মনিরুজ্জামান বাবলু
‘গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে বাগানে নিয়ে যেতো। সেখানে একজন একজন করে মাটি খুঁড়ে ঘাঁড় বরাবর মাটি চাপা দিয়ে স্বজনদের কাছে মুক্তিপণের জন্য ফোনে কথা বলতে দিতো। ২০১১ সালের ২৬ জুন এক ইন্ডিয়ান ক্রুকে হত্যা করে আমাদের মাধ্যমে তাকে ফ্রিজে ঢুকানো হয়। এরপরই আমাদের এক এক করে জাহাজ মালিকের সাথে ফোনে যোগাযোগ করায় দস্যুরা।’Ñ এভাবেই সেমালিয়া জলদস্যুদের হাতে নির্মম ও দুবির্ষহ জীবনের বর্ণনা তুলে ধরেছেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দশানী সরকার বাড়ির ওয়ালী উল্লাহর ছেলে লিমন সরকার।
ত্রিশ বছর বয়সী লিমন জীবিকার সন্ধানে ইরানী মালিকানাধীন এবং মালয়েশিয়া থেকে পরিচালিত জাহাজ কোম্পানী মাজেস্টিক এন্ড রিস শিপিং লাইনস্ কোম্পানীতে যোগদান করেন। কোম্পানীর মূল কাজ হলো বর্হিঃসমুদ্রে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কন্টেইনার পরিবহন। এই কোম্পানীতে কাজ করতে গিয়ে ভাগ্য বিড়ম্বিত লিমন সোমালিয়ার জলদস্যুদের খপ্পরে আটক হয়। কেটে গেল বিভীষিকাময় জীবনের সাড়ে তিন বছর সময়।
জন্মদাতা আর জন্মধারীণীর বুকে ফিরে আসা যখন নিঃস্ফলা হয়ে উঠেছে, তখন বাংলাদেশ সরকার মহোতি উদ্যোগ নিয়েছেন। এর জন্যে লিমন সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। একপর্যায়ে লিমন বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার আমাকে বাঁচিয়ে দেশে আনাতে আমি কৃতজ্ঞ। পররাষ্ট্র সচিব আমাদেরকে কথা দিয়েছেন একটা চাকুরির ব্যবস্থা করে দেবেন।’
চার বছর পর রবিবার! অর্থাৎ চার বছর পর লিমন গত রবিবার দুপুরে মা-বাবার বুকে ফিরে এসেছে। ঢাকা থেকে বাড়িতে পৌঁছলে সৃষ্টি হয় আনন্দঘনময় এক পরিবেশ। না ফেরার লিমনকে দেখতে বাড়িতে হাজির আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ এলাকাবাসী।
লিমনের বাড়ীতে সরজমিনে গিয়ে জানা গেছে সোমালিয়া জলদুস্যতের লোমহর্ষক দুস্যতার খবরা-খবর। একান্ত আলাপে যে স্মৃতি কখনও ভুলার নয়, তা তুলে ধরে বলেন, ‘কোনো দিন ভাবিনি দস্যুদের হাত থেকে বেঁচে মায়ের কোলে ফিরে আসতে পারবো। এ জন্য লিমন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি।’
লিমন এসএসসি পাস করার পর বিএনএস-এ ট্রেনিং করে ২০১০ সালের ১ আগস্ট জাহাজে চাকুরি নেয়। শুরুতেই ইরানে যান। ইরানের বন্দর আবাবায় ট্রেনিং শেষে তাকে সৌদি আরবের বন্দরে পাঠানো হয়। নিয়োগ কোম্পানীর মাধ্যমে সৌদি আরবের বন্দর থেকে তাদের পাকিস্তান হয়ে কেনিয়া। তারপর সুদান পাঠায় ওই জাহাজে করে। আর এই জাহাজে ছিল শতাধিক কন্টেইনার। কন্টেনার গুলোর ভেতরে ছিলো গাড়ি, গাড়ির টায়ার, বাসমতি চাল, চিনিসহ আরো বহু পণ্য সামগ্রী। তাদের জাহাজটি কেনিয়া থেকে সুদান যাওয়ার পথিমধ্যে জলদস্যুদের হাতে আটকা পড়ে।
লিমনের দেয়া বর্ণনা থেকে জানা যায়, ২০১০ সনের ২৬ নভেম্বর সকাল ৭ টার সময় জলদস্যুরা একে ৪৭ ও রকেট লাঞ্চারসহ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জাহাজে উঠে। এ সময় জাহাজের সকল প্রবেশ পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য জাহাজের ইন্ডিয়ান ক্যাপ্টেন আমাদের নির্দেশনা দেয়। ক্যাপ্টেনের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল দরজা জানালা বন্ধ করে দিলে দস্যুরা গুলি করে ৭ জন দস্যু জাহাজের জানালার গ্লাস ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারপর ‘জাহাজের ক্রু’ সহ সকল স্টাফকে বন্দী করে ফেলে। ওইসময় দস্যুদের পেছনে থাকা আরেকটি মাছের জাহাজ থেকে ১১ জন দস্যু ঢুকে পড়ে। পরের দিন ২৭ নভেম্বর আরো ৩০-৩২ জন দস্যু এসে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এরপর দস্যুরা ২০ মিলিয়ন ইউএস ডলার দাবি করে। দস্যুদের দাবিকৃত ডলার পরিশোধের বিষয়ে জাহাজ মালিকের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। পরে তিনমাস পর মালিকের খোঁজ পায় দস্যুরা।
জাহাজ মালিক ৩ লাখ ডলার দিতে রাজী হলেও দস্যুরা ক্ষেপে উঠে। একপর্যায়ে দস্যুদের দাবিকৃত ডলার পরিশোধ না করলে সকলকে মেরে ফেলার হুমকী দেয়। কয়েক মাস কেটে গেল। পরে দস্যুরা জাহাজের মালিকের সাথে যোগাযোগ করার জন্য এক দালালচক্রের সহযোগিতা নেয়। মালিকের নিকট ২০ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ১৬ মিলিয়নে মুক্তিপণ দাবী করে। দর কষাকষির একপর্যায়ে ওই দস্যুরা জাহাজের কন্টেইনার ভেঙ্গে সকল মালামাল নিয়ে যাওয়া শুরু করে। এই মালামাল জাহাজ থেকে নামাতে শ্রমিক হিসেবে তাদেরকে কাজে লাগানো হয়।
দুবির্ষহ স্মৃতি বিজড়িত লিমন জানায়, ১৮ মার্চ ২০১২ সালে দস্যুদের সাথে মালিক পক্ষের ২.৮ মিলিয়ন ডলারে মুক্তির ব্যবস্থা করার আগ মুহূর্তে ওই জাহাজটি ডুবে যায়। তখন শ্রীলংকান নাগরিক জাহাজের ক্রু ৪ জন মারা যান। এরপরই মালিক পক্ষ তার চুক্তি থেকে সরে আসে। পাকিস্তানী নাগরিকদের ১ মিলিয়ন ডলারে ছাড়িয়ে নেয়া হয়। আর লিমনসহ ৭ বাংলাদেশীর মুক্তির বিষয়ে জাতিসংঘের একটি টিম কাজ শুরু করে। জাতিসংঘের টিমের সাথে দস্যুদের বহুবার দর কষাকষির এক পর্যায়ে ৬ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে মুক্তি পায় লিমনরা।
কথা বলতে বলতে লিমনের দু’চোখের কোণায় টলমল করছিল অশ্রু। ধরে রাখতে পারলেন না মৃত্যুর মুখোমুখী লড়াই করা জীবনের দুঃখদশার কান্না। ঝরে পড়লো অশ্রু। পাশে দাঁড়ানো লিমনের মা। তিনিও কাপড়ে আঁচল দিয়ে তাঁর চোখের অশ্রু মুছে নিলেন। চারপাশে দরজা-জানালায় ভীড় জমানো প্রতিবেশিরা হয়ে উঠেন নিস্তব্দ।
কান্না জড়িত কণ্ঠে লিমন বললেন, ‘দীর্ঘ প্রায় ৪ বছর দস্যুরা আমাদের উপর অমানবিক অত্যাচার করেছে। সারাদিন জাহাজ থেকে মালামাল নামানোর কাজে ব্যবহার করতো। আর গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে গহীন বনে নিয়ে মাটি খুঁড়ে গলা বরাবর ঢুকিয়ে মাটি চাপার ভয় দেখিয়ে বাড়িতে স্বজনদের কাছে ফোন করাতে বাধ্য করতো। আর সেই ফোনের একটাই উদ্দেশ্য, তাদের দাবিকৃত টাকা দেশ থেকে যেনো দ্রুত পাঠানো হয়।’
খাবার প্রসঙ্গে লিমন বললেন, ‘খাবার পানি প্রতিদিন আধা লিটার দেয়া হতো, তাও আবার মাঝে মধ্যে তাতে পোকা পাওয়া যেতো। আর ঐ পানিটুকু দিয়ে বাথরুমসহ সকল কাজ সারতে হতো। সারাদিনের খাবারের মধ্যে শুধুমাত্র রুটি, ডাল, সাদা ভাত, ভাত-চিনির বাইরে কোনো খাবারই দেয়া হতো না। আটক অবস্থায় এ খাবারই আমাদের সবাইকে দেয়া হতো।’
লিমনের বয়োবৃদ্ধ বাবা ওয়ালি উল্লাহ। বয়স নব্বই ছুঁইছুই। তিনি বলেন, সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। সরকার ছেলেকে আমার বুকে ফেরত দিয়েছেন। সে যে জীবিত এবং সুস্থভাবে ফেরত এসেছে, সে জন্য আল্লাহর নিকট শোকরিয়া।’
লিমনের চাচা ইউপি সদস্য বোরহান উদ্দিন। তিনি জানান, ‘লিমন বাড়িতে এসেছে এটাই বড় কথা। এখন তার একটা কাজের প্রয়োজন।’
