আবু সাঈদ,কচুয়া (চাঁদপুর) সংবাদদাতাঃ দেশের অন্যতম প্রসিদ্ধস্থান চাঁদপুর জেলাধীন সাচার গ্রামে রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী রথ ও জগন্নাথ ধাম যা সচরাচর ‘সাচারের রথ’ নামে দেশের সর্বত্রে পরিচিত। এখানকার রথে ১৮ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে ১৪৮তম রথাযাত্রার উৎসব। রথযাত্রার উৎসব কে কেন্দ্র করে সাচার এলাকায় বিরাজ করছে ব্যাপক আনন্দ উল্লাস। ১৮ জুলাই জগন্নাথ ধাম প্রাঙ্গন থেকে রথটি টেনে আনা হবে ৫‘শ গজ দূরে সাচার বাজারে। সপ্তাহ পর পালন করা হবে ফেরত রথযাত্রার উৎসব। টানা ও ফেরত রথযাত্রার উৎসবে হাজার হাজার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন অংশ নিবে বলে আশা করা হচ্ছে। রথযাত্রার উৎসব উপলক্ষে এ বছরও কুটির জাত শিল্প সহ বিভিন্ন পন্য সামগ্রীর মেলা বসছে। সাচার জগন্নাথ ধাম ও পূজা ও সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি তিমির সেন গুপ্ত জানান, প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও মেলায় স্থান পাবে অন্তত ৫ শত স্টল। এ বছর মেলার একটি নতুন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- হরেক রকমের ফার্নিচারের মেলা। যা আলাদা ভাবে বসছে- সাচার উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের পরিবর্তে জগন্নাথ ধামের দক্ষিন পার্শ্বে বিশাল পরিসরে। এটি চলবে মাসব্যাপী। সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ন পরিবেশে রথযাত্রার উৎসব পালনে সকল প্রস্তুতি গ্রহন করা হয়েছে।
এই রথ ও জগন্নাথ ধাম প্রতিষ্ঠা নিয়ে কথিত আছে যে, প্রায় দেড়শত বছর পুর্বে সাচার বাবু বাড়ির জমিদার গঙ্গা গোবিন্দ সেন ভারতে হিন্দু তীর্থস্থান পুরীতে জগন্নাথ দর্শনে গেলে, জগন্নাথ গঙ্গা গোবিন্দকে দর্শন দেননি। বরং পুরীর দরজা-জানালা গুলো আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যায়। দর্শন লাভে ব্যর্থ হয়ে পরম ধার্মিক গঙ্গা গোবিন্দ সেন দর্শন লাভের আশায় পুরীর বাহিরে আমরন-অনশন শুরু করে দেয়। অনশনের কয়েকদিন অতিবাহিত হলে গঙ্গা গোবিন্দ সেন স্বপ্নাদিষ্ট হন যে, এ স্থানে জগন্নাথ গঙ্গা গোবিন্দ সেনকে দর্শন না দিয়ে তাঁর সাচারের বাড়ির সম্মুখের দীঘিতে ভাসমান নিম কাঠ আকৃতিতে দর্শন দিবেন। স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে গঙ্গা গোবিন্দ সেন নিজ বাড়ি ফিরে আসেন এবং ক’দিন পর উক্ত দীঘিতে সøান করার সময় আকস্মিক ভাবে ভাসমান নিম কাঠ আকৃতিতে জগন্নাথ দর্শন লাভ করেন। অলৌকিক ভাবে দর্শন প্রাপ্ত এ নিম কাঠ দ্বারা জগ্ননাথ, বলরাম ও শুভদ্রা এ তিনজনের তিনটি মূর্তি তৈরি হয়। গঙ্গা গোবিন্দ সেনের নেতৃত্বে তৎকালীন বঙ্গের বিখ্যাত নির্মাতা কারিগর রামকান্ত নিম কাঠ খোদাই পদ্ধতিতে মূর্তি গুলো তৈরি করেন।
বলরাম জগন্নাথের বড় ভাই এবং শুভদ্রা ছোট বোন। জগন্নাথ ধামের ক’গজ সম্মূখে নিম কাঠের সাহায্যেই ১২টি চাকার উপর প্রায় ৪০ ফুট উচুঁ বিশিষ্ট অভিনব কারুকার্য খচিত রথ নির্মিত হয়। নিম কাঠে খোদাই পদ্ধতিতে বিভিন্ন আকর্ষনীয় মূর্তি তৈরি হয়। এসব মূর্তির মাঝে চুল বেঁধে রেখে বউ কে কাধে তুলে রাখা, পুরুষের প্রস্রাব পানে উদ্যত্ব যুবতী ষাড়ের উপর গাভী চড়ায় ও মাকে ছেলে ধর্ষন করছে ইত্যাদি নিখুত মূর্তি গুলো সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। অর্থ্যাৎ সত্য, ধাপর ক্রেতা ও কলিযুগের ঘটমান মানুষের আচরনের বিভিন্ন অংকিত স্মৃতি নিয়ে এ রথ নির্মিত হয়। ১২৭৫ বাংলা সনের ১৩ আষাঢ়ে প্রতিষ্ঠিত এ রথ ও জগন্নাথ ধামে প্রতিবছরের আষাঢ় মাসে ব্যাপক আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় রথযাত্রার উৎসব। পাকিস্তান আমলে তৎকালীন পূর্ব বঙ্গের সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য এ সাচার রথ উৎসবে আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য সহ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল হতে হাজার হাজার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এ রথযাত্রায় অংশ নিত। এ রথ যাত্রাকে ঘিরে অগনিত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের ঘটত এক মহামিলন আর মহা উৎসব।
এ ঐতিহ্যবাহী রথটি ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাঞ্জাবীরা পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেয়। রথের চতুরদিকের বেষ্টনীর ক’টি পাকা উচু খুঁটি অবশিষ্ট থেকে সেই ঐতিহ্যবাহী রথের প্রতীকী স্বাক্ষর বহন করে চলছে। এখনও প্রতি আষাঢ়ে বাঁশ ও কাঠ দ্বারা রথের কাঠামো তৈরি করে পূর্বের প্রথানুযায়ী রথযাত্রার উৎসব পালিত হচ্ছে। প্রতীকী স্বাক্ষর স্থানে সরকারি উদ্যোগে পূনঃএকটি রথ নির্মান করে হিন্দুসম্প্রদায়ের পুরানো ঐতিহ্যকে লালন সহ রথ ও জগন্নাথ ধামকে সরকারি ভাবে রক্ষনাবেক্ষন করা আবশ্যক।
শিরোনাম:
শনিবার , ৩০ মে, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ , ১৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এই ওয়েবসাইটের যে কোনো লেখা বা ছবি পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে ঋন স্বীকার বাঞ্চনীয় ।

