
কবির হোসেন মিজি
নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে আড়াইশ’ শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতাল। রোগীদের খাওয়া-দাওয়াসহ চিকিৎসা সেবায়ও পাওয়া গেছে নানা অভিযোগ।
বেশ ক’ মাস ধরে লক্ষ্য করা যায় বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে আছে চাঁদপুরের প্রধান এ চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রটি। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, বারান্দা এবং এর এরিয়ার ভেতর ঘুরে দেখা যায় একজন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে যা করণীয় এবং যে সুন্দর পরিবেশের প্রয়োজন সে ক্ষেত্রে বর্তমানে হাসপাতালে সে রকম পরিবেশ নেই বললেই চলে। এর মধ্যে রয়েছে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা পরিবেশ। বাথরুমের ভেতরও ময়লা আবর্জনাসহ ফ্লোরে পানি জমে থাকে এবং পেয়িং বেড, মহিলা ওয়ার্ড, পুরুষ ওয়ার্ড, শিশু ওয়ার্ডসহ বেশ ক’টি রুমে টয়লেটের দরজা এবং পানির কল ভাঙ্গা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এমনকি দু’ একটি টয়লেটের দরজা একেবারেই নেই। এর ফলে রোগী এবং রোগীদের সাথে আসা লোকজন অনেক লজ্জা এবং দ্বিধা সংকোচের মধ্য দিয়ে বাথরুমে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হয়। এর বাইরেও রয়েছে আরো নানা সমস্যা যেমন- রাতের বেলা হাসপাতালের বারান্দা ও সিঁড়ির রুমে লাইট থাকা সত্ত্বেও তা ঠিকমতো না জ্বালানো। প্রতিদিনই রাতের বেলা দেখা যায় হাসপাতালের ৪র্থ তলার ঢালের সিঁড়িটির মুখে এবং আরো ক’টি স্থানে অন্ধকারে ঢেকে থাকার কারণে অনেক
কপোত-কপোতী এবং বহিরাগতরা অন্ধকারের আবডালে দাঁড়িয়ে অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। বিভিন্ন ওয়ার্ডে রাতের বেলায় কোনো পুরুষ দারোয়ান না রেখে সেখানে হাসপাতালের আয়াদের দিয়ে রাতের বেলায় দারোয়ানের কাজ সারানো হয়। বর্তমানে হাসপাতালের অনেক কিছুই ঠিকমতো তদারকি না হওয়ায় এসব সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে সরকারি এ হাসপাতালটি। এ সকল বিভিন্ন সমস্যার শিকার হয়ে ভুক্তভোগী অনেক রোগী জানান, এতো সমস্যার বাইরেও হাসপাতাল থেকে দেয়া রোগীদের প্রতিদিনের খাওয়া-দাওয়ায় চলছে অনিয়ম। প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী রোগীদের যে সকল খাবার দেয়া এবং যে পরিমাণ ভাত-তরকারি দেয়ার কথা তারা রুটিন অনুযায়ী তা রোগীদের ঠিকমতো দেয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে হাসপাতালে অনেক দিন পূর্বে ভর্তি হওয়া পুরুষ ওয়ার্ড, শিশু ওয়ার্ড এবং মহিলা ওয়ার্ডের বেশ কিছু রোগীর সাথে আলাপকালে তারা জানায়, হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার দেয়া হয়। এর মধ্যে সকালে কলা, রুটি, ডিম ও দুপুর এবং রাতে দু’ বেলা ভাত দেয়া হয়। তা তারা দেয় ঠিকই কিন্তু সেখানেও চলে অনিয়ম। একজন লোকের পেট ভরে ভাত খেতে হলে যে পরিমাণ খাবারের প্রয়োজন তারা তা দিচ্ছে না। যে পরিমাণ ভাত দেয়া হয় সে ক্ষেত্রে দু’ জন লোকের খাবার একত্রিত করলেও একজন লোকের খাওয়ার পরিমাণ তা হবে না। আবার এর মধ্যেও চলে স্বজনপ্রীতি। যারা পরিচিত তাদেরকে ভাতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। সোজা কথা হচ্ছে তারা রোগীদের এক মুঠো ভাত দেন। এর সাথে শুধু আলুর চরচরি ও এক পিচ পাঙ্গাস মাছ। অথচ প্রতিদিনের খাবার রুটিনে রয়েছে সপ্তাহের তিনদিন মাংস, একদিন রুই মাছ, বাকি দিনগুলো পাঙ্গাস কিংবা অন্যান্য মাছ।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে রোগীরা জানায়, প্রতি শুক্র এবং রোববার মুরগির মাংস দেয়া হয়। তাও যৎসামান্য। আর সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেই শুধু পাঙ্গাস মাছ ছাড়া আর অন্য কোনো মাছ দেয়া হয় না। এর সাথে শুধু আলু দিয়ে ঝোলের তরকারি দেয়া হয়। রোগীদের খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ম করে এবং তাদের ঠকিয়ে প্রতিদিনই এর কিছু অংশ হাসপাতালের বাবুর্চি বৃদ্ধার ব্যাগে করে চলে যায় তার বাসায় এমন কথাও এ প্রতিবেদককে জানান বৃদ্ধা বাবুর্চির সহকারী ও হাসপাতালের ক’জন আয়া।
সরকারি এ হাসপাতালটিতে শুধু খাওয়া-দাওয়াতেই অনিয়ম নয়, চিকিৎসা সেবায়ও রয়েছে অনিয়মের নানা অভিযোগ। হাসপাতালের অনেক ডাক্তারই এখন হাসপাতালে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দিয়ে অধিকাংশ সময়ই প্রাইভেট চেম্বারে বসে রোগী দেখেন। আর হাসপাতালে ডাক্তারদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা ডাক্তারের জন্য অপেক্ষায় থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রোগীদের অপেক্ষার এমন বাস্তব চিত্র দেখা গেলো গত ৭ জুন শনিবার আবাসিক সার্জন বিভাগের ডাঃ মোঃ শাহাদাত হোসেনের কক্ষের সামনে। ওই দিন সকাল থেকেই তার কক্ষের ভেতর এবং বাইরে রোগীদের প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বেলা সাড়ে ১২টার পরও ডাঃ শাহাদাত হোসেনের আসার কোনো খবর নেই। তার এক সহকারীর কাছে জানতে চাওয়া হয় ডাক্তার সাহেব কোথায়? তিনি জানান, স্যার অপারেশন রুমে। কিন্তু অপারেশন কক্ষে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায় ডাঃ শাহাদাত হোসেন সেদিন ডিউটিতেই আসেননি। কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো সে রুমের দরজায় লাগানো তালা। একই দৃশ্য দেখা যায় ডেন্টাল সার্জন ডাঃ মুহাম্মদ ইমরান হোসেনের কক্ষের সামনে। ওই দিন একই সময়ে তার বসার কক্ষটিতে তালা ঝুলতে দেখা যায়। এ ছাড়াও আরো বেশ ক’জন ডাক্তারের কক্ষে গেলে তাদেরকে ওই সময় কক্ষে পাওয়া যায়নি। অথচ কক্ষের বাইরে অপেক্ষায় থাকা রোগীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ডাক্তারদের সহকারীকে জিজ্ঞেস করলে অপারেশন কক্ষে কিংবা মিটিংয়ে আছে বলে রোগীদের মিথ্যে কথা শোনায়। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, তারা তার কোনো স্থানেই নেই। তারা সেদিন হাসপাতালেই আসেননি। এভাবেই চলছে এখন আড়াইশ’ শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসা সেবা। এখানেই শেষ নয়, এর বাইরেও রয়েছে আরো নানা অভিযোগ। এর মধ্যে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডাঃ হামিমা খাতুনের বিরুদ্ধে রোগীদের কাছ থেকে পাওয়া যায় একাধিক অভিযোগ। তিনি হাসপাতালের স্টাফসহ রোগীদের সাথেও সব সময় খারাপ আচরণ করেন। একজন রোগীর সাথে বিনয় ও সুন্দরভাবে কথা না বলে ধমক দিয়ে কথা বলার কারণে তখন দেখা যায় রোগীরা তার ভয়ে রোগের সঠিক বিবরণ বলতে পারে না। গত ৪ জুন বুধবার হাসপাতালে পিংকি আক্তার নামে এক ডেলিভারি রোগীকে নিয়ে আসা তার মা তাসলিমা আক্তার এবং তার সাথের শেফালী বেগম ডাঃ হামিমা খাতুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, আমরা আমাদের ডেলিভারীর রোগীর প্রচণ্ড ব্যাথা দেখে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসি। সেখান থেকে আমাদের টিকেট দিয়ে পাঠানো হয় ডিউটিরত ডাঃ হামিমা খাতুনের কাছে। সেখানে তার কাছে গেলে তিনি আমাদের সাথে চেঁচামেচি করে বলেন, এখানে আপনাদের কে পাঠিয়েছে? এ বলে জরুরি বিভাগের লোকজনকেও বকাঝকা করেন তিনি। আমাদের ডাঃ ফাতেমা খাতুনের কাছে যাওয়ার কথা বলেন। আমরা ডাক্তার ফাতেমাকে না পেয়ে পুনরায় আবার জরুরি বিভাগে ফিরে যাই। তখন তারা জানায়, ডাঃ ফাতেমা ওই কক্ষে বসেন না, তিনি বসেন ওটিতে। এ দিকে আমাদের রোগীর অবস্থাও ভালো না। কিন্তু আমরা রোগীকে ভর্তি করার জন্য ডাক্তার থাকা সত্ত্বেও এদিক সেদিক ছুটোছুটি করছি। পরে জরুরি বিভাগের লোকজন ডাঃ হামিমার বকাঝকায় টিকেটটি ছিড়ে ফেলে আউটডোর থেকে টিকেট করে আমাদের রোগীকে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। আমরা তাদের কথামতো টিকেট করে ২১৮ নম্বর কক্ষে গিয়ে যোগাযোগ করলে তার সেখান থেকে ডাঃ সিরাজ স্যারের সাক্ষরের জন্য পাঠায়। এভাবে প্রায় আমরা এক দেড় ঘণ্টা ঘুরতে থাকি। ওই খানেও ডাঃ সিরাজকে না পেয়ে পরে আমরা বাধ্য হয়ে আমাদের রোগীর অবস্থা ভালো না দেখে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে এনে ভর্তি করাই। অপরদিকে একইভাবে গত দু’ দিন আগে আরেকজন ডেলিভারীর রোগীকে এ হাসপাতালে ভর্তি দেয়া হয়নি বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোগীর লোকজন জানায়। পরে তারাও বাধ্য হয়ে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে তাদের রোগীকে ভর্তি করায়।
