
দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই। এ বয়সী শিশুদের জন্মসনদ আছে ৪৭ শতাংশের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সের শিশুদের জাতীয়ভাবে জন্মনিবন্ধনের হার বর্তমানে ৫৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫৬ শতাংশ।
দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই। এ বয়সী শিশুদের জন্মসনদ আছে ৪৭ শতাংশের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সের শিশুদের জাতীয়ভাবে জন্মনিবন্ধনের হার বর্তমানে ৫৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন এ হার এখনো সর্বজনীন নিবন্ধনের লক্ষ্যের অনেক নিচে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের।
দেশে অর্ধেকের বেশি শিশুর ক্ষেত্রে জন্মের পরপরই নিবন্ধন করা হয় না। নবজাতক ও কম বয়সী শিশুদের নিবন্ধনের হার তুলনামূলক কম। ০-১১ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ৪৩ শতাংশের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়। ১২-২৩ মাস বয়সে এ হার বেড়ে ৫৫ শতাংশ এবং ২৪-৩৫ মাসে ৬৩ শতাংশে পৌঁছায়। ৩৬ থেকে ৪৭ মাসে জন্মনিবন্ধনের হার ৬৫ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও নিবন্ধন দপ্তরের মধ্যে সংযোগের অভাবে জন্মের পর শিশুর নিবন্ধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাসপাতালে জন্ম নেয়া শিশুদেরও খুব কম অংশের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়। দেশে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন করতে পারে না। এক্ষেত্রে পরিবারকে ভিন্ন দপ্তরে গিয়ে এ নিবন্ধন করতে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশ কোনো হাসপাতালে সংঘটিত জন্ম ও মৃত্যুর নিবন্ধনের দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেয়ায় প্রায় শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছে।
আবার দেশে নিবন্ধিত সব শিশুর জন্মসনদ নেই। জাতীয়ভাবে অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সী নিবন্ধিত শিশুর মধ্যে জন্মসনদ আছে ৪৭ শতাংশের। অর্থাৎ এই শিশুদের প্রতি দুজনের একজনের জন্মসনদ নেই।
বিভাগভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহীতে অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের হার সবচেয়ে বেশি, ৭১ শতাংশ। এরপর সিলেট বিভাগে ৬৪ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে জন্মনিবন্ধনের হার সর্বনিম্ন, ৫৩ শতাংশ। এছাড়া বরিশালে ৫৪, চট্টগ্রামে ৫৯, খুলনায় ৫৭, ময়মনসিংহে ৬০ এবং রংপুরে ৬২ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন হয়েছে।
মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আর্থসামাজিক অবস্থা নিবন্ধনের হারে প্রভাব ফেলছে—মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিত মায়েদের শিশুদের মধ্যে নিবন্ধন হার বেশি।
জরিপ বলছে, প্রায় ৯০ শতাংশ অভিভাবক জানেন জন্মনিবন্ধন কীভাবে করতে হয়। কিন্তু তার পরও তাদের সামনে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দেয় ইউনিয়ন পরিষদে ঝামেলামুক্ত সেবা নেয়ার সুযোগ, খরচ, দারিদ্র্য। অধিকাংশ শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে জন্ম নিলেও সেখানে নিবন্ধন না হওয়ায় জন্মের সময়ই সনদ পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।
দেশে ইউনিয়ন পরিষদে জন্মনিবন্ধন করতে অভিভাবকরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না—এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার ৬ নং উপাদী দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কার্যালয়ে জন্মনিবন্ধন সেবা নিতে আসা অভিভাবকদের কোনো বাধা বা হয়রানির শিকার হতে হয় না। বেশির ভাগ সময়ে অভিভাবকরা সরাসরি এসে সন্তানের নিবন্ধন সম্পন্ন করে যাচ্ছেন এবং কেউ কেউ স্থানীয় ইউনিয়ন মেম্বারের সহায়তা নিচ্ছেন। সার্ভার বন্ধ বা অন্য কোনো কারিগরি ত্রুটি না থাকলে এখান থেকে খুব সহজেই জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করা যায়।’
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ হাজার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হচ্ছে। সংশোধনের আবেদনও নিষ্পত্তি হচ্ছে। তবে ভাসমান ও স্থায়ী ঠিকানাবিহীন পরিবারের শিশুদের জন্মনিবন্ধন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। জন্মস্থান বা বর্তমান ঠিকানা থাকলেই নিবন্ধনের সুযোগ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এমন শিশুদের অনেকে নিবন্ধন সেবার বাইরে রয়ে যাচ্ছে।
শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি সংস্থা শিশুপল্লী প্লাসের কর্মকর্তা আব্দুর রব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জন্মনিবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া সত্ত্বেও এটি এখনো আমাদের সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠা পায়নি। জন্মনিবন্ধনে সংশ্লিষ্ট মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।’ ঢাকার মতো মহানগরীতে নিবন্ধনের হার কম হওয়ার জন্য তিনি সুষম নগরায়ণ প্রক্রিয়ার অভাবকে দায়ী করেন। তার মতে, নিবন্ধন না হওয়ার প্রধান কারণ হলো অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক ও প্রক্রিয়াগত বাধা। তিনি আরো বলেন, সচেতনতার অভাব না থাকলেও দারিদ্র্য, নিবন্ধনের খরচ, সেবা কেন্দ্রে পৌঁছার অসুবিধা এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার কোনো কার্যকর সংযোগ না থাকা—এ কারণগুলো সম্মিলিতভাবে জন্মনিবন্ধনকে পিছিয়ে রাখছে। ফলে শহরের ভাসমান শিশুরা প্রয়োজনীয় নথি ও স্থায়ী ঠিকানার অভাবে রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ঢাকা বিভাগে জন্মনিবন্ধনের হার সর্বনিম্ন হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল ১০-এর নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উন্নেছা শিউলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষই অস্থায়ী (ভাড়াটিয়া) এবং বাইরের জেলা থেকে আসা। জন্মনিবন্ধনের একটি নিয়ম হলো এটি স্থায়ী ঠিকানায় করতে হয়। যেহেতু গ্রামের বা জেলা-থানা পর্যায়ের মানুষ বেশির ভাগই স্থানীয়, তাই সেখানে নিবন্ধনের হার বেশি।’ এ কর্মকর্তা আরো বলেন, অফিসগুলোতে সেবা নিতে আসা মানুষের মধ্যে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম, কারণ তারা কমফোর্ট জোনের বাইরে যেতে চান না; তবে তারা নারী-পুরুষ উভয়কেই অফিসে স্বাগত জানান বলেও উল্লেখ করেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) মো. যাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় স্থায়ী মানুষ কম থাকার কারণে এখানে জন্মনিবন্ধনের হার কম।’ ভাসমান প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের জন্মনিবন্ধন জটিলতা ও অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জন্মনিবন্ধনের জন্য বিধিবদ্ধ কিছু নিয়ম রয়েছে এবং সেই বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে ভাসমান জনগোষ্ঠীর নিবন্ধনের ক্ষেত্রে তাদের জন্মস্থান বা বর্তমান ঠিকানা থাকলেই তারা জন্মনিবন্ধন করতে পারবে।’
রেজিস্ট্রার জেনারেল আরো জানান, শহরের ভাসমান জনগোষ্ঠীর নিবন্ধনের জন্য তারা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করছেন। এজন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ নিবন্ধনের মূল দায়িত্ব পালন করে।
রেজিস্ট্রার জেনারেল বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাওয়া সব শিশুর জন্মনিবন্ধন রয়েছে, কারণ এটি ছাড়া তারা শিক্ষাজীবন শুরু করতে পারে না।’
