
চাঁদপুর রিপোর্ট ==
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চাঁদপুরে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের মধ্যে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়লেও বিরোধী শিবির সুনসান। চাঁদপুরের ভোটাররা প্রার্থীর চেয়ে প্রতীককে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এলাকার উন্নয়ন আর প্রার্থীর জনপ্রিয়তা তাঁদের কাছে বড় কথা নয়।
নবম জাতীয় সংসদের আগের চারটি নির্বাচনে জেলার বেশির ভাগ আসনই বিএনপির দখলে ছিল। গত নির্বাচনে চাঁদপুরে পাঁচটি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছে চারটি আর বিএনপি একটি।
চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসনের বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীর ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আগেরবার এমপি ছিলেন বিএনপির আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সেবার তিনি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন। গত তিনটি নির্বাচনে এ আসন থেকে যিনিই নির্বাচিত হন তিনিই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ফলে কচুয়ায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে ব্যাপক। জেলাবাসীর কাছে কচুয়া হচ্ছে ভিআইপি আসন। তবে রাজনীতির চর্চা একটু ভিন্ন। কচুয়ার করাইশ গ্রামের লিয়াকত আলী বলেন, যখন যেই দল ক্ষমতায় তখন তার রাজত্ব। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আর বিএনপির নেতা-কর্মীরা ঘরছাড়া। আবার যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারও এ আসন থেকে ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন। আর বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে দলের প্রার্থী হবেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন। কচুয়ার কোয়া গ্রামের বীমাকর্মী রফিকুল ইসলাম বলেন, এলাকার কোনো ইস্যু নয়, জাতীয় বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রতীক দেখে এখানকার ভোটাররা প্রার্থী নির্বাচিত করেন।
চাঁদপুর-২ (মতলব উত্তর ও দক্ষিণ) আসনের বর্তমান এমপি মহাজোটের এম রফিকুল ইসলাম। আগের নির্বাচনে মতলব উত্তর এবং দক্ষিণ ও চাঁদপুর সদরের একাংশ নিয়ে দুটি আসন ছিল। উত্তরে ছিলেন বিএনপির মো. নুরুল হুদা। অন্যদিকে দক্ষিণে ছিলেন একই দলের জি এম ফজলুল হক। বর্তমানে বৃহত্তর মতলবের এ আসনে প্রধান দুই দলের মধ্যে কোন্দল লেগেই আছে। গত বছর এমপি রফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারী খবির হোসেন অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার হয়ে প্রাণ হারান। এ নিয়ে সমালোচনার মধ্যে পড়েন এম রফিকুল ইসলাম। এ কারণে আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ এবার মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার পক্ষে নতুন করে মাঠে নেমেছে। অন্য একটি অংশ বর্তমান এমপি এম রফিকুল ইসলামকে ঘিরে কাজ করছে। এর বাইরেও মনোনয়ন চাইবেন মতলব উত্তর উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান।
দুই মতলবে বিএনপিও দ্বিধাবিভক্ত। দক্ষিণে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন সাংগঠনিকভাবে চাঙ্গা থাকলেও উত্তরে অনেকটা নিষ্ক্রিয়। নেতা-কর্মীদের কেউ সাবেক এমপি মো. নুরুল হুদার পক্ষে, আবার কেউ কেন্দ্রীয় নেতা ড. মো. জালালউদ্দিনের পক্ষে। বিগত চারদলীয় জোটের শাসনামলে দুই মতলবে কিছু উন্নয়ন হলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ধনাগোদা নদীর ওপর সেতু না হওয়ায় আগামী নির্বাচনে ভোটারদের মন ভোলানো কঠিন হবে। এবার মো. নুরুল হুদা ও ড. জালালউদ্দিন ছাড়াও দলের মনোনয়ন চাইবেন মতলব দক্ষিণ উপজেলা চেয়ারম্যান মো. শুক্কুর পাটোয়ারী।
জাতীয় পার্টির মিজানুর রহমান ও এমরান হোসেন এবার দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী।
চাঁদপুর-৩ (সদর ও হাইমচর) আসনের বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। তাঁর আগে এমপি ছিলেন বিএনপির এস এ সুলতান টিটু ও জি এম ফজলুল হক। গত নির্বাচনে দলীয় কোন্দলের মাঝেও প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দীপু মনি নির্বাচিত হন। এখনো দলের কোন্দল তাঁকে তাড়া করছে। মেঘনাপারের চাঁদপুর ও দক্ষিণে হাইমচর উপজেলাবাসীর দুঃখ ছিল নদীভাঙন। সেই দুঃখ অনেকটা ঘুচিয়েছেন দীপু মনি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ আরো বেশ কিছু স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে এ আসনে। তার পরও নানা কারণে সমালোচনা পিছু ছাড়ছে না দীপু মনির। এবার তিনি ছাড়াও দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় নেতা সুজিত রায় নন্দী, সাবেক ছাত্রনেতা জাকির হোসেন মারুফ ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. ইউসুফ গাজী।
বিএনপির পক্ষে মাঠে আছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। চাঁদপুরে দলের প্রথম সারির অনেক নেতাই তাঁর পক্ষে। তবে এক সময়ের জেলা যুবদলের সভাপতি সফিকুর রহমান ভূঁইয়া, বিএনপির মুনির চৌধুরী, জসিমউদ্দিন খান বাবুল, আনোয়ার হোসেন বাচ্চু, ছাত্রদলের রফিউস শাহাদাত ওয়াসিম, জাহাঙ্গীর হোসেন, সদ্য বহিষ্কৃত ইব্রাহিম কাজী জুয়েল মূলধারার বাইরে আছেন। দলের নেতারা ঐক্যবদ্ধ না হলে হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। এবার মনোনয়ন চাইবেন শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, সাবেক এমপি জি এম ফজলুল হক, এস এ সুলতান টিটু, অধ্যাপক এম আব্দুল্লাহ ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুবুর রহমান শাহীন।
জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এ এস এম আলম ও অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন। জামায়াতের জেলা কমিটির নায়েবে আমির অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম পাটোয়ারী।
চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনের বর্তমান এমপি বিএনপির লায়ন মো. হারুনুর রশিদ। তাঁর আগে একই দলের আলমগীর হায়দার খান টানা চারবার এমপি ছিলেন। গত সংসদ নির্বাচন আর পৌর নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নেয়। এ কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত হন সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত এম এ হান্নান ও পৌর মেয়র মঞ্জিল হোসেন। বর্তমান এমপি লায়ন হারুনুর রশিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মূল দলসহ, ছাত্র ও যুবদলের একাংশ। এমপি নিজেই উপজেলা বিএনপির সভাপতি। রাজনীতিতে নতুন মুখ হলেও বিএনপির ভোটব্যাংকের কারণে তিনি পূর্বসূরির আসনটি ধরে রাখেন। দলের সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন মোতাহার হোসেন পাটোয়ারী। দলের বাইরে নানা সামাজিক কাজে তিনি যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করছেন। হারুন, মোতাহার ও হান্নান এই তিন নেতার মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলছে। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে নেতা-কর্মীরা অনেকটা বিভক্ত। বিএনপির দুর্গ হিসেবে খ্যাত ফরিদগঞ্জে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ না হলে আগামী নির্বাচনে প্রতিপক্ষের কাছে হার মানতে হবে। এবার দলের মনোনয়ন চাইবেন লায়ন হারুনুর রশিদ, মোতাহার হোসেন পাটোয়ারী ও এম এ হান্নান।
জামায়াতের প্রার্থী হতে পারেন জেলা আমির এ এইচ আহম্মদ উল্যাহ মিয়া।
ফরিদগঞ্জে আওয়ামী লীগের কোন্দল নতুন নয়। প্রতিবারই জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রথম সারির নেতাদের বিভাজনের কারণে হার মানছে দলটি। অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে মনোনয়ন লাভ করেন সাংবাদিক নেতা মুহাম্মদ সফিকুর রহমান। প্রথমবার বড় ব্যবধানে তিনি পরাজিত হন বিএনপির প্রার্থীর কাছে। শেষ নির্বাচনে সেই ব্যবধান অনেকটা কমিয়ে আনেন তিনি। বিএনপির মতো আওয়ামী লীগেও মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়া নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এ আসনে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী জেলা কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী ড. শামছুল হক ভূঁইয়া, জেলা বিএমএর সভাপতি ডা. হারুনুর রশিদ সাগর, আওয়ামী লীগ নেতা আমির আজম রেজা ও সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডভোকেট নুর হোসেন বলাই।
চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসনের বর্তমান এমপি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম। তাঁর আগে ছিলেন বিএনপির এম এ মতিন। মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তিবাসীর কাছে একজন সাদা মনের মানুষ। সরকারি বরাদ্দ পেয়ে সড়ক, বিদ্যালয় ভবন, সেতুসহ বেশ কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছেন। তবে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল তাঁকেও তাড়া করছে। দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগ, যুব ও ছাত্রলীগের মধ্যে বিরোধের কারণে এমপির সঙ্গে অনেকেরই দূরত্ব রয়েছে। নেতারা ঐক্যবদ্ধ না হলে এবার আওয়ামী লীগকে মাসুল গুনতে হবে। এবার সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা ইঞ্জিনিয়ার সফিকুর রহমান, অধ্যাপক ফজলুল হক ও আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট নুরজাহান বেগম মুক্তা।
এ আসনে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের মূল ইউনিটগুলো জেলা কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের পক্ষে। তবে পদবঞ্চিত একটি অংশ সাবেক এমপি এম এ মতিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ আসনে প্রার্থিতা নিশ্চিত ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের। এমন তথ্য দলের হাইকমান্ড সূত্রে জানা গেছে। এবার মনোনয়ন চাইবেন সাবেক এমপি এম এ মতিন ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা বিল্লাল হোসেন তারেক।
