বিশেষ প্রতিনিধি
চাঁদপুর জেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ। নারী শিক্ষার প্রসারে কলেজটি কাজ করে যাচ্ছে ১৯৬৪ সাল থেকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা ও সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমে জেলার মধ্যে যতোটি অনার্স কলেজ রয়েছে তার মধ্যে এ কলেজটি উল্লেখযোগ্য। কলেজের ধারাবাহিক কার্যক্রম যখন সকল মহলে প্রশংসিত তখনই চলতি বছর মে মাসের ২২ তারিখে বদলির আদেশ হয় কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর এম. এ. মতিন মিয়ার। বদলির আদেশের প্রায় এক মাস পর ২৭ জুন কলেজ থেকে বিদায় নেন তিনি। একই তারিখে পদোন্নতি পেয়ে এ কলেজে যোগদান করেন নরসিংদী শিবপুর শহীদ আসাদ কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর কাজল কৃষ্ণ দাস। সেই থেকে কপাল পুড়েছে বলে দাবি চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষক, কর্মচারী ও অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের। একের পর এক দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও কথায় কথায় অধীনস্থদের হুমকি-ধমকি দিয়ে অচল করে রেখেছেন কলেজের প্রশাসনিক বিভাগ। এতে করে স্থবির হয়ে পড়েছে কলেজের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম। তাই কলেজের শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনতে একযোগে অধ্যক্ষের অপসারণ চান কলেজের ৩৫ জন শিক্ষক।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধ্যক্ষ কাজল কৃষ্ণ দাস পূর্বে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন ঢাকা উত্তরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কলেজে। সেখানে সীমাহীন অনিয়ম ও স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবে কলেজের কার্যক্রম পরিচালনা করায় ওই কলেজের তৎকালীন ৪৬ জন শিক্ষক এই অধ্যক্ষের অপসারণের জন্যে মাউশি বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে উল্লেখ ছিলো, এই কলেজে হয় তিনি (অধ্যক্ষ) থাকবেন নতুবা অভিযোগকারী ৪৬ শিক্ষক থাকবেন। একের পর এক অভিযোগে পরবর্তীতে তাকে ঢাকা উত্তরা বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ থেকে অপসারণ করে পদাবনতি দেয়া হয়। অধ্যক্ষ থেকে উপাধ্যক্ষ পদে পদাবনতিপ্রাপ্ত হওয়ার পর উচ্চমহলে সর্বোচ্চ লবিং করে আবারও অধ্যক্ষ হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। আর সেই পদোন্নতিতেই যোগ দেন চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজে। একাধিকবার নিজ পদের রদবদল হলেও নিজের কর্মের বৈশিষ্ট্যের রদবদল ঘটাতে পারেননি অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজল কৃষ্ণ দাস।
কলেজের শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের অভিযোগে বেরিয়ে আসে চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষের গত সাড়ে ৪ মাসের দুর্নীতির বিচিত্র চিত্রগুলো। জানা যায়, কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি বেসিক বেতন পান প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। মূল বেতনের ৩০ শতাংশ বাড়িভাড়া হিসেবে পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে শর্ত ছিলো যদি কোনো অধ্যক্ষ কলেজ ক্যাম্পাসে থাকেন তবে কোনোভাবেই বাড়ি ভাড়ার অর্থগ্রহণ করতে পারবেন না। অথবা যদি কোনো অধ্যক্ষ বাড়ি ভাড়া গ্রহণ করেন তবে তিনি কখনোই কলেজ ক্যাম্পাসে থাকতে পারবেন না। কিন্তু অধ্যক্ষ কাজল কৃষ্ণ দাস কলেজ ক্যামপাসের একটি কক্ষকে নিজের বাসা হিসেবে ব্যবহার করেও বিধিবহির্ভূতভাবে ‘অন্যত্র বাড়ি ভাড়া আছেন’ এমন মিথ্যা অজুহাতে প্রতি মাসে ২২ হাজার টাকা করে বাড়ি ভাড়া বাবদ গ্রহণ করে আসছেন। সে হিসেবে গত ৪ মাসে বিধিবহির্ভূতভাবে তিনি শুধমাত্র এ খাত থেকে গ্রহণ করেছেন প্রায় ১ লাখ টাকা!
অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজল কৃষ্ণ দাস পদাধিকার বলে কুমিল্লা অর্বিট্রেশন বোর্ডের সদস্য হওয়ায় মাস দেড়েক পূর্বে বোর্ডের একটি সভায় যোগ দিতে যান। এ সভায় যে সকল সদস্য যোগ দেন তাদের যাতায়াত বাবদ বোর্ড থেকে ২ হাজার টাকার একটি সম্মানী দিয়ে থাকে। তবুও অধ্যক্ষ কাজল কৃষ্ণ দাস সভাশেষে কলেজে ফিরে কলেজ ফান্ড থেকে তার যাতায়াত ব্যয় বাবদ ৩ হাজার টাকার রসিদ দেখিয়ে সে টাকা ভোগ করেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ।
এ কলেজটিতে শিক্ষক স্বল্পতা থাকায় ৩৬তম বিসিএসের চারজন ক্যাডারকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ে ব্যক্তিগত ফান্ড থেকে ঘুষ দিয়ে ওই চার শিক্ষককে কলেজে আনতে হয়েছে বলে দাবি করেন অধ্যক্ষ কাজল কৃষ্ণ দাস। এজন্যে তিনি কলেজ ফান্ড থেকে সেই ঘুষের অর্থ তাকে পরিশোধের জন্যে প্রস্তাব রাখেন। যদিও একাধিক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ নিশ্চিত করেছেন বিসিএস পাস করা শিক্ষকগণ স্বাভাবিক নিয়মেই কলেজে নিয়োগ পেয়ে থাকে। এজন্যে মন্ত্রণালয়ে কোনো প্রকার অর্থ দিতে হয়নি। তাই কলেজের বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজন এর বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ তিনি আদায় করে নেন। সম্প্রতি কলেজের ইংরেজি, বাংলা ও সমাজকর্ম বিভাগ থেকে অধ্যক্ষের অর্থ চাওয়ার বিষয়টি কলেজ ক্যাম্পাসে বেশ আলোচিত। ইতিমধ্যে সমাজকর্ম বিভাগ থেকে ১০ হাজার টাকা অধ্যক্ষকে দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফয়েজুর রহমান। সমাজকর্ম বিভাগ সেমিনার ফি থেকে অন্য একটি ভাউচার দেখিয়ে অধ্যক্ষের মনোরঞ্জনের জন্যে এ অর্থ পরিশোধ করেছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক ফয়েজুর রহমান বলেন, শিক্ষক নিয়োগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও আমাদের সমাজকর্ম বিভাগকে নিয়ে সভা করেন প্রিন্সিপাল স্যার। সেখানে উনাকে টাকা দেয়ার প্রস্তাব করেন তিনি। প্রথমে আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালেও পরবর্তীতে টাকা দেয়ার জন্যে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আমি টাকা দেবো না বলে সরাসরি জানালে বাংলা ও ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যক্ষকে টাকা দিয়েছেন বলে আমাকে জানানো হয়। কাজেই আমাকেও টাকা দিতে হবে বলে নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে আমাদের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মিঠু রাণী দেকে আমার কাছে টাকার জন্যে পাঠান এবং আমি জানতে পারি এ টাকা না দিলে আমাকে এখান থেকে বদলি করাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হবে। তাই শেষ পর্যন্ত আমি ১০ হাজার টাকা মিঠু রাণী দের মাধ্যমে অধ্যক্ষ স্যারের হাতে পেঁৗছাই।
সরকারি নিয়মানুযায়ী প্রতি বছরই সরকারি কলেজগুলো শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ থেকে একাডেমিক সামগ্রী মেরামত ব্যয় বাবদ বার্ষিক একটি অনুদান পেয়ে থাকে। চলতি বছর চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ এ অনুদান পেলেও অধ্যক্ষ দাবি করেছেন এ অনুদান আনতে তাকে মন্ত্রণালয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়েছে। তাই মন্ত্রণালয়কে দেয়া ঘুষের টাকা কলেজ ফান্ড থেকে তাকে পরিশোধ করতে তার অধীনস্থদের নির্দেশ দেন। কিন্তু অতীতে এ ফান্ডের জন্যে কলেজ মন্ত্রণালয় বা কোনো অধ্যক্ষকে টাকা দিতে হয়নি বলে বর্তমান অধ্যক্ষকে কোনো অর্থ দিতে দ্বি-মত পোষণ করা হয়। দ্বি-মত পোষণ করা প্রতিজন শিক্ষকের সাথে অধ্যক্ষের সৃষ্টি হয় দা-কুমড়া সম্পর্ক।
শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারীর অভিযোগই নয়, গত সাড়ে ৪ মাসে তিনি কলেজের প্রশাসনিক সকল নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকগণ। সম্প্রতি কলেজের তিন বিভাগের প্রভাষককে লঘু অপরাধ দেখিয়ে পৃথক শোকজ করার ঘটনাটি বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে সবার মধ্যে। তিন শিক্ষকের মধ্যে একজন হলেন কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ওমর ফারুখ। জানা যায়, কলেজ থেকে তাকে একটি প্রশিক্ষণের জন্যে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। জবাবে প্রভাষক ওমর ফারুখ তার স্ত্রীর অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করে প্রশিক্ষণে অন্য শিক্ষককে পাঠানোর জন্যে অধ্যক্ষ বরাবর অনুরোধ করেছিলেন। আর তাতেই এক সপ্তাহের সময়সীমায় কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয় এই প্রভাষককে।
এ বিষয়ে প্রভাষক ওমর ফারুখ বলেন, আমি একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে আমার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। আমাদের অধ্যক্ষ মহোদয় আমাকে প্রশিক্ষণের জন্যে যেতে বলেছেন, আমি তাতে আমার পারিবারিক অসুস্থতার কথা জানালে তিনি আমাকে তা লিখিতভাবে জানাতে বলেন। আমি অধ্যক্ষ বরাবর দরখাস্তের মাধ্যমে তা জানানোর চেষ্টা করি। তবুও তিনি আমাকে কেনো শোকজ করেছেন তা আমার জানা নেই। তিনি যেহেতু আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাই এ বিষয়ে তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
কলেজের অধ্যক্ষ কোথাও ছুটি বা অফসিয়াল কাজে অন্যত্র গেলে তার অবর্তমানে উপাধ্যক্ষ, আর উপাধ্যক্ষ না থাকলে সিনিয়র কোনো শিক্ষককে দায়িত্ব দিয়ে যাওয়ার নিয়ম থাকলেও চাঁসমক অধ্যক্ষ এ নিয়ম মানতে নারাজ। গত পহেলা অক্টোবর তিনি কোনো প্রকার ছুটি না নিয়ে কাউকে কলেজ পরিচালনার দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিয়ে টানা ২২ দিনের জন্যে ঢাকা অবস্থান করেন। কলেজ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার অসুস্থতার বিষয় উল্লেখ করেন। কিন্তু তার অবর্তমানে উপাধ্যক্ষ দায়িত্ব পালন করবেন কি না তা নিশ্চিত করেননি।
শুধুমাত্র এ ২২ দিনই নয়, নিজ প্রয়োজনে যখন যেখানে ইচ্ছে, সেখানেই যাচ্ছেন, অথচ কলেজ কর্তৃপক্ষের অনেকেই এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। যার ফলে অভিভাবক বা শিক্ষার্থীরা কোনো প্রয়োজনে অধ্যক্ষের খোঁজে আসলে তার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কোনো কোনো অভিভাবক বিশেষ কাজে টানা দুদিন এসেও কলেজ থেকে ফিরে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কলেজের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের বিধিবহির্ভূত বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুবিধার জন্যে ব্যবহার করে থাকেন বলেও অভিযোগ করেন একাধিক শিক্ষক। এ কলেজে যোগদানের পর তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের প্রধান মিঠু রাণী দে-কে নিজ অফিসে ডেকে নিয়ে বলেছেন, ‘আমিও হিন্দু, তুমিও হিন্দু। কাজেই আমাকে সহযোগিতা করো।’ এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্বয়ং মিঠু রাণী দে। তিনি বলেন, স্যার কলেজের একমাত্র হিন্দু অধ্যক্ষ হওয়ায় এবং আমিও হিন্দু হওয়ায় কাজে সহযোগিতার কথা বলেছেন। আমাকে নানা সময় বিভিন্ন অর্থ শিক্ষকদের কাছ থেকে আনতে বলতেন বা শিক্ষকদের বিভিন্ন কাজ করার জন্যে আমার মাধ্যমে নির্দেশ দিতে চাইতেন। কিন্তু আমি তা এড়িয়ে যেতাম এবং বলতাম, স্যার এ বিষয়টি আপনি সরাসরি বলেন বা ভাইস প্রিন্সিপাল স্যারকে বলেন। আমি অর্থনৈতিক বিষয়ে শিক্ষকদের কোনো কথা বলতে চাইতাম না। তবে স্যার আমাকে দিয়েই কথাগুলো বলাতে চাইতেন।
এমন নানামুখী অনিয়মে দীর্ঘদিন ধরেই অধ্যক্ষের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছেন কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীগণ। অভিযোগ আমলে নিয়ে চলতি মাসের ৪ নভেম্বর চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে রামগঞ্জ সরকারি কলেজে বদলি করা হয় কাজল কৃষ্ণ দাসকে। বদলি আদেশে উল্লেখ ছিলো অবিলম্বে তাকে বদলিকৃত কলেজে যোগদানের জন্যে। বদলি আদেশের প্রায় ১০ দিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত বদলি হওয়ার কোনো কার্যক্রম শুরু করেননি তিনি। তার বদলিতে চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজে নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের প্রাক্তন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাউশি সংযুক্ত অধ্যাপক কায়সার আহমেদ। এ কলেজ থেকে বর্তমান অধ্যক্ষ কাজল কৃষ্ণ দাস বদলি আদেশ আমলে না নেয়ায় নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ কায়সার আহমেদও আসতে পারছেন না। শিক্ষকদের অনেকেই ধারণা করছেন আগামী ৩০ জানুয়ারি প্রফেসর কাজল কৃষ্ণ দাস অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে, তাই অবসরে যাওয়ার আগপর্যন্ত বদলি আদেশ বাতিল করে বর্তমান কলেজে থাকার জন্যে তিনি উচ্চমহলে সর্বাত্মক লবিং করে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কলেজের সকল শিক্ষকের পক্ষে শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. মাসুদ হোসেনের সাথে কথা বললে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অধ্যক্ষ স্যার এ কলেজে যোগদানের পর থেকে একঘেঁয়েমি মনোভাব দেখিয়ে আসছেন। তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষকদের সাথে তার দূরত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আমাদের কলেজে ইতিপূর্বে বহু অধ্যক্ষ এসেছেন। তাঁদের সময় বহু শিক্ষক যোগদান করেছেন। কিন্তু আমি আমার চাকুরিজীবনের ১৫ বছরের মধ্যে কখনোই শুনিনি কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্যে মন্ত্রণালয়কে টাকা দিতে হয়। কিন্তু বর্তমান অধ্যক্ষ স্যার টাকা দাবি করেছেন এবং একটি ডিপার্টমেন্ট থেকে তা গ্রহণও করেছেন। এছাড়াও শিক্ষকদের হুমকি-ধমকি দিয়ে কাজ আদায় করতে চাওয়ায় সকল শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এমতাবস্থায় কলেজের ৩৫ জন শিক্ষকই মনে করেন, তিনি যতো দ্রুত বিদায় নেবেন ততোই কলেজের জন্যে মঙ্গল হবে। তবে গত চার মাসে তার আচরণগত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও আমরা শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শ্রেণি পাঠদানে কোনোপ্রকার প্রভাব ফেলতে দেইনি। আমরা শিক্ষকরা চাই না আমাদের শ্রমে কলেজটির যে সুনাম আমরা গড়ে তুলেছি তা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হোক। কলেজের শিক্ষার মানোন্নয়নে যা যা কিছু করার তার সবকিছুই আমরা শিক্ষকরা করছি।
উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মাসুদুর রহমান প্রশাসনিক বিভাগ নিয়ে বলেন, গত ৪ নভেম্বর অধ্যক্ষ স্যারের বদলির আদেশ হয়। এরপর তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করায় কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোই অচল হয়ে পড়েছে। অধ্যক্ষ স্যারের বিদায়ই পারে এই মুহূর্তে অচলাবস্থা নিরসন করতে। ‘কেনো অধ্যক্ষের এমন আকস্মিক বিদায়’ এমন প্রশ্নের জাবাবে উপাধ্যক্ষ বলেন, একক সিদ্ধান্ত ও একঘেঁয়েমি মনোভাব তার মধ্যে শুরুতে যেমন ছিলো বর্তমানে তেমনই আছে। আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্যের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমরা ৮ তলাবিশিষ্ট একটি ভবন পেয়েছি। কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিক্ষক পরিষদসহ পর্যালোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেই, ভবনটি প্রশাসনিক ভবনের পেছনে পুরানো ভবন ভেঙ্গে করা হবে। কিন্তু বর্তমান অধ্যক্ষ যোগদানের পর আমাদের অতীতের সিদ্ধান্ত নাকচ করে দিয়ে সামনের মাঠ নষ্ট করে সেখানে ভবন করার সিদ্ধান্ত দেন। উনার এ সিদ্ধান্ত কেউই মেনে নিতে চাননি। এ নিয়ে আমাদের অনেকের সাথেই তার মতানৈক্য হয়। এমন বহু উদাহরণ আছে, যাতে তার স্বেচ্ছাচারিতা প্রকাশ পেয়েছে। আমি মনে করি বদলির আদেশ হওয়ার পরও স্যার যতোই এখানে থাকবেন ততোই এ মতানৈক্য বৃদ্ধি পাবে।
যদিও উল্লেখিত অভিযোগগুলোর অধিকাংশই স্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজল কৃষ্ণ দাস। তবে অভিযোগকৃত কাজগুলো বিধিসম্মত বলে দাবি করেছেন তিনি। কলেজের অফিস সহায়ককে বলা সাম্প্রদায়িক উক্তি ‘আমিও হিন্দু, তুমিও হিন্দু’ কাজেই আমাকে সহযোগিতা করো’ এ মন্তব্যটি তিনি করেননি বলে জানিয়েছেন। যদিও অফিস সহকারী মিঠু রাণী দে এ মন্তব্য বলার সত্যতা স্বীকার করেছেন। ৪ বিভাগে শিক্ষক স্বল্পতা দূরকরণে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্রে করে অর্থগ্রহণের বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেছেন অগোচরে। তিনি বলেন, আমি এ কলেজে আসার পর শিক্ষার্থীরা আমাকে জানায় তাদের যুক্তিবিদ্যা ক্লাস হয় না। যার কারণে আমি এক সপ্তাহের মধ্যে একজন শিক্ষক কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বদলি করিয়ে এখানে নিয়ে আসি। পরবর্তীতে বাংলা, ইংরেজি ও সমাজকর্ম বিভাগে আরও তিনজন শিক্ষক আনি। শিক্ষকদের আনতে গিয়ে মন্ত্রণালয়ে মোটা অঙ্কের কিছু টাকা ব্যয় হয়। তা আমি ডিপার্টমেন্টগুলোকে দিতে বলি। কিন্তু সমাজকর্ম বিভাগ ১০ হাজার টাকা ছাড়া অন্য কোনো ডিপার্টমেন্ট কোনো টাকা দেয়নি।
‘মন্ত্রণালয়ে দেয়া টাকাগুলো কি কলেজ ফান্ডের, নাকি ব্যক্তিগত’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবগুলো টাকাই আমার পকেট থেকে দেয়া। সমাজকর্মের টাকা গ্রহণ করার পরও এখনও মোট খরচের আশি শতাংশ টাকা আমি পাওনা আছি।
ছুটিকালীন দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি এখানে যোগদানের পর অক্টোবর মাসে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ি। যেদিন আমি কর্মস্থল ত্যাগ করি সেদিন এতো বেশি অসুস্থ ছিলাম যে, একজন শিক্ষক আমাকে বাসায় দিয়ে আসেন। পরদিন আমি ঢাকা চলে যাই। এ অবস্থায় কাউকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার মতো মানসিকতা আমার ছিলো না। কলেজের সকল শিক্ষকের সাথে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
‘সকল শিক্ষকের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকলে, কেনো তার বিরুদ্ধে এতো অভিযোগ’ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে যে অধ্যক্ষ এ কলেজে বদলি হয়ে আসছেন তিনি একজন দুর্নীতিবাজ মানুষ। তিনি কুমিল্লা বোর্ডের প্রাক্তন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতির কারণে তাকে নবীনগর বদলি করা হয়। সেই অধ্যক্ষকে এ কলেজে আনার জন্যেই অন্য একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাকে তড়িঘড়ি করে বদলি করেছে। শিক্ষক-অধ্যক্ষ মধ্যকার কোন্দল নিয়ে তিনি বলেন, আমি এখানে আসার পূর্ব পর্যন্ত শিক্ষকদের মধ্যকার নির্দিষ্ট কয়েকজন দিয়ে উন্নয়ন কমিটির বিভিন্ন কাজ করানো হতো। আমি আসার পর সেই নির্দিষ্ট কয়েকজনকে কমিটিতে না রেখে পর্যায়ক্রমে সকল শিক্ষককে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করায় পূর্বের ওই কমিটির বিশেষ সুবিধাগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে তারাই আমার বিরুদ্ধাচরণ করছে বলে আমার বিশ্বাস।
এদিকে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সম্পর্কে বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ ও হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলে তারা অধ্যক্ষ কাজল কৃষ্ণের বক্তব্যকে ‘ডাহা মিথ্যাচার’ বলে আখ্যায়িত করেন। করিৎকর্মা লোক হিসেবেই তাঁর সুনাম রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
গত ৪ নভেম্বর রামগঞ্জ সরকারি কলেজে বদলি হওয়ার পরও নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করার কারণ জানতে চাইলে অধ্যক্ষ কাজল কৃষ্ণ বলেন, আমার চাকুরির আর দেড় মাসের মতো রয়েছে। এমতাবস্থায় আমি রামগঞ্জ যাওয়াটা কোনোভাবেই সমীচীন মনে করি না। এ বিষয়ে আমি ঢাকা বা ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বদলির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আমাকে সাত কর্মদিবস অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। সেখান থেকে যে নির্দেশনা আসে সে অনুযায়ী আমি সিদ্ধান্তগ্রহণ করবো।
মূল বেতনের ৩০ শতাংশ বাড়িভাড়া গ্রহণ করেও কলেজ ক্যাম্পসে থাকার অভিযোগ তিনি স্বীকার করে বলেন, আমার পূর্ববর্তী অধ্যক্ষগণ এ টাকা নিয়েছেন, তাই বর্তমানে আমিও তা গ্রহণ করছি। ‘টাকাগ্রহণের বিষয়টি বিধিবহির্ভূত কিনা’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তা সম্পূর্ণ বিধিসম্মত। কলেজ ক্যাম্পাসে জরাজীর্ণ কক্ষে থেকে আমি বরঞ্চ কলেজ ক্যাম্পাসকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনছি। এজন্যে শিক্ষা বিভাগের কাছ থেকে আমি উল্টো ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তাই কলেজ ক্যাম্পাসে থাকলেও বাড়ি ভাড়াগ্রহণ করা বিধিবহির্ভূত নয় বলে তিনি দাবি করেন।
যদিও ‘সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন ও ভাতাদি আদেশ-২০০৯’-এর বিধান মোতাবেক বেতন কাঠামোতে বলা হয়, ‘বেতন স্কেল-৪-এ সরকারি চাকুরিজীবীগণ যদি জেলা পর্যায়ে থাকেন তবে তারা মূল বেতনের ৩৫ শতাংশ গ্রহণ করতে পারবেন। তবে শর্ত থাকে যে, সরকারি বাসভবন ব্যবহার বা সরকারি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ইমারত থাকার জন্যে ব্যবহার করলে বেতন ভাতার অংশ গ্রহণ করতে পারবেন না।’ যা অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজল কৃষ্ণ দাসের বক্তব্যের সাংঘর্ষিক।
জেলা সদরের খ্যাতিমান এ বিদ্যাপীঠটির শিক্ষার গুণগত মান রক্ষার স্বার্থে অবিলম্বে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটুক এবং শিক্ষাঙ্গনের সকল দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান দুর্নীতিগুলো বন্ধ হোক এমনটাই দাবি কলেজ সংশ্লিষ্টদের।
