স্টাফ রিপোর্টার:
চিকিৎসক ও লোকবল সঙ্কটের পাশাপাশি অনিয়ম অব্যবস্থাপনা নোংরা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দুর্ঘন্ধসহ নানা সমস্যার আবর্তে নিমজ্জিত চাঁদপুর জেলা সদরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। চাঁদপুর ছাড়াও প্রায় ৪০টি চরাঞ্চল এবং পার্শ্ববর্তী লক্ষ্মীপুর ও শরিয়তপুরের অধিকাংশ রোগি এ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসে। বর্তমানে ৬৫ জন চিকিৎসকের মধ্যে ২৩ জন চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। তারপরও যে সব রোগি আসছেন তাদের অধিকাংশকেই হতে হয় প্রতারিত। বিশাল হাসপাতাল সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকলেও পকেটমার, দালাল, ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি, গ্রামের কোয়াক ডাক্তার ও বখাটেদের দৌরাত্ম্যে চিকিৎসা নিতে আসা রোগিরা হয়ে পড়ছেন তাদের কাছে জিম্মি। আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ওয়ার্ডবয়, নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করছে, তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ আউট সোর্সিংয়ের জনবলের বেশির ভাগই রোগিদের শহরের কয়েকটি প্রাইভেট হাসপাতাল ও বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভাগিয়ে নেয়ার সাথে জড়িত। যেগুলোর সাথে এ হাসপাতালের বেশ কজন চিকিৎসক সরাসরি সম্পৃক্ত। হাসপাতালে গাজী মেডিকেল হল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে লোকবল সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এসব লোকবলের দেখাশুনা করেন শফিক নামে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী বলে জানান ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রধান মিজানুর রহমান গাজী। একইভাবে ভর্তিকৃত রোগিদের খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে লাইসেন্স একজনের নামে, খাবার সরবরাহ করছেন আরেক জন। দীর্ঘ বছর আওয়ামী লীগ কর্মী আলমগীর ভূঁইয়া নামে এক ব্যক্তি খাবার সরবরাহ করে আসছেন। কিন্তু সঞ্জিব পোদ্দার নামে আরেকজন এবার খাবার সরবরাহ করছেন বলে তিনি জানান। নিম্ন মানের ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তালিকা বহির্ভূত খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।
কয়েকদিন বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগিদের কাছ থেকে জানা যায়, অধিকাংশ রোগি হাসপাাতালের নিম্ন মানের অনুপযোগী খাবারের জন্য বাইরে থেকে কিনে এনে কিংবা বাসা বাড়ির রান্না করা খাবার খাচ্ছেন। সরজমিনে দেখা যায় সকালের নাস্তায় রোগিদের ডিম, দুধ,কলা,পাউরুটি এবং ডাব দেয়ার কথা তালিকায় আছে ঠিকই কিন্তু রোগিরা পাচ্ছে কেবল মাত্র পাউরুটি, কলা ও ডিম। আর বাকি দুটি আইটেম গরুর দুধ ও ডাবের কথা শুধুই পথ্য খাদ্যের তালিকায়ই থেকে যায়। দুপুর দেড়টা বা ২টায় রোগিদের মাঝে খাবার পরিবেশন করার কথা থাকলেও প্রায়ই তা পরিবেশন করা হয় ৩টা থেকে সাড়ে ৩ টায়। রাতের খাবারে চলে এমন অনিয়ম। দেখা যায় একজন রোগীকে যে পরিমাণ খাবার দেয়ার কথা তা দিচ্ছে না। রুই মাছের কথা থাকলেও দেখা যায় সে দিনও পাঙ্গাস মাছ খাওয়ানো হচ্ছে। দুই এক দিন নামেমাত্র রুই মাছ রান্না হয়। গরু কিংবা খাসির মাংস দেয়া হয় বলে জানা যায় নি। এসব দিনেও বয়লার মুরগির মাংস দেয়া হয় তাও যৎসামান্য। গত কয়েক বছর ধরে দুজন নৈশপ্রহরী দিয়ে চলছে হাসপাতালের নিরাপত্তা কার্যক্রম। যার ফলে রাতের বেলায় ওয়ার্ড ভিত্তিক নৈশপ্রহরী না থাকায় বাইরের লোকজন অবাধে ওয়ার্ডে আসা যাওয়া করায় পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। বহিরাগত লোকজন হাসপাতালে প্রবেশ করে রোগিদের মোবাইল সেট, টাকাপয়সা ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায়। ইভটিজিংয়ের ঘটনা প্রায়ই ঘটে।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায় বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্তুপাকারে পড়ে আছে ভাঙ্গা বেড। ওয়ার্ডে অধিকাংশই বেডেই চাদর নেই। যাও আছে তা নোংরা ও অপরিষ্কার কিংবা ছেড়া। কাপড় ধোলাই কাজের ঠিকাদার হিসেবে আছেন সিডু মিজি। তিনি জানান, পর্যাপ্ত পরিমাণ ধোপা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এ সমস্যা হচ্ছে। পুরুষ ওয়ার্ডের সবগুলো টয়লেটের দরজা, পাইপ লাইন ভেঙ্গে গেছে। মলমূত্রে টয়লেটগুলো ডুবে আছে। এর মধ্যেই নিরুপায় হয়ে রোগিরা তাদের প্রাকৃতিক ডাক সারছেন।
আউটডোরে প্রতিদিন প্রায় ৬-৭শ’ রোগি দেখা হয় বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। বিভিন্ন চিকিৎসকের রুমের সামনে প্রতিদিন অসংখ্য রোগির ভিড় থাকলেও ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সময়ের বিবেচনা না করে প্রচ- ভিড়ের মধ্যে ডাক্তারের রুমে প্রব্শে করে ডাক্তার ভিজিট করেন। এমনিতেই দু’একজন ছাড়া বেশিরভাগ ডাক্তার সঠিক সময়ে হাসপাতালে আসেন না। দুই এক ঘন্টা পরে দেরি করে যাই আসেন দেখা যায় ওয়ার্ডে কিংবা কলিগদের রুমে বসে গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন। আবার দুপুর ১টার মধ্যেই অধিকাংশই শহরের বিভিন্ন প্রাইভেট চেম্বারে কিংবা বাসায় চলে যান। সিনিয়র গাইনি কনসালটেন্ট ফাতেমা বেগম, সিনিয়র কনসালটেন্ট সার্জারি হাসানুর রহমান, সিনিয়র কনসালটেন্ট শিশু ওয়ালিউর রহমান, ইনডোর অর্থোপেডিকস্ ডাঃ শফিকুর রহমান টিপুকে দেখা যায় অধিকাংশ দিনই দেরি করে হাসপাতালে আসেন। এসময়টিতে তারা তাদের নিজস্ব চেম্বারে রোগি দেখায় ব্যস্ত থাকেন। বর্তমানে বিএমএ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারণার দোহাই দিয়ে স্বাচিপের বেশ কজন নেতা যারা এ হাসপাতালের চিকিৎসক তারাও রোগি দেখা থেকে দূরে থেকে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, জনবল সঙ্কটসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ প্রদীপ কুমার দত্ত জানান, খাবারসহ বিভিন্ন সরবরাহকারীরা নতুনভাবে কাজ শুরু করেছে। এর জন্য আমাদের মনিটরিং টিম রয়েছে, সহসায় এসব দেখা হবে। হাসপাতালে বখাটেদের উৎপাতের ব্যাপারে প্রায়ই অভিযান চালানো হয়। তাছাড়া চিকিৎসক, ঔষধ সঙ্কটসহ অন্যান্য বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে হাসপাতালের নানা অব্যবস্থাপনা পূর্বের তুলনায় অনেক উন্নতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
