
চাঁদপুর নিউজ রিপোর্ট
বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে কাজীদের দোষারোপ করা হলেও বাস্তব চিত্র ও তথ্য ভিন্ন। এ বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, এখন কাজীদের দ্বারা বাল্য বিবাহ খুব কমই হয়ে থাকে। সমাজে এখন যে সব বাল্য বিবাহ হচ্ছে তার অধিকাংশই কাজীকে পাশ কাটিয়ে স্থানীয় মৌলভী সাহেব এবং নোটারী পাবলিকের কার্যালয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে আসছে। অথচ বিবাহ বা তালাকের ক্ষেত্রে একমাত্র আইনি স্বীকৃতি হচ্ছে সরকারি কাজীর কাছে বিবাহ বা তালাক রেজিস্ট্রি করা। যা দেওয়ানী চুক্তিনামা হিসেবে আইনি স্বীকৃতি। দেখা গেছে যে, বর বা কনে প্রাপ্ত বয়স্ক না হলে এবং এ বিবাহ রেজিস্ট্রি করতে কাজী সাহেব অপারগতা প্রকাশ করলে সে ক্ষেত্রে মৌলভী সাহেব এবং এফিডেভিটের মাধ্যমে তা সম্পন্ন করা হয়।
বিবাহ-শাদী একটি পবিত্র সামাজিক বন্ধন। এর জন্য ধর্মীয় বিধান এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন রয়েছে। উভয় বিধানের সমন্বয়ে হয়ে থাকে এ পবিত্র বন্ধন। ধর্মীয় বিধানের সাথে সমন্বয় সাধন করেই প্রণয়ন করা হয়েছে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন। যা ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন নামে অভিহিত। এ ছাড়া বাল্য বিবাহ নিরোধ সংক্রান্ত আইন হয় ১৯২৯ সালে। এ আইনের প্রথম সংশোধনী হয় ১৯৮৪ সালে। এ সংশোধনীতেই বিবাহের ক্ষেত্রে বর ও কনের অন্যূন বয়স নির্ধারণ করা হয়। বরের বয়স কমপক্ষে ২১ ও কনের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়। এর কম বয়সী ছেলে-মেয়ের বিবাহ হলে সেটি বাল্য বিবাহের পর্যায়ে পড়বে। আর এর জন্য রয়েছে শাস্তির বিধান। শাস্তি প্রথমত ১৯২৯ সালের আইনে ছিলো ১ মাসের সাজা ও ১ হাজার টাকা জরিমানা, এরপর ১৯৮৪ সালে সংশোধিত আইনে করা হয় ৩ মাসের সাজা ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালের বর্তমান সংসদের চলমান অধিবেশনে ক’দিন আগে জরিমানা ও সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে বিল পাস হয়। তা হচ্ছে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও সর্বোচ্চ ২ বছরের জেল। বাল্য বিবাহ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা এ সাজা ভোগ করবে।
বাল্য বিবাহ রোধ করার জন্য আইনের কঠোরতার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রমও হচ্ছে। কিন্তু শতভাগ সফলতা পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও পূর্বের তুলনায় এখন অনেক উন্নতি হয়েছে অর্থাৎ বাল্য বিবাহ অনেকটা কমেছে। তারপরও বিভিন্ন সময় যে বাল্য বিবাহ হচ্ছে এর জন্য ঢালাওভাবে কাজীদেরকে (মুসলিম ম্যারিজ রেজিস্ট্রার) দোষারোপ করা হলেও বাস্তবে পাওয়া যাচ্ছে এর ভিন্ন চিত্র ও তথ্য। দীর্ঘ অনুসন্ধানে ওইসব চিত্র ও তথ্য বের হয়ে এসেছে।
বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সরকার আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সারাদেশে ওয়ার্ড ভিত্তিক বা ইউনিয়ন ভিত্তিক রেজিস্ট্রার নিয়োগ দিয়ে থাকে। যাদেরকে বলা হয় মুসলিম ম্যারিজ ও তালাক রেজিস্ট্রার, সংক্ষেপে বলা হয় কাজী। এ বিবাহ এবং তালাকের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নিয়ম পালনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের আইনগতভাবে একমাত্র বৈধ স্বীকৃতি হচ্ছে কাজীর কাছে রেজিস্ট্রি করা। অর্থাৎ কোনো ছেলে-মেয়ের (অবশ্যই প্রাপ্ত বয়স্ক) বিবাহ বা তালাকের ক্ষেত্রে একমাত্র বৈধ ডকুমেন্ট হচ্ছে কাজীর কাছে রেজিস্ট্রি করা। কাজী সাহেবরা রাষ্ট্রের দেয়া এ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। বাল্য বিবাহের বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহর-গ্রাম সব জায়গায়ই এখনো কম-বেশি বাল্য বিবাহ হচ্ছে। তবে আগের তুলনায় এখন অনেকটা কমে এসেছে। এ ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান কার্যকর ভূমিকা রাখছে। প্রায়ই দেখা যায় যে, ইউএনওর হস্তক্ষেপে বাল্য বিবাহ বন্ধ, বর-কনের অভিভাবককে জেল জরিমানা দেয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি বাল্য বিবাহ নিবন্ধনে কাজীদের অপারগতায় এখন আস্তে আস্তে বাল্য বিবাহ কমে আসছে। তারপরও যে সব বাল্য বিবাহ হচ্ছে সেগুলোর ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, এসবের সাথে কাজীদের সংশ্লিষ্টতা খুব কমই থাকে। কারণ, বর্তমানে কাজীরা খুবই সতর্ক এবং সচেতন । জেল, জরিমানা, সম্মানহানি এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজীর লাইসেন্স বাতিল হবার আশঙ্কায় কাজীরা এখন বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক। আইন মন্ত্রণালয় থেকে কাজীর নিয়োগ পেতে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়। এ জন্য এর সম্মান রক্ষা করতে কাজীরা সর্বদা সচেষ্ট থাকেন। আবার দু একজন অতিলোভী কাজীর যে বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে ভূমিকা থাকে না তেমনটি বলা যাবে না। তবে এর সংখ্যা খুবই নগণ্য।
শহর-গ্রাম-গঞ্জে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, এখন অধিকাংশ বাল্য বিবাহ সম্পন্ন হয়ে থাকে স্থানীয় মৌলভী এবং নোটারী পাবলিকের কার্যালয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে। দেখা গেছে যে, কোনো বিবাহের ক্ষেত্রে কাজীগণ বর-কনের বয়স নির্ধারণের জন্য জন্ম নিবন্ধন খোঁজ করেন। কারণ, আইন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ গেজেট হচ্ছে: বিবাহের ক্ষেত্রে বর-কনের বয়স নির্ধারণে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধনকে ফলো করবে। এর অনুপস্থিতিতে পরে অন্য কিছু অপশন দেয়া আছে। কাজীগণ যখন দেখেন জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী বর বা কনের বয়স এখনো প্রাপ্ত বয়স্ক পর্যায়ে পৌঁছেনি, তখন তারা এ বিবাহ রেজিস্ট্রি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আর তখনই বর বা কনে পক্ষের লোকজন অন্য পথে যান।
দেখা গেছে যে, কাজীকে দিয়ে এ বাল্য বিবাহের কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে কাজী বাদ দিয়ে তারা স্থানীয় একজন হুজুর ডেকে এনে ধর্মীয়ভাবে এ বিবাহের কাজ সম্পন্ন করেন। এ ক্ষেত্রে এ সামাজিক বন্ধনের ধর্মীয় স্বীকৃতি মিললেও আইনি স্বীকৃতি মিললো না। অর্থাৎ এ দম্পতির কোনো লিখিত প্রমাণ নেই। আবার অনেক সময় দেখা গেছে যে, বাল্য বিবাহ রেজিস্ট্রি করতে কাজীর অপারগতায় কাজীকে বাদ দিয়ে নোটারী পাবলিকের কার্যালয়ে এসে এফিডেভিটের মাধ্যমে বাল্য বিবাহ সম্পন্ন করে থাকে। অথচ বিবাহ বা তালাকের ক্ষেত্রে একমাত্র আইনি স্বীকৃতি হচ্ছে কাজীর কাছে রেজিস্ট্রি করা। কাজীর অপারগতায় স্থানীয় মৌলভী দিয়ে যে বাল্য বিবাহ সম্পন্ন করা হয়ে থাকে তার প্রমাণ কিছু দিন আগে কচুয়ার একটি ঘটনা। সেখানে দেখা গেছে যে, কনে অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় কাজী এ বিবাহ রেজিস্ট্রি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কনের বাড়িতে লোক পাঠিয়ে এ বাল্য বিবাহ বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশ উপেক্ষা করে কনের অভিভাবক স্থানীয় একজন ইমামকে ডেকে এনে এ বিবাহের কাজ সম্পন্ন করেন। এটি জানতে পেরে কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওই ইমাম ও কনের পক্ষের লোকজনকে তাঁর কার্যালয়ে হাজির করে তাদেরকে জরিমানা করেন এবং ইমামের কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকারনামা নেন আর কখনো বাল্য বিবাহ পড়াবেন না মর্মে। আবার দেখা গেছে যে, কোনো কোনো এলাকায় প্রভাবশালীরা হুজুর এবং কাজীদেরকে চাপ প্রয়োগ করে বাধ্য করেন বাল্য বিবাহ সম্পন্ন করতে। এমনকি দেখা গেছে যে, কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। এসব বাস্তব চিত্র ফুটে উঠলো দীর্ঘ অনুসন্ধানে। দেখা গেছে যে, বর ও কনের অভিভাবকরা কাবিননামার বিকল্প হিসেবে এফিডেভিট করে থাকেন। অথচ এ এফিডেভিট দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর আইনগত কোনো অধিকার সংরক্ষিত হয় না। যেমন এ এফিডেভিট দ্বারা যৌতুক মামলা, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা, খোরপোষসহ ইত্যাদি স্ত্রীর অধিকার রক্ষায় কোনো মামলাই পরিচালিত হয় না। এ ক্ষেত্রে কাবিননামাই একমাত্র দালিলিক প্রমাণ। জমি-জমা রেজিস্ট্রি করার একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেমনি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস তেমনি বিবাহ বা তালাক রেজিস্ট্রি করার ক্ষেত্রে একমাত্র অধিকার সংরক্ষণ করে কাজী তথা ম্যারিজ রেজিস্ট্রাররা।
বাল্য বিবাহ রোধ সংক্রান্ত বিষয়ে কথা হয় চাঁদপুর জেলা কাজী সমিতির সভাপতি মাওঃ কাজী মোঃ ফজলুর কবির পাটওয়ারী ও সাধারণ সম্পাদক মাওঃ কাজী ছাদেক মোঃ ফারুকের সাথে। তারা বলেন, আমরা কাজী সমাজ বাল্য বিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধে বদ্ধপরিকর। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত বিধান অনুযায়ী আমরা আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সর্বদা সচেষ্ট। বাল্য বিবাহ এবং যৌতুক প্রতিরোধে আমরা প্রশাসনিক এবং সামাজিক যে কোনো উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। আমাদের সহযোগিতা অতীতেও ছিলো, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আমাদের চাঁদপুর জেলার কাজীরা বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে এখন খুবই সচেতন এবং সতর্ক। তারপরও মাঝে মধ্যে দু চারটি বাল্য বিবাহ কীভাবে হয়ে যাচ্ছে সে ফাঁক খুঁজে বের করে প্রশাসনকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করবো। সর্ব শেষ কথা হচ্ছে, বাল্য বিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে হবে এবং সকলকে সচেতন হতে হবে। তাহলেই এর দ্বারা সৃষ্ট সামাজিক অনাচার দূর হবে।
