
রফিকুর ইসলাম বাবু ঃ
জন্মের পর মা-বাবা নাম রেখেছিলেন মিজান। নিজেই সংযোজন করেছেন ইবনে মিজান রনি (৪৬)। জীবনে কখনও চাকরী করেনি। অথচ এখন অঢেল সম্পদের মালিক। একসময়ের বেকার কিশোর মিজান ঢাকায় এক বন্ধুর বাসায় উঠেই জড়িয়ে যান বিএনপির রাজনীতিতে। হয়ে যান রাজধানীর সবুজবাগ এলাকার একটি ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহবায়ক। তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বনে গেছেন ইবনে মিজান রনি। সুমধুর কন্ঠ রফত্ত করতে পারেন ইবনে মিজান রনি। প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ইবনে মিজান রনিকে একদিনের রিমান্ডে আনা হয়। রিমান্ডে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানান তথ্য। দীর্ঘদিন যাবত উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য, সচিব ও দপ্তর প্রধান গণের নামে সীল ও প্যাড ইত্যাদি তৈরি করে ডিও লেটার দিতো এই ইবনে মিজান রনি। তার এই প্রতারণামূলক কাজে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিয়েছেন সুনামধন্য বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। রিমান্ডে বেরিয়ে এসেছে হাজীগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নাম। সম্প্রতি ইবনে মিজান রনি গ্রেফতার হবার পর কাজ পাইয়ে দেয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারীগণ তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় রিমান্ডে থাকা অবস্থায় ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন তিনি। রিমান্ডে পুলিশকে দেয়া তথ্যমতে হাজীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আবদুল মান্নান সঙ্গীয় ফোর্সসহ ১০ আগস্ট রাতে হাজীগঞ্জ বাজারের ট্রাক রোডস্থ নিজের তৈরি করা ৫ম তলা বিল্ডিংয়ের ৩য় তলার বাসা থেকে ৬টি সীল ও ২৭ টি প্যাড উদ্ধার করে জব্দ করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের ফাঁকি দেয়া এই ইবনে মিজান রনি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌরসভার রান্ধুনীমুড়া মৃত বাচ্চু মিয়ার ছেলে। ইবনে মিজান রনি একদিনের রিমান্ডে যেসব তথ্য দিয়েছেন তার আংশিক তথ্য হাজীগঞ্জ থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাবেদুল ইসলাম প্রতিবেদককে দিয়েছেন। তারই ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
যে কারণে গ্রেফতার ইবনে মিজান রনি ঃ
চাচাতো ভাই আরিফুল ইসলাম রাজীবকে গ্রেফতার করতে পুলিশকে বিভিন্নভাবে সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে চাপ প্রয়োগ করেছিল ইবনে মিজান রনি। রাজীবের মামা নেছার আহম্মেদ। তিনি রনির ভাই শাওনকে ওমানের ভিসা দিয়ে নিয়ে যায়। যেই কথা সেই কাজ না দেয়া এবং সহযোগীতা না করায় ক্ষীপ্ত হয়ে উঠে ইবনে মিজান রনি। একপর্যায়ে রাজীবের কাছে ওমান নেয়ার সকল ব্যয়-ভার ফেরত চায় রনি। অপরাগতা জানালে রাজীবের বিরুদ্ধে জঙ্গী গোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ততা আছে বলে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা সেজে গ্রেফতারের তদবীর করতে শুরু করেন রনি। রিমান্ডে রনি বলেছেন, আমাদের বংশের মধ্যে এই রাজীব আমাকে কখনও গুরু মানতো না। এছাড়া কচুয়া থানায় ২০১১ সালের একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় ইবনে মিজান রনিকে। তৎকালীন সময়ে কচুয়া উপজেলার কৃষি বিভাগের উপ-পরিদর্শক সরওয়ার মুন্সী ওই মামলাটি দায়ের করেন। তখন ইবনে মিজান রনি উপ-পরিদর্শক সরওয়ার মুন্সীকে বদলী করার জন্য শেখ সেলিম পরিচয় দিয়ে ফোন করে। সরওয়ার মুন্সীকে পরে সিলেটে বদলী করা হয়। কয়েকদিনের মধ্যে কৃষি অধিদপ্তরের ডিজি বিষয়টি নিশ্চিত হন যে, ওই ফোনটি শেখ সেলিম করেননি। তারপর বিষয়টি তদন্ত করার জন্য রাজধানীর গোয়েন্দা পুলিশকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই সূত্রধরে ফাঁস হয়ে যায় ইবনে মিজান রনির থলের বিড়াল। মামলার বাদী সরওয়ার মুন্সী হাজীগঞ্জ উপজেলার বলাখাল এলাকায়। তিনি বর্তমানে চাঁদপুর সদর উপজেলায় কৃষি বিভাগে চাকুরী করছেন। পুলিশের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে দীর্ঘদিন আরো একটি প্রতারণামুলক কাজে জড়িত ছিলেন ইবনে মিজান রনি। তা তদন্ত স্বার্থে প্রকাশ করা হয়নি।
উত্থান ও স্বপ্ন ঃ
তারেক জিয়া সরাসরি ইবনে মিজান রনিকে চিনতো। হাওয়া ভবনে নিয়মিত আসা যাওয়া ছিল তার। সেখানে থেকে চাকরীর জন্য বিভিন্ন তদবীর করাই ছিল তার কাজ। এ বিষয়ে মাগুরা জেলার তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। মাগুরা জেলায় পুলিশের চাকুরী দিবে বলে তিনি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে মামলাটি দায়ের করা হয়। এবারের গ্রেফতারের পর তার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে বলে রিমান্ডে বলেছেন ইবনে মিজান রনি। স্বপ্ন ছিলো বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) সংসদীয় আসন থেকে সংসদ নির্বাচন করার। জীবনে কোথাও চাকুরী করিনি। ঢাকায় যেয়ে বন্ধুর বাসায় উঠে। ছাত্রদলের আহবায়ক হয়ে তৎকালীন সাংসদ নুরুল হুদার সান্নিধ্য পায়। নুরুল হুদার সান্নিধ্য পেতে ঢাকা বিশ^বিদ্যলয়ের ছাত্রদলের তুখোড় নেত্রী শিরিন সুলতানার আশ্রায় নিতে হয়েছে তাকে। তৎকালীন সময়ে মতলবের সংসদ সদস্য নুরুল হুদার সান্নিধ্য পাওয়ায় ঢাকা থেকে ঠিকাদারী কাজের জন্য বন্ধুদের সাথে ফরিদপুর পাড়ি দেয় রনি।
বিয়ে ও সম্পদ ঃ
ইবনে মিজান রনি একাধিক বিয়ে করেছেন। পুলিশকে দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে তিনটি বিয়ের কথা। ১ম স্ত্রীর নাম ফারজানা আক্তার, সে ঢাকায় বসবাস করছে, ২য় স্ত্রী সাবিনা সুলতানা মুক্তি, সে হাজীগঞ্জে বসবাস করছে ও ৩য় স্ত্রী নাম রেশমা খাতুন কারাগারে রয়েছে। প্রথমে ঢাকায় তিনি মুরাদনগরের একটি মেয়েকে বিয়ে করেন। তারপর ঠিকাদারী কাজে বন্ধুদের সাথে গিয়ে ফরিদপুরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। ওই বিয়েটি ছিল পারিবারিকভাবে। তৃতীয় বিয়েটিও করেন ফরিদপুরে। তৃতীয় স্ত্রীকে ফরিদপুরে একটি ডায়াগণষ্টিক সেন্টার ও একটি ভবন নির্মাণ করে দিয়েছেন ইবনে মিজান রনি। এছাড়া তার হাজীগঞ্জ বাজারে একটি পাঁচতলা ভবন ও ঢাকায় ভবনসহ একটি টিনশেড বাড়ী রয়েছে।
মাদক ব্যবসা ও বিশ^স্ত জুয়েল ঃ
ইবনে মিজান রনি হাজীগঞ্জ উপজেলাসহ জেলায় মাদকের একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করতো। আর এই সিন্ডিকেটে বিশ^স্থ ছিল জুয়েল পাটওয়ারী। রিমান্ডে দেয়া তথ্যমতে পুলিশ ওই রাতেই জুয়েলের বাসায় অভিযান চালায়। অভিযানে জুয়েল সিসি ক্যামেরায় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অভিযান চালিয়ে পুলিশ ২৫০ পিচ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে। জুয়েল হাজীগঞ্জ বাজারের কাপড়িয়া পট্টির আফজাল ক্লথের মালিক আফজাল পাটওয়ারীর ছেলে। রিমান্ডে রনি বলেছেন, এই মাদক ব্যবসায় তিনি ও জুয়েল পাটওয়ারী যৌথ ইনভেস্ট করেছে। জুয়েল সবসময় বড় ভাই হিসেবে তাকে মানতো। জুয়েল তার বিশ^স্থ একজন ব্যবসায়ীক পার্টনার। পুলিশ ১০ আগস্ট হাজীগঞ্জ থানায় জুয়েল পাটওয়ারী ও ইবনে মিজান রনিকে আসামী করে আরো দুইটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন। জুয়েল পাটওয়ারী বর্তমানে পলাতক রয়েছে, তাকে গ্রেফতার করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সহপাঠিদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ ঃ
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে তদবীর করেছি। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার পেতে সুপারিশ ও ডিও লেটার দিয়েছি। আজ যারা সুবিধা নিয়েছে, তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সু-গভীর সর্ম্পকের বিষয়ে সরকার দলীয় আরো অনেকেরই নাম রিমান্ডে থাকা অবস্থায় বলেছে ইবনে মিজান রনি। এছাড়া সালাহউদ্দিন ফারুক ও আকতার হোসেনের বিষয়ে মামলার তদন্ত স্বার্থে তা প্রকাশ করেনি পুলিশ।
ইবনে মিজান রনির বিরুদ্ধে যত মামলা ঃ
তার বিরুদ্ধে প্রতারণার দায়ে কচুয়া থানায় ০২(০৩)১১, মাগুড়া জেলার সদর থানায় ৬২(০১)১১ ও হাজীগঞ্জ থানায় ১৯, ৩১/৭ মামলা রয়েছে। এছাড়া ফরিদপুর জেলার কোতয়ালী থানায় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ৪৭(১১)০৯ মামলা রয়েছে। ১০ আগস্ট হাজীগঞ্জ থানায় মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে আরো দুইটি মামলা দায়ের করা হয়।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্যঃ
হাজীগঞ্জ থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাবেদুল ইসলাম বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রতারণার কৌশল জানতো এই রনি। সে বিদ্যালয়ের গন্ডি ফেরুতে না পারলেও ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। পুলিশ সুপার শামছুন্নাহার বলেছেন, অঢেল সম্পদের মালিক এই ইবনে মিজান রনি। তার বিষয়ে পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। সে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ প্রায় ৮/১০ বছর যাবত বিভিন্ন এলাকায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের সচিব, পুলিশ কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী কর্মকর্তা, মন্ত্রী ও এমপি আত্মীয় ও বিভিন্ন বিভাগের উর্ধ্বতন সহকারি কর্মকর্তা হিসেবে পদ ও নাম পরিচয় দিয়ে সাধারণ জনগণের সাথে প্রতারণা করে আসছিল। এই প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ হাতিয়ে নেয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট মোহাম্মদ ইবনে মিজান রনি (৪৫) কে তার তৃতীয় স্ত্রী রেশমা খাতুনসহ আটক করা হয়েছে। শনিবার চাঁদপুর আদালত তাকে পুলিশের অবেদনের প্রেক্ষিতে একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। কচুয়া উপজেলার একটি প্রতারণা মামলায় পুলিশ তদন্ত করতে গিয়ে ইবনে মিজান রনির চাঞ্চল্যকর সব ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বুধবার বিকেল প্রেস ব্রিফিং দিয়েছেন চাঁদপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার। পরে তাদের স্বামী-স্ত্রীকে বিকেলে পুলিশ চাঁদপুর আদালতে প্রেরণ করলে আদালত জামিন না মঞ্জুর করে জেলা কারাগারে প্রেরণ করে।
