
এযাবতকাল, পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানব সৃষ্ট যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে অতি ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে বর্তমান করোনা (COVID-19) ভাইরাস I এই ভাইরাসের ভীতি অতীতে সংক্রমিত সকল মহামারীকে ছাড়িয়ে গেছে I অজানা, অদৃশ্য, অতিক্ষুদ্র এবং ভয়ংকর করোনা (COVID-19) ভাইরাস মানুষের ক্ষমতা, যশ ও খ্যাতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ছুটে চলছে এক অজানা পথে I এই মহা-তান্ডব সারা মানবকুলে অজ্ঞাত ভয় আর উত্তেজনা কাজ করছে। করোনার প্রাদুর্ভাবের দরুন বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ আজ এক-ঘরে জীবন যাপন করতে বাধ্য I মানুষের শারীরিক অসুস্থতা ও নানা প্রকার জটিল রোগ করোনার ভয়ে ভীত I যা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বড় আশঙ্কার পূর্বাভাস। সরকার কর্তৃক জারীকৃত অস্থায়ী বিধি-নিষেধ বা এলাকাভিত্তিক লকডাউনের কারণে সরাসরি গণযোগাযোগে ব্যত্যয় ঘটছে । তাই সামাজিকভাবে কথোপকথন বা তথ্য আদান প্রদানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই বিকল্প ব্যবস্থা । বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোর মধ্যে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব অন্যতম I সাম্প্রতিককালে, ফেসবুক পোস্ট বা শেয়ার করা তথ্য বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, বেশিরভাগ মানুষ চলমান করোনা পরিস্থিতি নিয়ে অস্বাভাবিক ভাবে উদ্বিগ্ন I বিশেষ করে যুব ও ছাত্রসমাজ হোম-কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন, নতুন করোনা সংক্রমণ এবং করোনা সংক্রমিত নতুন এলাকার অবস্থান নিয়ে ভীত ও শঙ্কিত I আবার কেউ কেউ পারিবারিক ও মানসিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন I
সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকের প্রধান প্রধান পোস্ট বা শেয়ার বলতে দেশের চলমান করোনা ভাইরাসের মোট সংক্রমন, নতুন করণা রোগী, ও কত জনের মৃত্যু হয়েছে ইত্যাদির সংখ্যা নিয়ে প্রচার প্রচারণা চলছে I পাশাপাশি, করোনা ভাইরাসের কারণে জরুরী খাদ্য-সামগ্রী সরবরাহ, সরকারি সহযোগিতা বা গরীব অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণের সংবাদ ছাড়াও গুটিকয়েক স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক ও নৈতিক অধঃপতনের সত্য-মিথ্যা সংবাদে বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক সয়লাব I এছাড়াও, করোনা ভাইরাস ও তৎসম্পর্কিত সত্য, মিথ্যা, গুজব এমনকি নানা প্রকার ভীতিকর তথ্য প্রচার ও শেয়ারের ফলে সমাজে ভাইরাস আতঙ্ক ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে I যার ফলে অধিক সচেতন হওয়ার পরিবর্তে গভীর উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও মানসিক বিষন্নতার মধ্য দিয়ে মানুষের দিন কাটছে I পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং আর্থিকভাবে দেশের মানুষ আজ সংকটাপন্ন I মানুষ আজ কতটা অসহায় তার হিসাব মিলানো প্রায় অসম্ভব I শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল নারী ও পুরুষ আজ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে সময় পার করছেন I জন্মদিনের উৎসব থেকে শুরু করে মৃত্যু পরবর্তী শেষকৃত্যেও নানা প্রকার বাধা-নিষেধ বা জটিলতা তৈরি হচ্ছে I যা মানব সমাজে এক অভূতপূর্ব ঘটনা I
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মানুষের মাধ্যমে ছড়ায় I যদিও এ ভাইরাসটি বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই সংক্রমণ ঘটিয়েছে I রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে জনসাধারণকে বিদেশে গমন বা বিদেশ থেকে ফেরত, এমনকি সামাজিক যোগাযোগের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা এবং সম্প্রতি বিদেশ ফেরত যাত্রীরা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন এবং নানাপ্রকার বৈষম্যের শিকার I উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে অনেকেই স্বপ্ন দেখেছেন নিজ জন্মভূমিতে পা রেখে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে আনন্দে কয়েকটা মাস কাটাবেন I এমনকি প্রবাসীদের আগমন উপলক্ষে পরিবারের সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষারত ছিল I এর পাশাপাশি, অনেক সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ বা সাধারণ মানুষ তাদের পেশাগত, ব্যবসা সংক্রান্ত, উচ্চশিক্ষা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে বিদেশ ভ্রমণে গিয়েছেন I তারা কি কখনো ভেবেছেন এক অজানা অদৃশ্য ভাইরাস তাদের স্বপ্ন ও আনন্দকে লন্ডভন্ড করে দিবে? তারা কি কখনো ভেবেছেন এই অজানা ভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবী শুনশান নীরবতা পালন করবে? তারা কি কখনো ভেবেছেন তাদের কর্মক্ষেত্রে অচল অবস্থা তৈরি হবে? সবকিছুই ছিল অপ্রত্যাশিত I অকল্পনীয় ধাবমান এই করোনা তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে মানুষের জীবন I সাধারণ মানুষ আজ পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বিভক্ত এবং আতঙ্কিত I প্রতিদিন নতুন নতুন স্থানে বা এলাকায় নতুন রোগীর সন্ধান মিলছে I করণা ভাইরাসের সংক্রমণ এবং এর ফলে মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে I যার ফলে, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন মারাত্মক হুমকির মুখে I অন্যদিকে, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, এমনকি গরীব-অসহায় মানুষের মানসিক শক্তি ধৈর্য সীমার তলানিতে এসে পৌঁছেছে I রাষ্ট্রের চিকিৎসা সেবায় প্রত্যাশা অনুযায়ী সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে I এই পরিস্থিতি সামলে উঠতে সরকার ও জনগণ বড় ধরনের সংকটের সম্মুখীন হবেন বলে ধারণা করা যায়I
মানসিক অবস্থান ও বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, বর্তমান করোনা ভাইরাস বা এর সংক্রমণ নিয়ে সাধারণ মানুষ নানাপ্রকার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় এমনকি মানসিক বিষন্নতায় ভুগছেন I করোনায় আক্রান্ত রোগী বা তার পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনকে নানাভাবে সামাজিকভাবে বৈষম্যের শিকার হতে হয় I করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটছে নানা প্রকার সামাজিক বিশৃঙ্খলা I তাই বলা যায়, সামাজিক নিগ্রহ ও বৈষম্য মানসিক বিষন্নতার আরেকটি প্রধান কারণ। মানসিক বিষন্নতা একটি সাময়িক রোগ I চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় যাকে মানসিক স্বাস্থ্যের সাময়িক সমস্যা বলা হয় I গবেষণায় উঠে এসেছে পৃথিবীতে সর্বমোট ৩৫০ মিলিয়নের অধিক সংখ্যক মানুষ মানসিক বিষন্নতায় ভুগছেন I আর্থ-সামাজিক ভাবে এই বিষন্নতার মাত্রা ২০৩০ সাল নাগাদ সারা বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে I কিন্তু, সেই সময় আসার পূর্বেই করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব গবেষকদের ধারণা যথার্থভাবে প্রমাণিত হওয়ার পথে I গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, সমাজে বসবাসরত শতকরা হারে ৫ থেকে ১৭ শতাংশ মানুষ মানসিক বিষন্নতায় ভোগেন I বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এই হার আরো বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা যায় I মানসিক দুঃখবোধ বা মানসিক বিষন্নতা দুইটি আলাদা বিষয় I মানসিক দুঃখবোধ যেকোনো সময় ঠিক হয়ে যায় I কিন্তু, মানসিক বিষন্নতা একটি চলমান প্রক্রিয়া I যা ধীরে ধীরে বড় ধরনের মানসিক রোগে পরিণত হয় I বাবা-মা কিংবা পরিবারের কর্মক্ষম বেক্তিরা নানা প্রকার মানসিক বিষন্নতায় ভোগেন I পারিবারিক কলহ এবং অন্যান্য সমস্যার এড়ানোর জন্য তারা মানসিক বিষন্নতার বিষয়গুলো আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন I কোন কোন সময় এ বিষয়গুলো পরিবারের অন্যরা বুঝতে পারলেও তা স্বীকার করতে অপারগতা প্রকাশ করেন I সাময়িক বিষন্নতা একটা সময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জীবন-যাপনে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় I মানসিকভাবে বিষন্ন ব্যক্তিরা তাদের সচরাচর কথা-বার্তায়, আচার-আচরণ ও অনুভূতি প্রকাশে, কিংবা কর্মক্ষেত্রে প্রান-চাঞ্চল্যতা হারিয়ে ফেলেন I মানসিক বিষন্নতা কেন হয় বা কোথা থেকে এর উৎপত্তি তা বলা দুষ্কর I বর্তমান পরিস্থিতিতে, করোনা প্রাদুর্ভাব ও এক-ঘরে জীবন- যাপনে মানসিক বিষন্নতার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে I
গবেষণায় উঠে এসেছে, পারিবারিক, সামাজিক এবং মানসিক নিরাপত্তাহীনতা, জনজীবনে অতিরিক্ত আতঙ্ক বা বড় ধরনের পরিবর্তন, ধারণাতীত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অনিশ্চত জীবনযাপন, মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নানা প্রকার সমস্যা ইত্যাদি মানসিক বিষণ্ণতার অন্যতম কারন I সরকারি জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে সর্বমোট ৫০ লক্ষেরও অধিক মানুষ মানসিক বিষন্নতায় ভুগছেন I মানসিক বিষন্নতার কারণে অনেক মানুষ আত্মহত্যার বা হত্যা করার পথ বেছে নেয় I প্রতি বছর সারা বিশ্বে প্রায় ৮ লক্ষেরও অধিক মানুষ নানাভাবে মানসিক বিষন্নতায় শিকার হয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন I তাছাড়া, অর্থসংকট, খাদ্য সংকট, দারিদ্রতা, সামাজিক বঞ্চনা ও সামাজিক গুরুত্বের অভাব ইত্যাদি বিষয়গুলো সামাজিক বিপর্যয় বয়ে আনে I অধিকন্তু, স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন, সন্তান ও বয়োজ্যেষ্ঠদের দেখভালের ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ বা নানা রকমের সমস্যা তৈরী হয়। সর্বসাকুল্যে বলা যায়, করোনা ভাইরাস সংক্রমনের আরেক নাম মানসিক বিষন্নতা I আর এই মানসিক বিষন্নতা পারিবারিক, সামাজিক এবং আর্থিকভাবে মানব জীবনে মারাত্মকভাবে প্রভাব বিস্তার করে I মানসিক বিষন্নতার কোনো প্রতিষেধক নেই I একমাত্র পারিবারিক ও সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব I
বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে জনমনে নানা রকমের দুশ্চিন্তা কাজ করছে I শিক্ষা, চাকুরী, ব্যবসা, পারিবারিক কাজকর্ম সহ অন্যান্য পেশায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে I এই পরিস্থিতি দীর্ঘসময় চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন বড় ধরনের হুমকির সম্মুখীন হওয়ার যথার্থ সম্ভাবনা রয়েছে I এর সাথে সাথে, বর্তমান সময়ে সরকার কর্তৃক জারিকৃত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং পারিবারিকভাবে একঘরে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হওয়া নেহায়েৎ আরেকটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ I এ সকল পরিস্থিতিতে বড়দের সাথে সাথে শিশুদের মানসিক বিকাশে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে I তাই পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে করোনা মহামারী বা তৎসম্পর্কিত মানসিক তাণ্ডব কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত I এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে, দেশের সকল ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশনে ওয়ার্ড ভিত্তিক মানসিক সেবা প্রদানের ব্যবস্থা চালু করা খুবই জরুরী I এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের আদলে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ প্রদান, কাউন্সিলিং বা পরামর্শ দেত্তয়ার ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি I সরকারি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যেমন: করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত দৈনিক প্রকাশিত তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহারের উপর কঠোর নিয়ম নীতি আরোপ করা জরুরী I এতে করে জনমনে অতিরিক্ত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও মানসিক বিষন্নতার মাত্রা এমনিতেই কমে যাবে I আন্তর্জাতিকভাবে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি’স – ৩) বা টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র তার যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে বলে আশা করা যায় I দেশের এহেন পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জনস্বাস্থ্য ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ দায়িত্ব পালন করবেন এটাই জনসাধারণের প্রত্যাশা I
লেখক: কামরুল হাসান হীরা, পি.এইচ.ডি. গবেষক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী I
