প্রতিনিধি মতলব উত্তর উপজেলার দশানী সরকার বাড়ির ওয়ালী উল্লাহর ছেলে লিমন সরকার। বয়স মাত্র ৩০। জীবনকে সাজাতে কাজে যোগ দেয় বিদেশী জাহাজে। একসময় যোগ দেয় ইরানী মালিকানাধীন এবং মালয়েশিয়া থেকে পরিচালিত জাহাজ কোম্পানী মাজেস্টিক এন্ড রিস শিপিং লাইনস্ কোম্পানীতে। এই কোম্পানীর মূল কাজ হলো বহিঃসমূদ্রে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কন্টেইনার পরিবহন। আর এই কোম্পানীতে কাজ করতে গিয়ে ভাগ্য বিড়ম্বিত লিমন সোমালিয়ার জলদস্যুদের হাতে আটক হয়। সাড়ে তিন বছর তাদের হাতে বন্দী থাকার পর মুক্তি পেয়ে গতকাল রোববার সকালে লিমন ঢাকা থেকে বাড়িতে পৌঁছলে ঘটে এক আনন্দঘন পরিবেশ। এ সময় লিমনকে দেখতে এবং একটু কথা বলতে সরকার বাড়িতে হাজির হয় লিমনের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, এলাকাবাসী এবং পাড়া-প্রতিবেশি। সরকার বাড়িতে গেলে লিমনের সাখে একান্ত কথা হলে তিনি বলেন, সেই স্মৃতি আমি কথনো ভুলবো না। এ এক দুঃসহ স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনো দিন ভাবিনি দস্যুদের হাত থেকে বেঁচে মায়ের কোলে ফিরে আসতে পারবো। এজন্য লিমন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। লিমন বিস্তারিত বলতে গিয়ে চাঁদপুর কণ্ঠকে বলেন, এসএসসি পাস করার পর বিএনএস-এ ট্রেনিং করে ২০১০ সালের ১ আগস্ট জাহাজে চাকুরি নিয়ে দেশ ত্যাগ করে ইরানে যাই। ইরানের বন্দর আবাবায় ট্রেনিং শেষে সৌদি আরবের বন্দরে পাঠানো হয় আমাকে। নিয়োগ কোম্পানীর মাধ্যমে সৌদি আরবের বন্দর থেকে আমাদেরকে পাকিস্তান হয়ে কেনিয়া তারপর সুদান পাঠায় বহিঃ জাহাজে করে। আর এই জাহাজে ছিলো শতাধিক কন্টেইনার। যেগুলোর ভেতরে ছিলো গাড়ি, গাড়ির টায়ার, বাসমতি চাল, চিনিসহ আরো বহু পণ্য সামগ্রী। আমাদের জাহাজটি কেনিয়া থেকে সুদান যাওয়ার পথিমধ্যে জলদস্যুরা আক্রমণ করে। ঐ বছরের ২৬ নভেম্বর সকাল ৭টার সময় জলদস্যুরা একে ৪৭ ও রকেট লাঞ্চারসহ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জাহাজে উঠে। এ সময় আমাদের জাহাজের সকল প্রবেশ পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য জাহাজের ইন্ডিয়ান ক্যাপ্টেন আমাদের নির্দেশনা দেয়। ক্যাপ্টেনের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সকল দরজা জানালা বন্ধ করে দিলে দস্যুরা গুলি করে ৭ জন দস্যু জাহাজের জানালার গ্লাস ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে আমাদের ক্রুসহ সকল স্টাফকে বন্দী করে ফেলে। দস্যুদের পেছনে থাকা আরেকটি মাছের জাহাজে করে আমাদের জাহাজে আরো ১১ জন দস্যু ঢুকে পড়ে। পরের দিন ২৭ নভেম্বর আরো ৩০-৩২জন দস্যু এসে আমাদেরকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এরপরই দস্যুরা আমাদের নিকট ২০ মিলিয়ন ইউএস ডলার দাবি করে। দস্যুদের দাবিকৃত ডলার পরিশোধের বিষয়ে জাহাজ মালিকের সাথে যোগাযোগ করতে আরো ৩ মাস পার হয়ে যায়। এক পর্যায়ে জাহাজ মালিক ৩ লাখ ডলার দিতে রাজী হলেও দস্যুরা আরো ক্ষেপে উঠে আর আমাদেরকে শাশিয়ে দেয়া হয় দাবিকৃত ডলার পরিশোধ না করলে আমাদের সকলকে মেরে ফেলা হবে। এভাবেই কয়েক মাস কেটে যাওয়ার পরে ২০১১ সালের ২৬ জুন এক ইন্ডিয়ান ক্রুকে হত্যা করে আমাদের মাধ্যমে তাকে ফ্রিজে ঢুকানো হয়। এরপরই আমাদের এক এক করে জাহাজ মালিকের সাথে ফোনে যোগাযোগ করায় দস্যুরা। তারো কয়েক মাস পরে দস্যুরা জাহাজের মালিকের সাথে যোগাযোগ করার জন্য এক দালাল তৈরি করে। এ সময় মালিকের নিকট ২০ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ১৬ মিলিয়নে আনা হয়। দর কষাকষির এক পর্যায়ে ঐ দস্যুরা জাহাজের কন্টেইনার ভেঙ্গে সকল মালামাল নিয়ে যাওয়া শুরু করে। আর ঐ মালামাল জাহাজ থেকে নামাতে শ্রমিক হিসেবে আমাদেরকে লাগানো হয়। লিমন জানায়, ১৮ মার্চ ২০১২ সালে দস্যুদের সাথে মালিক পক্ষের ২.৮ মিলিয়ন ডলারে আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করার আগ মুহূর্তে ঐ জাহাজটি ডুবে যায়। আর সেই সময় জাহাজের ক্রু ৪ জন শ্রীলংকান নাগরিক মারা যায়। এরপরই ঐ মালিক তার চুক্তি থেকে সরে আসে। এরপর আমাদের সাথে পাকিস্তানী নাগরিকদের পাকিস্তান ১ মিলিয়ন ডলারে ছাড়িয়ে নেয়। আর আমাদের মুক্তির বিষয়ে জাতিসংঘের একটি টিম কাজ শুরু করে। জাতিসংঘের টিমের সাথে দস্যুদের বহুবার দর কষাকষির এক পর্যায়ে ৬ মিলিয়ন ডলারে আমাদের মুক্তি মিলে। লিমন কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, দীর্ঘ প্রায় ৪ বছরে দস্যুরা আমাদের উপর অমানবিক অত্যাচার করেছে। সারাদিন জাহাজ থেকে মালামাল নামানোর কাজে ব্যবহার করতো। আর গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে গহীন বনে নিয়ে মাটি খুঁড়ে গলা বরাবর ঢুকিয়ে মাটি চাপার ভয় দেখিয়ে বাড়িতে স্বজনদের কাছে ফোন করাতে বাধ্য করতো। আর সেই ফোনের একটাই উদ্দেশ্য, তাদের দাবিকৃত টাকা দেশ থেকে যেনো দ্রুত পাঠানো হয়। খাবার পানি প্রতিদিন আধা লিটার দেয়া হতো, তাও আবার মাঝে মধ্যে তাতে পোকা পাওয়া যেতো। আর ঐ পানিটুকু দিয়ে বাথরুমসহ সকল কাজ সারতে হতো। সারাদিনের খাবারের মধ্যে শুধুমাত্র রুটি, ডাল, সাদা ভাত, ভাত-চিনির বাইরে কোনো খাবারই দেয়া হতো না। আটক অবস্থায় এ খাবারই আমাদের সবাইকে দেয়া হতো। বর্তমান সরকার আমাকে বাঁচিয়ে দেশে আনাতে আমি কৃতজ্ঞ। পররাষ্ট্র সচিব আমাদেরকে কথা দিয়েছেন একটা চাকুরির ব্যবস্থা করে দেবেন। লিমনের বয়োবৃদ্ধ বাবা ওয়ালি উল্লাহ (৯০) জানান, আমরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। সরকার আমার ছেলেকে আমাদের বুকে ফেরৎ দিয়েছেন। সে যে জীবিত এবং সুস্থভাবে ফেরৎ এসেছে সে জন্য আল্লাহর নিকট শোকরিয়া। লিমনের চাচা বর্তমান ছি ইউপি সদস্য বোরহান উদ্দিন জানান, লিমন বাড়িতে এসেছে এটাই বড় কথা। এখন তার একটা কাজের প্রয়োজন।
শিরোনাম:
সোমবার , ২০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ , ৭ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
চাঁদপুর নিউজ সংবাদ
এই ওয়েবসাইটের যে কোনো লেখা বা ছবি পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে ঋন স্বীকার বাঞ্চনীয় ।
