৫ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান মহাজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেঘনা নদীর উপর চাঁদপুর-শরীয়তপুর নৌ-ফেরি সার্ভিস চালু করেন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে। তখন এ রূটে অত্যাধুনিক দুটি রো-রো ফেরি দেয়া হয়। অজ্ঞাত কারণে কিছু দিন পর ফেরি দুটি সরিয়ে নিয়ে সেখানে পুরাতন দুটি ফেরি দেয়া হয়। পরবর্তীতে দুই জেলার সীমান্ত এলাকায় দুটি ফেরি টার্মিনাল নির্মাণ করে বিআইডব্লিউটিএ। তৎকালীন নৌ-মন্ত্রী লে. কর্নেল আকবর হোসেন (অবঃ) বীর প্রতীক ২০০৪ সালের ৮ ডিসেম্বর হরিণা ফেরি টার্মিনালের উদ্বোধন করেন। পরে শরীয়তপুর ফেরিঘাট সংলগ্ন ঈদগাহ বাজারে ফেরি টার্মিনাল নির্মিত হয়। ফেরি উদ্বোধনের পর থেকে সড়ক যোগাযোগের নতুন দিগন্তের সূচনা হলেও আজ এক যুগ পার হতে চলেছে, কিন্তু চাঁদপুর-শরীয়তপুর ফেরি সার্ভিস এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি। দিনে দিনে এ রূটে গাড়ির সংখ্যা এবং যাত্রী পারাপার বৃদ্ধি পেলেও নানা সমস্যায় যাত্রী সাধারণ, গাড়ির চালকদের সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে ৩ টি ফেরি এ রুটে চলাচল করছে। ফেরি করবী, ফেরি কস্তুরী ও ফেরি কিশোরী। এ তিনটি ফেরি অধিক পুরানো হওয়ায় প্রায় সময় চলাচল করতে গিয়ে অচল হয়ে পড়ে। গাড়ি ও যাত্রী নিয়ে রাতের পর রাত ফেরিতেই অবস্থান করতে হয়। বিআইডবি্লউটিএ চাঁদপুর-শরীয়তপুর ফেরি নৌ-রূটের যে চ্যানেল গড়ে তোলে গত ১ বছর যাবৎ সেই চ্যানেলটি পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে। এই চ্যানেলে এপার-ওপার ফেরি পারাপার হতে সময় নিত তখন মাত্র ১ ঘণ্টা। নৌ-চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে নৌ-চ্যানেল নির্ধারণ করে দেয় বিআইডব্লিউটিএ। হরিণা-ঈশানবালা-আলুর বাজার ভায়া নরসিংহপুর নতুন চ্যানেলে এখন ফেরি পারাপারে সময় নিচ্ছে ৩ ঘন্টা। পুরানো নৌ-চ্যানেল উদ্ধারে খনন কাজ করা হচ্ছে না।
বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুর-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও সিপিএস মোঃ শাহজাহান চাঁদপুরনিউজ২৪ডটনেটেকে জানান, এ বছর অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে চ্যানেল খনন কাজ করা হয়নি। এ ব্যাপারে প্রস্তাবনা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল রয়েছে। আগামী বছর এ চ্যানেল স্বাভাবিক করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা। ইদানীং এ ফেরি সার্ভিসে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মেঘনার ভাঙ্গন। হরিণা ফেরি ঘাটের প্রায় ১শ’ মিটার এলাকা ইতিমধ্যে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিকল্প ঘাট না থাকায় নদী ভাঙ্গনে কয়েক দফা ঘাট পন্টুনসহ র্যাম সরিয়ে স্থাপন করতে হয়েছে। সে সময় এক দিন ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত নদী ভাঙ্গন থেকে হরিণা ঘাট রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
অপরদিকে দুর্ভোগের শিকার গাড়ি চালকরাচাঁদপুরনিউজ২৪ ডটনেটেকে জানান, শরীয়তপুর-মাদারীপুর সড়ক বিভাগের অধীন ফেরি সড়কের অনেকাংশ রাস্তাই খারাপ। শরীয়তপুর শহর থেকে ফেরিঘাট মুখী ভেদেরগঞ্জ উপজেলার ২০/২৫ কিলোমিটার রাস্তা এতটাই নাজুক যে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে এ পথে গাড়ি চলাচল করতে হয়। তার মধ্যে টেকেরহাট ও আঙ্গারীয়ায় দুটি পুরাতন বেইলি ব্রিজ ভীষণ খারাপ। সেই ব্রিজে গাড়ি পারাপার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
চাঁদপুর-শরীয়তপুর ফেরি সার্ভিসের ম্যানেজার ইমরান খান চাঁদপুরনিউজ২৪ ডটনেটেকে জানান, এখন প্রতিদিন দেড় থেকে ২শ’ গাড়ি পারাপার হচ্ছে। ফেরি সার্ভিস স্বাভাবিক রাখতে হলে আগের নৌ-চ্যানেল ঠিক করতে হবে। পুরাতন ফেরির বদলে রো-রো ফেরি প্রয়োজন। এছাড়া নদী ভাঙনের কারণে বিকল্প আরেকটি ঘাট হরিণা ঘাটে অপরিহার্য। এদিকে শরীয়তপুর ফেরিঘাটের টার্মিনাল সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। শরীয়তপুর ঘাটের ইনচার্জ হুমায়ুন কবির জানান, অপরিকল্পিতভাবে শরীয়তপুর ফেরিঘাটের টার্মিনালটি নির্মাণ করায় সেটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দেশের ফেরি সার্ভিস সমূহের অন্যতম চাঁদপুর-শরীয়তপুর ফেরি সার্ভিস। এ রূট চালু হওয়ায় খুলনা, বরিশাল, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ চট্টগ্রামের সাথে প্রায় ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ কিলোমিটার সড়কের দূরত্ব কমে এসেছে। এ রুটে নির্মাণ সামগ্রী, খাদ্য পণ্যসহ মূল্যবান অনেক পণ্য নিয়ে ট্রাক পিকআপ, কভার্ড ভ্যান চলাচল করছে। ফেরি পারাপারে ৩ ঘণ্টা সময় নেয়ায়, পুরাতন ফেরি এবং রাস্তার দুরবস্থার কারণে তাদের দুর্ভোগ দুর্দশা নিত্য সঙ্গী। দিন-রাত ঘাটে গাড়ি নিয়ে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। যাত্রী সাধারণের দুর্ভোগ আরো চরমে। যতই দিন যাচ্ছে, চাঁদপুর-শরীয়তপুর ফেরি সার্ভিসের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু ফেরি পারাপার এবং ফেরি সংলগ্ন রাস্তার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এবং নৌ-চ্যানেল স্বাভাবিক না থাকায় একের পর সমস্যায় এ রূটে যাত্রী ও গাড়ির চালক এবং ব্যবসায়ীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিরূপায় হয়ে তারা এ পথে যাতায়াত করছে। ফেরির সমস্যাগুলো সমাধানে কর্তৃপক্ষ তেমন আন্তরিক ভূমিকা রাখছে না।
আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এবং সেই সব এলাকার বৃহত্তর জনস্বার্থে যেই ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছিল, আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় থাকতে এমন পরিস্থিতি ভুক্তভোগীরা কখনই আশা করেন না। প্রতি বছর চ্যানেল খনন, নতুন রো-রো ফেরি স্থাপন, বিকল্প ঘাট নির্মাণ, রাস্তার অবকাঠামো উন্নয়ন হলে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান হবে এবং এ রূটে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার অনেক সহজতর হয়ে উঠবে এবং সরকার এ থেকে বিপুল অংকের রাজস্ব পাবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ উদ্যোগ এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে ভুক্তভোগীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
