প্রতিনিধি
সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দ্যেশে মানসিক ভারসাম্যহীন প্রচার করে প্রায় দেড় যুগ ধরে একটি ঝুঁপড়ি ঘরে যা গোয়াল ঘর নামে পরিচিত কখনো হাতে পায়ে শিকল বেঁধে, কখনো বা দরজায় তালাবদ্ধ করে রেখেছে নুরুল ইসলাম (৪৫)-কে তার সহোদর ও স্ত্রীরা।
মাঝে মাঝে সারাদিন পারিবারিক সকল কাজ করালেও খাবার হিসেবে জুটে পঁচা, বাসি ও নোংরা খাবার। কথা না শুনলে ভাই-ভাবীদের হাতে সহ্য করতে হয় নির্মম শারীরিক নির্যাতন। মানবতা বিবর্জিত এ ঘটনাটি গত প্রায় দু’যুগ ধরে ফরিদগঞ্জ উপজেলার রুদ্রগাঁও গ্রামের দরবারি বাড়িতে ঘটেই চলেছে । স্থানীয় লোকজনের দাবি পাগল বলে প্রচার করা নুরুল ইসলামকে সঠিক চিকিৎসা করালে সে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে। কিন্তু সুস্থ হলেই পৈতৃক সম্পত্তি বুঝে নিবে, এজন্যই সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য তাকে চিকিৎসা না দিয়ে পাগল সাজিয়ে আটক করে রাখা হয়েছে।
সরেজমিন এ প্রতিনিধিসহ কয়েকজন সংবাদকর্মী ওই এলাকায় গেলে আশপাশের প্রায় অর্ধশত নারী পুরুষ ছুটে আসে, তারাই পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় দরবারি বাড়িতে। পরিবারের লোকজন নুরুল ইসলামের ঘর দেখিয়ে দেয়। চারিদিকে গাছÑগাছালি দিয়ে ঘেরা ভাঙ্গাচুরা একটি ঝুঁপড়ি ঘরের ভেতর অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে আটকে দরজার বাইরে তালা (যার একপাশে গরু বাধা) মেরে রাখা হয়েছে কথিত মানসিক ভারসাম্যহীন নুরুল ইসলাম (৪৫)-কে।
ভাবী হাসিনা ও সাহিনা জানায়, পাগল তাই নুরুল ইসলামকে আটক করে তালা মেরে রেখেছেন। তারা জানায়, রাস্তায় বের হলেই মানুষ তাকে কুÑপরামর্শ দেয়, জমি বিক্রি করতে বলে, তাকে ছেড়ে দিলে সে অন্যের কাছে তার জমি বিক্রি করে দিবে। আর এজন্য তাকে আটক করে রাখা হয়েছে। তার বাবাÑমা বেঁচে থাকতে তো শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতো আমরাতো এখন আর তা করিনা। সে যদি পাগল হয় তবে তাকে চিকিৎসা না করিয়ে এভাবে বেঁধে রাখা কি ঠিক জানতে চাইলে তাদের সোজা উত্তর আর কতো ডাক্তার দেখাবো। আটক করে রাখা দরজা খুললেই বেরিয়ে আসে পঁচা দুর্গন্ধ। ভেতরে খড়কুঁটোয় ভরা, আর নোংরা কাপড় চোপড়ে নুরুল ইসলাম ঘর ঝাড়– দিচ্ছে। তাকে তার নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে সে সবই ঠিকমত বলতে পেরেছে। কেন তাকে আটক করে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে সে জানায়, আমি জানিনা। আমাকে ঠিকমত খেতে দেয় না। আমি বাইরে বের হলে মানুষ আমাকে এটা ওটা খেতে দেয়। আজ কি খেয়েছো জানতে চাইলে সে দেখিয়ে দেয় তার খাবার। বড় খিদে পেয়েছে বলেই সে নোংরা পঁচা ও বাসি খাবারগুলো খেতে শুরু করে।
জানা গেছে, রুদ্রগাঁও গ্রামের মৃত আঃ মান্নান ড্রাইভারের তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে নুরুল ইসলাম সবার ছোট। বড় ভাই নুরুন্নবী ও মেঝ ভাই নুরুল হক ঢাকায় চাকুরি করেন। স্ত্রী-সন্তানরা বাড়িতে থাকেন।
তারা জানায়, নুরুল ইসলামের বড়বোন আনোয়ারা বেগমও মানসিক রোগী ছিলেন। চিকিৎসার অভাবে সে মারা যায়। বাবাÑমা বেঁচে থাকা অবস্থায় নুরুল ইসলাম রূপসা উ/বি থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখা পড়া করার পর প্রায় দু’যুগ পূর্বে হঠাৎ করেই সে মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকে। এর কয়েক বছর পর বাবাÑমা (বেঁচে থাকতে) তাকে বিয়ে করিয়ে দেন। ধারনা ছিল বিয়ে করিয়ে দিলে সে সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু বিধিবাম বিয়ের বছর দু’য়েক পরেই স্ত্রী রোকেয়া বেগমও দুরারোগ্য রোগে মারা যায়। তারপর থেকেই নেমে আসে নুরুল ইসলামের ভাগ্যে বন্দি জীবন আর শারীরিক নির্যাতন। কখনো হাত পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে, আবার কখনো তালা দিয়ে আটক করে রাখার পালা। মাঝে মাঝে যখন একটু স্বাভাবিক থাকে তখন তাকে দিয়ে করানো হয় থালাÑবাসন ধোঁয়া, ভাইÑভাবীদের পরিধেয় বস্ত্র ধোঁয়াসহ পারিবারিক সকল কাজ। এর ব্যতিক্রম হলেই চলে তার উপর শারীরিক নির্যাতন। আর ওই ঝুপড়ি ঘরটির একপাশে বেঁেধ রাখা হয় গরু যাতে প্রতিবেশি কেউ বুঝতে না পারে ওই ঘরে নুরুল ইসলামকে আটক করে রাখা হচ্ছে দিনের পর দিন।
এ ব্যাপারে নুরুল ইসলামের মেঝ ভাই নুুরুল হক মুঠোফোনে জানান, নুরুল ইসলামকে বহু চিকিৎসক দেখিয়েছে, বহু ঔষধ খাইয়েছে কিন্তু সে ভালো হচ্ছেনা। সর্বশেষ প্রায় দু’ বছর পূর্বে তাকে ডাক্তার দেখিয়েছেন। তার সম্পত্তি আত্মসাৎ নয় বরং তাকে চিকিৎসা করিয়ে তারা অনেক টাকা ব্যয় করেছে। তার জন্য তারা অনেক ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়েছে। ডাক্তাররা তাকে সারাদিন কাজকর্মে রাখার কথা বলেছেন, সে তাই করতো। কিন্তু এখন মানুষ তাকে কুÑপরামর্শ দেয়, শুধু জমি বিক্রি করতে বলে। তিনি আরো জানান, তার বড় বোন ছাড়াও আঃ রব (৪০) নামে এক জেঠাতো ভাই ছিলেন মানসিক রোগী। তারা ধরে নিয়েছেন এটা বংশগত কোন রোগ। তাই তাকে আর চিকিৎসা দিচ্ছেন না। এদিকে নুরুল ইসলামের চাচা মুনছুর আলী (৭০) জানান, নুরুল ইসলামকে তিনি নিজে কয়েক বছর তার কাছে রেখেছিলেন, সে স্বাভাবিক মতই কাজকর্ম করতো কিন্তু তার ভাইয়েরা এটা মেনে নিতে পারেনি। তাকে চিকিৎসা করালেই সে সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে কিন্তু তাদের ভাইয়ে ভাইয়ে বনিবনা নাই কে ওরে চিকিৎসা করাবে।
এলাকার স্থানীয় লোকজন জানায়, দিনের পর দিন এভাবে ঝুপড়ির মত একটি ঘরে বেঁধে রেখে বা আটক করে রেখে ঠিকমত খেতে না দিয়ে শারিরিক নির্যাতন করা হয়েছে তা তারা কয়েক দিন পূর্বে জানতে পারেন। তারা এই মানবতা বিরোধী ও জঘন্যতম বর্বরতার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবির পাশাপাশি নুরুল ইসলামকে দ্রুত চিকিৎসা সেবা দেয়ার দাবি জানান।
শিরোনাম:
মঙ্গলবার , ২৬ মে, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ , ১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এই ওয়েবসাইটের যে কোনো লেখা বা ছবি পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে ঋন স্বীকার বাঞ্চনীয় ।
