
লকডাউন শুধু নতুনবাজারে পুরাণবাজারে নয়-পুরাণবাজারের পরিস্থিতি দেখে
এমনটাই মনে হয়েছে বিগত কয়েকদিন যাবত। বছরের অন্যান্য দিনের মত
স্বাভাবিকভাবেই খোলা রাখা হয়েছে লোহা লক্কর, কাপড়, জুতা, স্টেশনারী, ফোন
ফ্যাক্স, সুতা, জালসহ নানা পাইকারী ও খুচরা দোকান। সাথে আছে চাল, ডাল, তেল,
চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, মসলাসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য
সামগ্রীর দোকানও। অবশ্য কিছু দোকান বন্ধ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে
তা খুবই নগণ্য। পুরাণবাজারের অন্যান্য পট্টির দোকানগুলো কম-বেশি খোলা
থাকলেও এসব দোকানে যতটা না গ্রাহক দেখা গেছে তার চেয়ে বেশি গ্রাহক দেখা
গেছে তামাক পট্টি, ডাল পট্টি, চাল পট্টি, বাতাসা পট্টিতে। রিকশা, ভ্যান,
মটর চালিত অটো বাইক, ঠেলা গাড়ী, পিক আপ ভ্যানসহ বিভিন্ন উপায়ে নিত্য
প্রয়োজনীয় মালামালের সাথে অন্যান্য মালামালও লোড আনলোড হচ্ছে
স্বাভাবিকভাবে। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই একজন আরেকজনের সাথে খুবই
ঘনিষ্টতা রক্ষা করে মাল কেনা-বেচাসহ চলাচল করছে খুবই স্বাভাবিকভাবে। দেখে
মনে হয়েছে যেন ঈদের বাজার করতে সকলেই মরিয়া হয়ে উঠছে, কার আগে কে নিবে, কার
আগে কার মাল লোড-আনলোড হবে। এমনি পরিস্থিতিতে মনে হয়েছে পুরাণবাজারের
ব্যবসায়িক এলাকা চলমান করোনা ভাইরাইসের ভয়াবয়তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এক
বাজার। আর করোনা মুক্ত বাজার বলেই সকাল থেকে রামগঞ্জ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর,
সোনাপুর, হাজীগঞ্জ, কচুয়া, চাঁদপুর জেলাসহ আশেপাশের জেলাসমূহের পাইকারী,
খুচরা দোকানদারগণও ভীড় জমাচ্ছেন পুরাণবাজারের পাইকারী মোকামে। যে বাজারে
মানা হচ্ছে না লকডাউনের কোনো নিয়ম-নীতি। যা মানা হচ্ছে তা হলো ব্যবসায়িক
নীতি। ব্যবসায়ী কিছু নেতাদের ভাবখানা এমন, মালামাল আনা-নেওয়ার সুযোগ করে
দিতে হবে, চাঁদপুরসহ সকল মোকামের পাইকার বা ক্রেতা সাধারণের চলাচল
স্বাভাবিক রাখতে হবে, কোনো বাধা-ধরা নিয়ম করা যাবে না, অধিক মুনাফা নিয়ে
কথা বলা যাবে না। যদি তা হয় তাহলে ব্যবসায়ীগণ মালামাল আনার ক্ষেত্রে
নিরুৎসাহী হতে পারে, ফলে মাল আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে বাজারে ক্রাইসিস দেখা
দিতে পারে। পণ্য সামগ্রীর দাম বেড়ে যেতে পারে। অথচ কোনো ব্যবসায়ী নেতাই
প্রয়োজনের বাইরে বা লকডাউনের আওতাধীন দোকানপাট বন্ধ রাখাসহ সামাজিক দূরত্ব
বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি।
করোনা ভাইরাস মোকাবেলাসহ বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে
প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিগণ কয়েক দফা চেম্বার নেতৃবৃন্দের সাথে সামাজিক
দূরত্ব বজায় রেখে চাঁদপুর চেম্বারে সভা করলেও চেম্বারের কোনো নেতাই করোনা
পরিস্থিতিতে পুরাণবাজারে অপ্রোয়জনীয় দোকানপাট খোলা রাখার বিষয়টি প্রশাসনিক
নেতৃবৃন্দকে অবহিত করেননি। যদি করা হতো, তাহলে পুরাণবাজারে করোনা
সংক্রান্ত সচেতনতা আরো বেশি করে বৃদ্ধি পেত, লকডাউনের কারণে অপ্রয়োজনীয়
দোকানপাট বন্ধ থাকতো, পাইকারী ব্যবসাকেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি কম হতো,
এখানে বসবাসরত মানুষজন নিজেদেরকে অনেকটা নিরাপদ ভাববার সুযোগ পেত। আর নিত্য
প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবসায়ীগণ তাদের আসা যাওয়া থেকে শুরু করে ব্যবসা
পরিচালনার ক্ষেত্রেও অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। পুরাণবাজারের ব্যবসায়িক
প্রাণকেন্দ্রে ঢালাওভাবে সকল ধরনের দোকানপাট খোলা রাখায় প্রতিদিনই চাঁদপুর
জেলাসহ জেলার আশেপাশের অন্যান্য জেলার বাবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের ব্যাপক
আগমনে পুরাণবাজারের অংশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে আশঙ্কায়
অনেকেই আতঙ্কিত অবস্থার মধ্যে রয়েছেন বলে জানা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চেম্বার পরিচালকসহ কয়েকজন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের
পাইকারী ব্যবসায়ী জানান, যদি বাজারের নিরাপত্তার বিষয়টি কঠিনভাবে না দেখা
হয়, তাহলে আমাদের বাজারে আসাটাও বন্ধ করে দিতে হবে। ঢালাওভাবে যদি সকল
দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হয় এবং লকডাউনের নিয়ম মানা না হয়,
তাহলে সকলের জীবনই হুমকির সম্মুুখীন হয়ে পড়বে। তারা এ ব্যাপারে প্রশাসনসহ
চেম্বার নেতৃবৃন্দের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
পুরাণবাজারে ঢালাওভাবে দোকানপাট খোলা রাখার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় দোকান
মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব মোস্তাক হায়দার চৌধুরীর নিকট। তিনি করোনা
ভাইরাসের ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, এ মুহূর্তে আমাদের সকলের উচিত
লকডাউনের নিয়ম মেনে চলা। প্রয়োজনের বাহিরে ঘর থেকে বের না হওয়া। তারপরও
আমরা অনেকেই এ নিয়মটি না মেনে একাধারে যেমন অন্যায় করছি, তেমনি নিজের
অজান্তেই নিজের জীবন বিপন্ন করে তুলছি। তিনি বাজারের নিরাপত্তার স্বার্থে
নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ব্যতীত সকল দোকানপাট বন্ধ রাখার উপর গুরুত্ব আরোপ করে
বলেন, এ ব্যাপারে চাঁদপুর চেম্বারের উচিত সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। যদি তা
না করা হয় তাহলে আমাদের সকলেরই ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এ মোকামে বিভিন্ন
মোকাম হতে লোকজন আসে। এদের মধ্যে কে করোনা ভাইরাস বহন করছে তা বলা একান্তই
মুশকিল। শুধু যে বাতাসা পট্টি বা চাল পট্টিতেই মানুষের ব্যাপক চলাচল, তা-ই
না। সকাল বেলায় মাছবাজারসহ তরিতরকারি দোকানেও চোখে পড়ে একই চিত্র। যেখানে
উপেক্ষিত হয় সামাজিক দূরত্ব। গায়ের সাথে গা লাগিয়ে কেনাকাটা করছে অসচেতন
মানুষ। তবে এ পরিস্থিতি শুধু পুরাণবাজারেই দেখা যায়, এ ক্ষেত্রে নতুনবাজার
এলাকা অনেকটাই নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। রয়েছে অপ্রোয়জনীয় দোকানপাট বন্ধ, আর
লোকচলাচলেও মানা হচ্ছে কঠোর বিধি নিষেধ। অবশ্য তা হচ্ছে আইন শৃঙ্খলা
বাহিনীর কঠোর ভূমিকায়। যা পুরাণবাজারে তেমন একটা চোখে পড়ে না। যার ফলস্বরূপ
সুবিধাবাদীগণ লকডাউন না মানার সাহস দেখিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। তবে গত ২/১
দিনে পুরাণবাজারের চিত্র কিছুটা পালটিয়েছে বলে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান। তারা
বলেন, গত দু’দিন সেনা সদস্যদের হঠাৎ হঠাৎ ঝটিকা অভিযানে ব্যবসায়ীদের মাঝে
চোর-পুলিশ খেলা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। সেনা সদস্যদের আগমনের কথা শুনলেই
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ব্যতীত বাকি দোকানপাট বন্ধের হিড়িক পড়ে যায়। আবার সেনা
সদস্যগণ চলে গেলে তারা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। লকডাউন কার্যকর
করার ক্ষেত্রে প্রশাসন যদি কঠোর না হয় তাহলে অকার্যকর হয়ে পড়বে লকডাউন
কার্যক্রম। ফলে পুরাণবাজার হতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদের শিরোনাম।
