চাঁদপুরে ৫১হাজার জেলে ১৭দিনেও খাদ্য সহায়তা পায়নি॥
বরাদ্ধ আসলে ৩৬ হাজার ৫শ ৭৫ জন খাদ্য পাবে॥ বঞ্চিত হবে ১৪ হাজার ৬শ১৫জন

শওকতআলী॥
মা ইলিশ রক্ষার এই সময়ে সরকার জেলেদের ২০ কেজি করে চাল সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দেয়। অথচ ইলিশের প্রজনন সময়ের ১৭দিন পার হলেও কোনো প্রকার খাদ্য সহায়তা পায়নি চাঁদপুরের ৫১ হাজার ১শ ৯০ জন জেলে। সরকারের এ ন্যূনতম সহায়তা নির্দিষ্ট সময়ে না পেয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে হাজার-হাজার জেলে। এ নিয়ে জেলেদের মনের মধ্যে দেখা দিচেছ মারাত্বক উত্তেজনাও তাদের মধ্যে দিন দিন ক্ষোভ বাড়ছে । পাশাপাশি তাদের ঋণের বোঝাও বাড়ছে বলে তারা জানান । চাঁদপুরের মৎস্য অফিস সূত্র জানান,আগামী ২২ অক্টোবরের পূর্বে খাদ্য সহায়তা আসলে ৩৬ হাজার ৫শ” ৭৫ জন জেলে ২০ কেজি করে খাদ্য সহায়তা পাবে। বাকী ১৪ হাজার ৬শ” ১৫ জন জেলে এ বছর খাদ্য সহায়তা পাবে না। যে কোন সময় তারা খাদ্য সহায়তা না পেয়ে দলবদ্ধ হয়ে নদীতে নেমে পড়তে পারে আইন ভঙ্গ করে বলে জানান,তাদের নেতারা। চাঁদপুর জেলার জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ করার জন্য সরকারের ঘোষিত মার্চ-এপ্রিল এবং চলতি অক্টোবর মাসে ১ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সরকার সব ধরনের মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করেছে। নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ছোট বড় সব আড়ৎ বন্ধ। প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র এক জায়গায় জড়ো করে রেখেছেন আড়ৎদাররা। কয়েকটি আড়ৎ ঘুরে একজন আড়ৎদারকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে ধার দেনা নিয়ে কাজ না থাকায় বেকার জেলে পরিবারগুলোর দিন কাটছে খুবই দুঃখ কষ্টে। চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলা থেকে শুরু করে দক্ষিণে হাইমচর উপজেলা পর্যন্ত হাজার-হাজার জেলে পরিবার জীবন জীবীকা নির্বাহ করে মৎস্য আহরণ করে। জেলে পাড়াগুলো ঘুরে দেখা গেছে, শত শত জেলেরা এখন নৌকা ও জাল নিয়ে মেরামত করেই সময় পার করছেন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। জেলেরা বলেন মাছ ধরা বন্ধ মৌসুমে সরকারের কাছ থেকে কোন সহায়তা পায়নি এখন পর্যন্ত । জেলেরা তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরী এবং সরকারি সহায়তা বৃদ্ধির জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন। পদ্মা-মেঘনা নদীতে জেলেরা পুর্বে গুটিজালসহ নিজেদের তৈরী করা জাল দিয়ে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ আহরণ করলেও সময়ের পরিবর্তনে এক শ্রেনীর জেলে কারেন্টজাল দিয়ে মাছ নিধন করেন। এ কারণে প্রকৃত জেলেরা সারা বছরেই প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে থাকেন। যদিও নদীর পাড় ঘুরে দেখা যায়, জেলেরা নৌকা আর জাল মেরামত করছেন। আবার কেউ কেউ দোকানের সামনে পাতা টেবিলে বসে টিভি দেখছেন। কেউ বা খোশগল্পে মেতে উঠেছেন। অলস সময় কাটানো ওসব জেলে সাংবাদিক দেখে হতাশার ছাপ পড়া মুখে কাছে এসে বলেন, স্যার চাইল কবে দিব? গত বছর তো কর্মসূচির শুরুতেই দিছে। কেউ কেউ বলছে, আমরা তো নদীর পাড়ে বইয়া রইলাম। নদীতে নামি না। মাছ ধরি না। তয় চাইল দেয় না ক্যান? আর কবে দিবো ১৭ দিনতো পার হলো? মিথ্যে আশ্বাস দিতে পারবোনা বলে স্থান ত্যাগ করি। জায়গাটির নাম চাঁদপুর সদর উপজেলার হারিণা ফেরিঘাট। জেলেদের এতোগুলো প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেতে ছুটে যাই পার্শ্ববর্তী চাঁদপুর সদর উপজেলার ১২নম্বর চান্দ্রা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খান জাহান আলী কালু’র কাছে। তিনি জানান, মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম সফল করতে আমরা বদ্ধপরিকর। দশজন চৌকিদার একজন দফাদারসহ আমি নিয়মিত নদীতে টহল দিচ্ছি। গত ১৭দিনে কেউ নদীতে নামেনি। জেলেদের চাল পাবার ব্যাপারে তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে চাল আসতে পারে এমনটাই শুনেছি। তবে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
অপর দিকে জেলে নেতারা জানান, দরিদ্র জেলে পরিবার মাছ আহরণ এর জন্য কয়েক লাখ টাকার জাল ও নৌকা সংগ্রহের জন্য জড়িয়ে পড়েন মহাজনী দাদন পথায়। এ কারণে দাদন নিয়ে তাদের মাছ আহরণের সরঞ্জাম ক্রয় করতে হয়। আবার অনেকেই এনজিও কিংবা সমিতি থেকে ঋন নিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয় করেন। এ কারণে তাদের বছর জুড়ে ঋন পরিশোধের চাপ লেগেই থাকে। সংসার ও সন্তানদের লেখা পড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় প্রতিনিয়ত। এরপর আবার মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করায় বার্তি চাপে দিশে হারা হয়ে উঠছে জেলে পরিবারগুলো। চাঁদপুর জেলার ৫১ হাজার ১শ”৯০ জন জেলে পরিবারের সহায়তা বৃদ্ধিতে সরকার যেমন এগিয়ে আসবে, তেমনি মা ইলিশ রক্ষায় সব শ্রেনী পেশার মানুষ সহযোগিতা করলে জাতীয় সম্পদ ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এমন প্রত্যাশাই করছেন সকলে। সরকার ঘোষিত মা ইলিশ রক্ষায় বদ্ধ পরিকর জেলা ট্রাস্কফোর্স। জেলার ৬০ কিলোমিটার নদী এলাকায় চলছে প্রশাসনের অভিযান। জেলেদের সহায়তা ও সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য বিভাগ। তবে আইন অমান্য করে কোন জেলে মা ইলিশ নিধন করলে কোন প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসনের শীর্ষ এক কর্মকর্তার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেন নি। অপরদিকে চাল পাবার আশায় বুক বেঁধে আছেন চাঁদপুরের অর্ধলক্ষাধিক জেলে পরিবার। গতবছর এ কর্মসূচির শুরুতেই প্রতি জেলেকে ২০কেজি করে চাল দেয়ার উদ্যোগ নেয়ায় জেলেরা দ্রুত খাদ্য সহায়তা পায়।
কর্মসূচি সফল করতে দিন রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন দাবি করে জেলা প্রশাসক মোঃ আবদুস সবুর মন্ডল বলেন কর্মসূচি প্রায় শতভাগ সফল হচেছ এবং ইলিশ উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু লোক নদীতে নামছে। তারা মূলত মৌসুমি জেলে। অবশ্য তাদেরকে কারাদন্ড ও অর্থদন্ডও দেয়া হচ্ছে। চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ সফিকুর রহমান ভিজিএফ’র চাল দেয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেন নি। তিনি জানান, জানতে পেরেছি ২২ অক্টোবরের মধ্যে চাউল আসতে পারে। এ চাউল আসলে ৩৬ হাজার ৫শ” ৭৫ জন ২০ কেজি করে খাদ্য সহায়তা পাবে। ১৪ হাজার ৬শ” ১৫ জন এ খাদ্য সহায়তা এ বছর পাবে না। তাদের তালিকা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে এখনও যায়নি।তবে একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, এবছর রোহিঙ্গাদের মাঝে পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ বিতরণ করায় জেলেদের চাল দেয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে। কারণ ভিজিএফ-এর চালের ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো প্রকার তৎপরতা চোখে পড়েনি। এদিকে মা ইলিশ রক্ষায় জেলা টাস্কফোর্স, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ দিন রাত মেঘনা নদী চষে বেড়াচ্ছেন,কাউকে নদীতে নামতে দিচ্ছেন না।
