
মোহাম্মদ রসু মিয়া ছারছিনা থেকে ফিরে:
ছারছীনা দরবার শরীফের পীর ছাহেব কেবলা হযরত মাওলানা মোহেব্বুল্লাহ বলেছেন, বাংলাদেশ বিশ্বের ২য় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। এ দেশের আনাচে-কানাচে শুয়ে আছে হাজার হাজার আউলিয়ায়ে কেরাম। যাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও দাওয়াতের কারণেই আজ এ দেশে শতকরা ৯০ ভাগ বাসিন্দা মুসলমান। এর পেছনে হক্কানি পীর মাশায়েখদের অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি বলেন, আমরা দলীয় রাজনীতি করি না। কারও সাথে আমাদের গদির সংঘাত নেই। তবে ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে কোনো আঘাত আসলে শুধু আমরা কেন কোনো মুসলমানই তা সহ্য করতে পারে না। আমরা ঈমান-আমল নিয়ে বাঁচতে চাই। এজন্য প্রয়োজন হক্কানি পীর মাশায়েখদের সোহবতে আসা। কারণ এসব পীর মাশায়েখ সীরাতুল মুস্তাকিম তথা সহজ-সরল পথে চলেই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। আজকের এই অশান্ত পৃথিবীতে মানুষ একটু সুখ-শান্তির জন্য মানব রচিত মতবাদের পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের এই প্রচেষ্টা আগাগোড়াই ব্যর্থ। বরং ইহকালীন সুখ শান্তি ও পরকালীন মুক্তির জন্য আমাদেরকে সীরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলতে হবে। আর সীরাতুল মুস্তাকিমের পথ হলো নবী-রসূল ও সাহাবায়ে কেরামদের পথ।
তিনি গতকাল শুক্রবার ছারছীনা দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুল আলম আল্লামা শাহ্সূফী নেছারুদ্দীন আহমদ (রহ.) এর ৬৩তম ও তারই জানেশীন মুজাদ্দিদে যামান হযরত মাওলানা শাহসূফী আবু জাফর মোহাম্মদ ছালেহ (রহ.) এর ২৫তম ইন্তেত্মকালবার্ষিকী, ছারছীনা মাদরাসার তিন দিনব্যাপী ১২৫তম ঈসালে ছওয়াব মাহফিল ও বাংলাদেশ জমইয়তে হিযবুল্লাহ সম্মেলনের শেষ দিন বাদ জুমা আখেরী মোনাজাতের পূর্বে লাখো লাখো ভক্ত-মুরিদানের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে পীর ছাহেব কেবলা একথা বলেন।
পীর ছাহেব কেবলা আরও বলেন, বিশ্বের দিকে দিকে আজ মুসলমানরা মার খাচ্ছে। তারা আজ অবহেলিত ও উপেক্ষিত জাতিতে পরিণত হয়েছে। এর কারণ হলো আমলহীনতা, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা। আজকের মুসলমান আল্লাহকে ভুলে গিয়ে দুনিয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছে। নেক কাজ বাদ দিয়ে বদ কাজে আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে। এটা একজন খাঁটি মুসলমানের কাজ নয়।
পীর ছাহেব কেবলা আরও বলেন, আপনারা পীরের কাছে এসেছেন আল্লাহকে পাওয়ার জন্য, পীরকে নয়। মুরিদ পীরের কাছে কখনো স্বাধীন নয়। যেহেতু আল্লাহকে পাওয়ার জন্য পীরের হাতে হাত রেখেছেন। তাই পীরের প্রতিটি আদেশ-নিষেধ মেনে চললেই আল্লাহকে পাওয়া যাবে। অপরদিকে ত্বরিকার নেয়ামত লাভ করতে হলে গিবত-কোয়াত, মিথ্যা বলা, পারস্পরিক শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ, আরাম ভক্ষণ, সুদ-ঘুষ, বেপর্দেগী এসব খারাপ বদ অভ্যাসগুলো পরিহার করতে হবে।
পীর ছাহেব কেবলা আরও বলেন, আল্লাহ ও রসূল (সা.) এর প্রতিটি হুকুম-আহকাম মেনে চলাই আমাদের প্রধান কাজ। তাই ছেলে হবে পিতার ন্যায়, মুরিদ হবে পীরের ন্যায় এবং উম্মত হবে প্রিয় নবী (সা.) এর নমুনায়। তিনি মাহফিলে আগত ভক্ত মুরিদানদের নিজ নিজ সন্তানকে হক্কানি আলেম বানাতে দ্বীনি মাদরাসার শিক্ষায় শিক্ষিত করার আহ্বান জানান।
এছাড়া হযরত পীর ছাহেব কেবলার বড় ছাহেবজাদা ও বাংলাদেশ জমইয়তে হিযবুল্লাহর সিনিয়র নায়েবে আমীর আলহাজ হযরত মাওলানা শাহ আবু নছর নেছারুদ্দীন আহমদ হুসাইন বলেন, যারা দায়িত্বশীল; পরকালে আল্লাহর দরবারে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। সমাজের নিচু থেকে শুরু করে উঁচু স্তর পর্যন্ত কেউ পরকালীন জবাবদিহিতা থেকে বাঁচতে পারবে না। তাই সর্বদা দায়িত্বশীলদের আল্লাহর ভয় হৃদয়ে লালন করে প্রতিটি কাজ সম্পাদন করা উচিত।
জনসমুদ্র ছারছিনা ময়দান ঃ
ছারছীনার ১২৫তম ঈসালে ছওয়াব মাহফিলের শেষ দিন স্মরণকালের সর্ববৃহৎ মুসল্লিদের মিলন মেলায় পরিণত হয়। দেশের প্রতিকূল পরিস্থিতি উপেক্ষা করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বাস, লঞ্চ, ট্রলার, অন্যান্য হাজার হাজার যানবাহনযোগে পীর ভাই, মোহেব্বীন ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ গুনাহ মাফের আশায় এবং মরহুম পীর ছাহেব কেবলাদ্বয়ের ও বর্তমান হুজুরের ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ এবং নেক দোয়া লাভের আশায় ছারছীনার এই পুণ্যভূমিতে হাজির হয়। মাহফিলের সুবিশাল প্যান্ডেলসহ সন্ধ্যা নদীর উত্তর ও দক্ষিণ পাশ ও মাগুরার আশপাশসহ কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। এখানে এক লোকের সমাগম হয় যা কল্পনাতীত। আখেরী মোনাজাতের পূর্বে মিলাদ ও কিয়ামে ইয়া নবী সালাম আলাইকার সুর ও আমীন-আমীন ধ্বনিতে এবং চোখের পানিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়। মনে হয়েছিল যে, আল্লাহর আরশও যেন কেঁপে উঠেছিল। এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য ও অনুভূতি কাছে না গেলে সত্যি উপলব্ধি করা দুরূহ ব্যাপার।
