
বিমল চৌধুরী
জ্যৈষ্ঠ মাস মধু মাস। ফলের মাসে ফলের রসে মনকে ভরপুর করতে চাইলেও ফরমালিন জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্যের কল্যাণে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন আম, জাম, লিচুসহ মধু মাসের প্রিয় ফলের স্বাদ থেকে। বাজারে দেশি আমের চাহিদা থাকলেও সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা বাহারী আমের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ক্রেতা সাধারণ। অবশ্য সবাই যে নিচ্ছে না তা নয়। যাদের মাঝে সচেতনতাবোধ ও ফরমালিনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ধারণা আছে তারাই বাজারে থাকা বাহারী এ সকল ফলের দোকান থেকে একটু দূরে থাকছেন। ফলে এ সকল ফল ব্যবসায়ীগণ পড়ছেন বিপাকে। পুরাণবাজার-নতুনবাজারসহ ক’জন পাইকারি ফল বিক্রেতা জানান, তাদের ভিন্ন ভিন্ন মত। তাদের মতে ফরমালিন নিয়ে যতো কথা বলা হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে আমদানিকৃত সব ফলেই ফরমালিন নেই। কিছু কিছু অসাধু বাগান মালিক বা ব্যবসায়ী এ ফরমালিন দিয়ে থাকতে পারেন। তবে সবাই দিচ্ছে না বলে ব্যবসায়ীগণ দাবি করেন। ব্যবসায়ীগণ যাই বলে থাকুক না কেন, ফরমালিন, কার্বাইড জাতীয় ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার থেকে আমাদের সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। মধু মাসে বাহারী ফলের রস থেকে যারা আমাদের সন্তানদেরকে বঞ্চিত করছেন তাদের উপযুক্ত বিচার হওয়াও জরুরি বলে অনেকে মনে করেন।
বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের আম খুবই সু-স্বাদু ও মিষ্টি। আর এ আমেই মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য। রাজশাহী মহানগর, গোদাগাড়ী, বাঘা, চারঘাট, পুটিয়া, বানেশ্বর, চাপাই নবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, কানসার্ট, গোমস্তাপুর, রহনপুর ও ভোলা হাটের হাটবাজারে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন জাতের আম উঠলেও বেশির ভাগ ক্রেতা সাধারণের পছন্দ গোপালভোগ, খিরসা ও ল্যাংড়া। এ সকল ক্রেতার চাহিদার সুযোগ নিয়ে অতি মুনাফার জন্য আম ব্যবসায়ী এবং আম চাষীরা তাড়াতাড়ি ও বিলম্বে আম পাকানোর জন্য ভিন্ন উপায় অবলম্বন করে থাকে। তারা গোপালভোগ, খিড়সা, ল্যাংড়াসহ বিভিন্ন জাতের আমে অতিমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। এসব রাসায়নিকযুক্ত আম বা বিভিন্ন জাতের ফল খেয়ে মানব দেহে বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ জানান। আরো জানা যায়, আম পুরোপুরি পরিপক্ক হওয়ার আগেই আম চাষীরা বেশি দাম পাওয়ার আশায় গাছ থেকে আমগুলো নামিয়ে নেন এবং তা পাকানোর জন্য আমে কার্বাইড ও আনারস পাকানো হরমোন জাতীয় রাইজার, রাইপেন, হারভেস্ট স্পে করা হয়। এসব রাসায়নিক অতিমাত্রায় ব্যবহার করে তাড়াতাড়ি আম পাকানো হয়। যার ফলে আমের উপরের অংশে সবুজ ও হলুদের মিশ্রণ রং দেখা দিলেও ভেতরের অংশ কাঁচা থেকে যায়। এসব আম খেতে টক মিষ্টি হয়। এ ছাড়া রাসায়নিক মেশানো আম পচনরোধে ফরমালিন ও ছত্রাক নাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। আমে টিল নামের এক ধরনের কীটনাশক স্প্রে করার পর এসব আম অন্তত ১৫ দিনের মধ্যে পচন ধরে না। আবার বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ১৫ দিন বিলম্বে আম পাকানোর জন্য গাছে থাকা অবস্থাই ব্যবহার করেন ছত্রাকনাশক নুইন, সোভন পাউডার ও পেনকোজের জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য। এসব রাসায়নিক মিশ্রিত ফল খেয়ে মানব দেহে দেখা দেয় ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভার সমস্যাগত জটিল রোগ। বাজারে আম ছাড়াও রাসায়নিক মেশানো লিচু, কলা, তরমুজ, আপেল, ডালিম, বেদানা, কমলাসহ বিভিন্ন ফল অবাধে বিক্রি হচ্ছে।
সু-স্বাদু কলা যা দেখলে সহজেই খেতে ইচ্ছে হয়। বাজারে এখন প্রচুর পরিমাণে কলা পাওয়া যাচ্ছে। যার অধিকাংশই কার্বাইড দ্বারা পাকানো। আর এ পাকানোর পদ্ধতিও বেশ চমকপ্রদ। কলার ছড়াগুলো সারি সারিভাবে গোল করে ঝাঁক দিয়ে রাখা হয় এবং এর ফাঁকে ফাঁকে দেয়া হয় কার্বাইড। আবার অনেকে চারিদিকে কলার ছড়া সাজিয়ে রেখে মাঝে স্টোভ জ্বালিয়ে দিয়ে উপরে ভালোভাবে ঢেকে দেন। যাতে ভেতরে সৃষ্টি হওয়া তাপ বাইরে বের হয়ে না আসতে পারে। ফলে ভেতরে প্রচণ্ড গরমের সৃষ্টি হয়। এ তাপের দ্বারাই কলার ছড়ার রং ধরে এবং তা পেঁকে যায়। জোর করে কার্বাইড বা তাপ দিয়ে পাকানো কলা শরীরের জন্য কতোটুকু উপকারী তাও ভেবে দেখতে হবে।
আজ ক’দিন ধরেই ঢাকা শহরে ফরমালিন মিশ্রিত ফল-ফলাদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নষ্ট করে চলছে। সতর্ক হচ্ছে মানুষ। তারপরও থেমে নেই ফরমালিনযুক্ত আম, জাম, লিচুর আমদানি। রাজশাহীসহ ঢাকার বাজার হতে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে আম, লিচু জেলা শহর চাঁদপুরে আসছে। এ সকল আমদানিকৃত ফলে রাসায়নিক মিশ্রিত ক্ষতিকর পদার্থ আছে কি না জানার উপায় নেই। জানা যায়, দুই উপায়ে চাঁদপুরে এ সকল ফল আমদানি হচ্ছে। রাজশাহী থেকে সরাসরি ট্রাকযোগে বিভিন্ন জাতের আম আমদানি হচ্ছে। এ সকল আমে ফরমালিন বা রাসায়নিক পদার্থ দেয়ার সুযোগ খুবই কম। কারণ হিসেবে এ সকল ফল আমদানিকারকগণ জানান, ট্রাকে আসা এ সকল আমে রাসায়নিক দ্রব্য না থাকার কারণ হলো কবে কখন বা ক’ দিনে আমদানিকৃত মাল চাঁদপুর আসবে তার নিশ্চয়তা নেই। স্বভাবত আম পাকানো বা সতেজ থাকার জন্য এ জাতীয় রাসায়নিক ব্যবহার হয়ে থাকে। যে সকল স্থানে ফলের চাহিদা ব্যাপক এবং বিক্রি বেশি সে সকল স্থানের ব্যবসায়ীগণ অনেক বেশি বিক্রির আশায় কাঁচা আমে রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে তা পাকিয়ে তোলে। যা ঢাকা শহরেই হয়ে থাকে। এ সকল রাসায়নিক মিশ্রিত আম প্লাস্টিকের ঝুঁড়িতে করে প্রতিদিন লঞ্চযোগে চাঁদপুরে আসে এবং তা বাবুরহাট, হাইমচর, কাটাখালী, ফরিদগঞ্জ, মতলবসহ শহরের বিভিন্ন হাট-বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা বিক্রি হচ্ছে দেদারচ্ছে। চাঁদপুর শহরে নতুনবাজার-পুরাণবাজার মিলিয়ে প্রায় ৮/১০ জন পাইকারি আম ব্যবসায়ী রয়েছেন। যাদের অনেকেই চাঁদপুরে লঞ্চযোগে আমদানিকৃত আম ও লিচুতে রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রণ রয়েছে বলে স্বীকার করেন।
তাদের দাবি চাঁদপুর জেলা শহরে আমসহ অন্যান্য ফল রাসায়নিকমুক্ত করতে হলে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে চেকপোস্ট বসানোর মধ্যে দিয়ে আমদানিকৃত ফল পরীক্ষা করা হোক। তাহলেই শহরবাসী ফরমালিন বা রাসায়নিকযুক্ত ফল থেকে মুক্তি পাবে। বর্তমানে বাজারে আমের আমদানি থাকলেও চাহিদা রয়েছে কম। ফলে অনেক আম ব্যবসায়ীই লোকসানের মুখে পতিত হচ্ছেন। বর্তমানে চাঁদপুর পাইকারি বাজারে ল্যাংড়া ও হিমসাগর আম ৫০ থেকে ৬০ টাকা, লক্ষ্মণ ভোগ, গোপালভোগ ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, ভালো জাতের কলমের আটি ৪০ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
