মহামারী আকারে কোচিং বাণিজ্য
বাসায় বাসায় মিনি স্কুল
এমজি মোস্তফা নামে এক অভিভাবক বলেন, প্রতি মাসে উচ্চহারে স্কুলের বেতন পরিশোধ করলেও শিক্ষকরা ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে পড়ান না। তারা শিক্ষার্থীদের নিজেদের কোচিং বা বাসায় পড়তে বাধ্য করছেন। শিক্ষার্থীদের পড়ার বিষয় বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের সুযোগ বেড়েছে। ধর্ম, আরবি, চারুকলার মতো বিষয়েও প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে। মূলত প্রতিটি বিষয়ে সৃজনশীল করায় সমস্যা বেশি হচ্ছে। ক্লাসে ছেলেমেয়েদের ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলে আর সমস্যা হতো না। পরিবারের খরচ কমিয়ে বাধ্য হয়ে শিক্ষকদের কোচিং ফি জোগান দেয়ার কথা জানালেন একাধিক মা।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ যুগান্তরকে বলেন, ‘কোচিংয়ের ব্যাপারে আমরা নীতিমালা করেছি। প্রত্যেক শিক্ষককে এটা মানতেই হবে। কে বা কারা মানে না, তাদের ব্যাপারে আমরা খোঁজ নেব। যারা মানে না, তাদের এ পেশায় থাকার দরকার নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোচিং বন্ধে অভিভাবক সচেতনতা ও সামাজিক জাগরণ প্রয়োজন। আমি অভিভাবকদের এ ব্যাপারে সহযোগিতা চাই।’
রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে গত ২৫ অক্টোবর টেস্ট পরীক্ষা চলাকালে ওয়ারেসুল ইসলাম হিমেল নামে এক ছাত্রকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেন রসায়নের শিক্ষক মুহাম্মদ ফখরুদ্দীন। আহত হিমেল এবং তার মা জেসমিন নাহারের অভিযোগ, ওই শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়ার কারণে তাকে অমানবিকভাবে পেটানো হয়। এখন পর্যন্ত দুটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে হিমেল বর্তমানে বাসায় অবস্থান করছে। এ ব্যাপারে মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (২০৭৯) হয়েছে। প্রাইভেট না পড়ার জন্য হিমেলকে পেটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেন শিক্ষক মুহাম্মদ ফখরুদ্দীন। তিনি বলেন, ‘ওই ছেলে নকল করছিল। আমি তার বেটার ফিউচারের জন্য লঘু শাস্তি দিয়েছি। হাত ভেঙে যাওয়ার মতো শাস্তি দেয়া হয়নি।’
অভিযোগ পাওয়া গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফখরুদ্দীনের মতো এমন অসংখ্য শিক্ষক আছেন। হিমেলের মতো মাসের পর মাস শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও বেশুমার। সম্প্রতি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলের ৯ নম্বর ব্রাঞ্চের শিক্ষক ইভা (পুরো নাম জানা যায়নি) নাফিস নামে এক ছাত্রকে পিটিয়ে ডান হাত ভেঙে দিয়েছেন। আগামী ২১ নভেম্বর নাসিরের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। তার মা বলছেন, ব্যান্ডেজ করা হাতে নাফিসের পরীক্ষা দেয়া সম্ভব নয়। তারা এমন কাউকে খুঁজছেন যে পরীক্ষার হলে প্রশ্নের উত্তর লিখে দেবে। তিনি বলেন, ঘটনার পর স্কুলের ৯ নম্বর ব্রাঞ্চের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাডামকে জানালে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তার ছেলে ওই স্কুলে পড়ে। এ কারণে তিনি এ বিষয়ে আর বেশি কিছু বলতে চান না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো ছাত্রকে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ আমরা পাইনি। বিষয়টি আমরা খোঁজ নেব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারি নিয়ম-নীতি মেনে চলতে চাই। কেউ প্রাইভেট না পড়লে তাকে পেটাবে বা কোচিংয়ে বাধ্য করবে এমন ঘটনা আমরা বরদাশত করি না।’
গত এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর মতিঝিল, সিদ্ধেশ্বরী, কাকরাইল, মনিপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক শ্রেণীর শিক্ষক নানাভাবে তাদের কাছে কোচিং বা প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করছেন শিক্ষার্থীদের। এ লক্ষ্যে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সেখানে বসবাসের পাশাপাশি ব্যাচের পর ব্যাচ শিক্ষার্থী পড়াচ্ছেন। আইন ফাঁকি দিয়ে ব্যাচ পড়ানোর জন্য কেউ পুরো ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছেন। ছাদের ওপরে কক্ষ বানিয়ে এসি বসিয়েছেন। এসব ফ্ল্যাটে একসঙ্গে ৫০-৬০ জন ছাত্রছাত্রী পড়ানো হচ্ছে। ওই দৃশ্য দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এটা কোনো স্কুলের সাধারণ ক্লাসরুম না কোচিং সেন্টার। সেখানে ক্লাসরুমের মতোই আছে হোয়াইট বোর্ড, মাইক্রোফোনসহ আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। এভাবে কোনো কোনো শিক্ষক একাই মাসে বিভিন্ন ব্যাচে ৪০০ থেকে ৬০০ ছাত্রছাত্রী পড়াচ্ছেন। কেউ সপ্তাহে ২০ থেকে ২৫টি ব্যাচ পড়ান। কোনো কোনো শিক্ষক বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর চাপ সামলাতে একাধিক ‘সহকারী’ নিয়োগ করেছেন। এমন এক সহকারীর নাম ওবায়দুল। অভিভাবক পরিচয়ে তার কাছে গেলে তিনি ১ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘স্যার সকাল পৌনে ১০টা পর্যন্ত থাকেন। আর বিকালে থাকেন। এ দুই সময় এলে পাবেন।’ এছাড়া অন্য সময় স্যারকে পাওয়া যাবে না।
সরেজমিন অনুসন্ধানকালে অভিভাবকরা জানিয়েছেন, ব্যাচভিত্তিক পড়ানো, মডেল টেস্টসহ নানা নামে চলছে কোচিং বাণিজ্য। এর বিনিময়ে শিক্ষার্থীপ্রতি ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা করে নেয়া হয়। এত টাকা নেয়ার পরও সপ্তাহে প্রতি ব্যাচ মাত্র তিন দিন পড়ান শিক্ষকরা। এভাবে কোচিং বাণিজ্য করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক কোটিপতি বনে গেছেন বলে জানা গেছে।
২০১২ সালের ২০ জুন ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সে অনুসারে কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। প্রতিষ্ঠান প্রধানের লিখিত অনুমতিসাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন। এই নীতিমালা লংঘন করলে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত করা হবে। কিন্তু বর্তমানে নীতিমালা সরকারি কাগজেই সীমাবদ্ধ, এর তেমন কোনো প্রয়োগ নেই।
রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকদের কোচিংপাড়া হিসেবে খ্যাত বেনজির বাগান, শহীদবাগ, শাহজাহানপুর, সিদ্ধেশ্বরী এলাকা। এসব এলাকায় অন্তত শতাধিক বাড়িতে গড়ে উঠেছে কোচিং সেন্টার। বাসাবো, মুগদাপাড়া, বনশ্রী এলাকাতেও চলছে কোচিং বাণিজ্য। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ব্যাচ ধরে ঝাঁকে ঝাঁকে শিক্ষার্থী পড়ানো হয়। শিক্ষার্থীদের হইচইয়ে বাসাবাড়িতে টেকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উত্তর শাহজাহানপুর এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, ৬১০ নম্বর বাড়িতে পুণম ফার্নিচারের দোতলায় ৭/৮ জন শিক্ষক কোচিং পসরা নিয়ে বসেছেন। ভেতরে গিয়ে মনে হল এটা ভাড়া বাড়িতে গড়ে ওঠা কোনো স্কুল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষক আবদুল জলিল একটি কক্ষে টেবিল নিয়ে বসে আছেন। কয়েকশ’ শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সেখানে গিজ গিজ করছে। আবদুল জলিল প্রথমে বলেন তিনি নবম-দশম শ্রেণীর কমার্সের শিক্ষক। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে ইংরেজি ভার্সনে কমার্স নেই। ফলে তার কাছে আইডিয়ালের কমার্সে শিক্ষার্থী নেই। তিনি কোনো কোচিং করান না। পরে তার টেবিলে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণীর বাংলা বিষয়ের মডেল টেস্টের প্রশ্ন এবং চতুর্থ শ্রেণীর ইংরেজি ভার্সনের গণিতের স্পেশাল মডেল টেস্টের পরীক্ষার সময়সূচি। ‘বার্ষিক পরীক্ষা-২০১৬’ লেখা এই সময়সূচিতে ৬ নভেম্বর থেকে ১৫ নভেম্বর কবে কোন বিষয়ে মডেল টেস্ট নেয়া হবে সে তথ্য। এ বাবদ প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দেড় হাজার টাকা করে দিতে হবে। তবে যারা তার কোচিংয়ের ছাত্র তাদের ৫০০ টাকা দিলেই চলবে। এ প্রসঙ্গে শিক্ষক জলিল বলেন, সরকার বেতন বাড়িয়ে দিক কোচিং করাব না। এভাবে কোচিং করানো সম্মানজনকও নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মিনি স্কুলে তিনি একা আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষক নন আরও সাত-আটজন আছেন। এছাড়া মতিঝিল মডেল স্কুল ও কলেজের শিক্ষকসহ আরও কয়েকজন পড়ান।
উত্তর শাহজাহানপুর ৪৯১/সি নম্বর বাড়িতে মিনি স্কুল খুলে বসেছেন মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জহিরুল ইসলাম। ছোট্ট কক্ষে ৮-১০টি লো-হাই বেঞ্চ পাতা আছে। সেখানে ২০-২৫ জন ছাত্রকে দেখা যায়। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘অভিভাবকদের পীড়াপীড়িতে আমি অল্প ক’জনকে পড়াই।’ পাশের বাড়িতেই মিনি স্কুল খুলে বসেছেন আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের চারুকলার শিক্ষক রঞ্জন বাড়ৈ। ১ নভেম্বর সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দিবা শাখার শিক্ষক হলেও ১ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে পাশাপাশি দুই রুমে ৫০-৫৫ জন শিক্ষার্থীকে ছবি আঁকা শেখাচ্ছেন। ঘুরে ঘুরে তা দেখছেন আর মাঝেমধ্যে ত্রুটি ধরিয়ে সেরে দিচ্ছেন। কক্ষের সামনে কমলা রঙের মার্বেল পেপারে ঝোলানো নোটিশে দেখা যায়, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর কোচিংয়ের জন্য ফি নেয়া হয় আড়াই হাজার টাকা করে। ১০ নভেম্বরের মধ্যে তা জমা দিতে বলা হয়। জানতে চাইলে এই শিক্ষক এ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘আজকে জেএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ক্লাস বন্ধ। তাই ওদের একটু সাহায্য করছি।’ এই কক্ষের বাইরেই ৮-১০ জন মাকে দেখা যায় অপেক্ষা করছেন। এ সময় আলাপকালে তারা বলেন, স্কুলে প্রায় প্রতি ক্লাসে ৮০-৯০ জন বাচ্চা থাকে। সবাইকে স্যার মনোযোগ দিতে পারেন না। কিন্তু ড্রইং বিষয়টি আবশ্যিক। তাই বাধ্য হয়েই কোচিংয়ের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। পাশের কক্ষেই কোচিং করান একই স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক আতাউর রহমান। কক্ষের উপরে শোভা পাচ্ছিল এ ফোর কাগজে এই শিক্ষকের নাম ও মোবাইল নম্বর। পরিদর্শনকালে কক্ষটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ প্রসঙ্গে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, কোচিং বর্তমানে জাতীয় মহামারীর আকার ধারণ করেছে। কেবল আইডিয়াল স্কুলই নয়, ভিকারুননিসা, মণিপুরসহ রাজধানীর অন্যান্য স্কুলের আশপাশে গিয়েও আপনি এমন চিত্র দেখতে পাবেন। এমনকি মফস্বল-গ্রামেও এর বিস্তার আছে। আমি গ্রামে গিয়ে দেখেছি, স্কুলের ক্লাসরুমের মতো শিক্ষকরা হোয়াইট বোর্ড সেট করে পড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, অভিভাবকরা প্রতিযোগিতা দিয়ে ৩-৪ জনের কাছেও কোচিং করাচ্ছেন। শুধু সরকার চাইলেই এটা বন্ধ করা সম্ভব।
শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য সম্পর্কে অভিভাবকরা নাম প্রকাশ করে মুখ খুলতে চান না। আইডিয়াল স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর এক ছাত্রী ও কেন্দ্রীয় অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, আইডিয়ালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই কোচিংকে প্রশ্রয় দেয়া হয়। এর প্রমাণ হচ্ছে, এপ্রিলে কোচিং করানোর জন্য স্কুলে কক্ষ ভাড়া দেয়া হয়। আগস্ট পর্যন্ত তা বহাল ছিল। পরে অভিভাবকসহ বিভিন্ন মহলের চাপে কক্ষ বরাদ্দ বাতিল করা হয়। বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্কুলের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম।
২ নভেম্বর মনিপুর এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের আশপাশে শতাধিক কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। স্থানীয় এবং অভিভাবকদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটির মালিক স্কুলের শিক্ষক। কিছু স্কুলের বর্তমান বা সাবেক পরিচালনা কমিটির সদস্যদের মালিকানাধীন। এর বাইরে কোচিংবাজ শিক্ষকরা বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে প্রাইভেট-কোচিং সেন্টার গড়ে তুলেছেন। স্কুলের কাছেই গ্রিনভিউ হাইস্কুলের গলি স্থানীয়দের কাছে মাস্টারপাড়া হিসেবে পরিচিত। ওই গলির ৭৬৪/১ নম্বর বাড়িতে মনিপুর স্কুলের দুই শিক্ষক বাস করেন। এ বাড়ির কেয়ারটেকার বাবলু জানান, ‘স্যারেরা আগে বাড়িতেই ব্যাচে ছাত্রছাত্রী পড়াতেন। কয়েক মাস ধরে বাসা ভাড়া নিয়ে তারা বাইরে পড়ান।’ তিনি আরও জানান, ওই গলিতে অনেক শিক্ষকের বসবাস। বেলা ১১টা এবং বিকাল ৪টার পর ছাত্রছাত্রীদের ঢল নামে। তার কথার সূত্র ধরে ৭৬৩/৮ নম্বর বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, কম্পিউটার শিক্ষক সোলেমান ফারসি এবং ৭৬৩/৫ ও ৭৬৩/৬ নম্বর বাড়িতে ৬ জন শিক্ষক পড়ান। এর মধ্যে ৭৬৩/৫ ও ৭৬৩/৬ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় গিয়ে দুই নারী ও দুই শিশুর কাছে জানা যায়, শিক্ষকরা বাসা ভাড়া নিয়েছেন শুধু কোচিংয়ের জন্য, বসবাস করেন অন্যত্র। তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে ৭৬৩/৮ নম্বর বাড়িতে সোলেমান ফারসির ছেলে তালহা জানান, তার বাবা গণিত বিষয়ে কোচিং দেন। বাবা সকালে বের হন আর রাতে ফেরেন। এ কারণে তার সঙ্গে বাবার সাক্ষাৎ হয় না।
মনিপুর স্কুলের মূল (বালিকা) শাখার গেটের উল্টো দিকের বাড়ির সিঁড়িতে বসে অপেক্ষা করছিলেন কোহিনুর বেগম নামে এক মা। তিনি বলেন, তার কন্যা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। তার আরেক বাচ্চা এ স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছে। এ এলাকার বেশিরভাগ কোচিং সেন্টার কোনো না কোনো শিক্ষকের। এর মধ্যে এক স্যারেরই দুটি। একটি হচ্ছে আধুনিক, আরেকটি ইনটেনসিভ। সামনে স্যার নেই। কিন্তু নেপথ্যে তিনিই। এর প্রমাণ হচ্ছে, কোচিং থেকে যত লেকচার শিট, সাজেশন দেয়া হয়, সবগুলোতেই শিক্ষকের নাম থাকে। ফয়সাল নামে আরেকজন অভিভাবক জানান, স্কুলে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত কোচিংয়ের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা কম। এ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই বাইরের কোচিংয়ে পড়ে। কিন্তু অষ্টম ও দশম শ্রেণীতে স্কুলে কোচিং আর নবম-দশম শ্রেণীতে স্কুলের কোচিংবাজ শিক্ষকের কাছে ব্যাচে পড়তে হয়। নইলে বিভিন্ন পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেয়াসহ নানাভাবে হেনস্তা করা হয়। স্কুলের ঠিক সামনেই গ্রিন কোচিং সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক মনিপুর স্কুলের পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য।
এ প্রসঙ্গে মনিপুর স্কুল ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা কোচিং অ্যালাও করি না। আপনারা নাম দেন। এমন প্রমাণ পেলে নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের বিজ্ঞানের শিক্ষক ইভা মিসসহ কয়েকজন এক বিষয়ে দুই হাজার করে টাকা নেন। কোচিং না করলে নম্বর কম দেয়াসহ দুর্ব্যবহার, কান টানা, ঘাড় মটকানো, বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখার মতো শাস্তি দেন শিক্ষার্থীদের। নির্যাতনে আহত নাফিসের মা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে মারধরের বিষয়টি জারিন ম্যাডামকে জানিয়েছি। তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন তাই এটা নিয়ে বেশি দূর যেতে চাই না।’ এ স্কুলের শিক্ষার্থীর অভিভাবক শরাফত হোসেন বলেন, কয়েকজন শিক্ষিকা আছেন যারা কোচিং বাণিজ্য করেন। তাদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তিনি তার মেয়েকে বছরের মাঝখানে আরেকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এভাবে ভিকারুননিসা স্কুলের ইংলিশ ভার্সনের সিনিয়র ও জুনিয়র সেকশনের দুই শিক্ষিকা বিজ্ঞানের এক শিক্ষক, বাংলার শিক্ষিকা, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল ও কলেজের পেছনে নন্দনের গলিতে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে কোচিং করাচ্ছেন। একই এলাকায় আরেকজন বাড়ির ছাদে রুম করে সেখানে এসি বসিয়ে কোচিং সেন্টার খুলেছেন বলে স্থানীয়রা জানান। তবে একই শিক্ষকের সঠিক নাম জানা যায়নি। রাজমনি সিনেমা হলের গলিতে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষকদের আখড়া। কয়েকজন শিক্ষক ওই এলাকায় কোচিং করান। উইলস লিটল স্কুলের উল্টো পাশের গাড়ির শোরুমের গলিতে ইংরেজির শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজনের কোচিং বাসা আছে বলে জানা গেছে।
রাজউক উত্তরা স্কুল ও কলেজের বাংলার একজনসহ অন্তত এক ডজন শিক্ষক কোচিং করান। ক্রিয়েটিভ নামে একটি কোচিং সেন্টার খুলে বসেছেন রাজউক উত্তরা হাইস্কুল এবং নবাব হাবিবুল্লাহ স্কুলের কয়েক শিক্ষক। জানা গেছে, এভাবে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্কুল ও কলেজের অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ আছে।
সূত্র- যুগান্তর ৩/১১/১৬
