সাহাদাত হোসেন পরশ ও রাজবংশী রায়
“পাইপের ভেতরে পড়ার দুই ঘণ্টার মধ্যেই শিশু জিহাদ মারা গেছে। সেখানে পানি ছিল। আর পানিতে ডুবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায় সে। শিশুটির হাত ও পায়ের আঙুলে একাধিক ‘ক্ষতচিহ্ন’ রয়েছে। ওই চিহ্নগুলো মৃত্যু-পূর্ববর্তীকালীন?” গতকাল রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জিহাদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এর পর ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ফরেনসিক বিভাগের প্রধান হাবিবুজ্জামান চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। প্রশ্নবিদ্ধ পোস্টমর্টেম
তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের ব্যাখ্যায় দ্বিমত পোষণ করেন একাধিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। এতে জিহাদের ময়নাতদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে কয়েক দিন সময় লাগবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাইপে পড়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে নয়, শিশুটি মারা গেছে অনেক পরে। জিহাদের শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখে তারা এমন ধারণাই করছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয়, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর চার ঘণ্টা পর থেকেই শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পরিবর্তন শুরু হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে যা ‘রাইগোর মরটিস’ নামে পরিচিত।
এতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করে উঠতে পারে। তবে ১২ ঘণ্টার মধ্যে মৃতদেহ পুরোপুরি শক্ত হয়ে যায়। উদ্ধারের পরে দেখা গেছে, হাত-পাসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নরম। তাই উদ্ধারের চার ঘণ্টা বা এর কিছু আগে-পরে শিশুটি মারা যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
ডা. হাবিবুজ্জামান চৌধুরী গতকাল সমকালকে বলেছেন, ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের গভীর পাইপে পড়েও বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল ছোট্ট শিশু জিহাদ। পাম্পের ভেতরে থাকা আরেকটি ছোট্ট পাইপ বারবার আঁকড়ে ধরে নিজের কোমল প্রাণখানি বাঁচাতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে শিশুটি। এতে প্রতীয়মান, বাইরে থেকে ২৩ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানের তুলনায় কোনো অংশে ভেতরে আটকা শিশুটি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণান্তর চেষ্টার কমতি ছিল না। শিশুটির মৃত্যুর ‘সময়’ নিয়ে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের মন্তব্য নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।
এর আগে গতকাল রোববার ঢামেক হাসপাতালে সকাল ৯টার দকে জিহাদের ময়নাতদন্ত শুরু হয়। পৌনে ১০টার দিকে তা শেষ হয়। ময়নাতদন্ত কমিটির তিন সদস্য হলেন অধ্যাপক ডা. হাবিবুজ্জামান চৌধুরী, মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ খ ম শফিউজ্জামান ও প্রভাষক প্রদীপ কুমার বিশ্বাস। পোস্টমর্টেম শেষে লাশ জিহাদের মামার কাছে দেওয়া হয়।
ডা. হাবিবুজ্জামানের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ সমকালকে বলেন, পোস্টমর্টেম শুরুর পর থেকে সাধারণত মৃত্যুর সময়ের হিসাব শুরু হয়। উদ্ধারের পর শিশুটিকে সাড়ে ৩টার দিকে হাসপাতালে আনা হয়। এর পর প্রায় ১৯ ঘণ্টা হিমঘরে মৃতদেহটি রাখা হয়েছিল। এ হিসাবে পাইপে পড়ার পর দুই ঘণ্টার মধ্যে শিশুটি মারা যাওয়ার কথা নয়।
নর্দার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ও ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, ২১ ঘণ্টা আগে শিশুটির মৃত্যু হলে তার শরীর শক্ত থাকার কথা। উদ্ধারের পর শিশুটির হাত-পা নরম ছিল। স্বাভাবিকভাবে ২১ ঘণ্টা আগে মৃত্যু হয়ে থাকলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। তবে মাত্রাতিরিক্ত টানাহেঁচড়া করলে শরীর কিছুটা নরম হতে পারে। তিনি আরও বলেন, গ্রীষ্মকালে মৃতদেহ খুব দ্রুত শক্ত এবং পচন ধরলেও শীতকালে একটু সময় লাগে। মৃত্যুর চার ঘণ্টা পর থেকে আস্তে আস্তে মৃতদেহ শক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ১২ ঘণ্টার মধ্যে তা পুরোপুরি শক্ত হয়ে থাকে। মৃতদেহ পচন প্রক্রিয়ায় যেতে ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় নেয়। ডা. আনোয়ার হোসেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, সাধারণত চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে রাইগোমরটিস হওয়া শুরু হয় এবং এ সময় মৃতদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মৃদু ‘নড়াচড়া’ করে। আর ১২ ঘণ্টার মধ্যে মৃতদেহ শক্ত হয়ে যায়। তবে তাপমাত্রা, স্থান, দৈহিক অবস্থাসহ পারিপাশর্ি্বক বিভিন্ন পরিস্থিতির ওপর মৃতদেহের পরিবর্তনজনিত কারণে কিছু ব্যতিক্রম হতে পারে। যেহেতু উদ্ধারের পর শিশুটির শরীর নরম ছিল, তাই বলা যায়, চার থেকে ছয় ঘণ্টার কিছু আগে বা এ সময়ের মধ্যে তার মৃত্যু হয়েছে।
ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. পিসি দাস বলেন, মৃতদেহের পরিবর্তনের বিষয়টি কিছু কিছু সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে থাকে। তবে ব্যতিক্রমী ঘটনাও রয়েছে। মৃত্যুর ৪-১২ ঘণ্টার মধ্যে মৃতের শরীর শক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য: জিহাদের পোস্টমর্টেমের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তিন চিকিৎসককে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. হাবিবুজ্জামান চৌধুরী গতকাল সকালে জিহাদের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতালে তার মৃত্যু নিশ্চিত করার পরই মৃতদেহ হিমঘরে রাখা হয়। হিমঘরে না রেখে সঙ্গে সঙ্গে পোস্টমর্টেম করা গেলে মৃত্যুর সময় সম্পর্কে আরও ‘সুনির্দিষ্ট’ভাবে বলা যেত।
এর পর সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপে তিনি বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু হলে মৃতের শরীরে কিছু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকে। শ্বাসনালি, পাকস্থলী ও ফুসফুসে পানি থাকবে। জিহাদের শরীরের এই তিন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে পানির আলামত পাওয়া গেছে। এ ছাড়া শ্বাসনালিতে কাদামাটি ও বালুকণা পাওয়া যায়। এতে শতভাগ নিশ্চিত, জিহাদ পানিতে ডুবেই মারা গেছে।
পাইপে পড়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে জিহাদ মারা গেছে, এটা কীভাবে নিশ্চিত হলেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, জিহাদ পাইপে পড়েছে সাড়ে ৩টার দিকে। আর ১৮ ইঞ্চির ব্যাসের পাইপের ভেতরে আরেকটি সরু পাইপ ছিল। সেটি যখন সরানো হয়, তখনই হয়তো জিহাদ পানিতে ছিটকে পড়ে। এর পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যে জিহাদ মারা যায়। এ ছাড়া পাইপের ভেতর অক্সিজেনের অভাব ছিল। অক্সিজেন সেখানে দেওয়ার পর গভীরে কতটুকু পেঁৗছেছে, তা নিয়ে সংশয় আছে।
পোস্টমর্টেম না করেই মৃতদেহ কেন প্রথমে হিমঘরে রাখা হলো- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জিহাদের মৃতদেহ হাসপাতালে আনার পরপরই মিডিয়াকর্মী ও উৎসুক মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। তাই মৃতদেহ হিমঘরে রাখা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। এ ছাড়া প্রথমে তার পরিবারও পোস্টমর্টেম ছাড়া লাশ নিতে চেয়েছিল।
পানিতে পড়ে মারা গেলে শিশুটির শরীর ভেজা ছিল না কেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, উদ্ধারের পর অনেক সময় ধরে দৌড়াদৌড়ির কারণে শরীর থেকে পানিতে ঝরে যেতে পারে। এমনকি এ সময় তার পরনে থাকা হাফপ্যান্ট শুকিয়ে যায়।ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক এমন দাবি করলেও প্রথম দিনের উদ্ধার অভিযানের সময় রাত ৯টা পর্যন্ত শিশুটির প্রাণের স্পন্দন ছিল বলে উদ্ধারকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়।
সুরতহাল প্রতিবেদন: লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা শাহজাহানপুর থানার উপপরিদর্শক আবু জাফর সমকালকে বলেন, ‘ওর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশের চামড়া ছিলে গিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, পাইপের ভেতর অক্সিজেন না থাকায় তার মৃত্যু হয়েছে। তার নাক-মুখ স্বাভাবিক ছিল। কপালের পাশে কালো ফোলা দাগ ছিল। শিশুটির শরীর পানিতে ভেজা ছিল না। পিঠ ও বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচে ও ওপরে ফোলা দাগ ছিল।
সূত্র — দৈনিক সমকাল ২৯/১২/১৪
