চাঁদপুর নিউজ রিপোর্ট
সদ্য এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তির কথা ছিলো লিপি আক্তারের। বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে কলেজের ড্রেস ও বোরকা বানাতে গিয়েছিল সে। ফেরার পথে অপহরণ হওয়ার পর উদ্ধার হলেও বখাটেদের মানসিক নিপীড়ন, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সমঝোতার নামে টালবাহানা থেকে বাঁচতে পারেনি লিপি। কলুষিত সমাজকে দায় মুক্তি দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলো সে। জীবন নিঃশেষের মধ্যে স্বপ্নভঙ্গ হলো একটি পরিবারের। এলাকাবাসী লিপি আক্তারের প্রকৃত হত্যাকারীর বিচার চায়।
অপহরণ থেকে উদ্ধারের পরও বখাটেদের মানসিক নিপীড়ন, হুমকি আর সামাজিক ব্যক্তিবর্গের সমঝোতা ও সমালোচনায় অতিষ্ঠ লিপি আক্তার বাঁচার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারেনি। মানসিক যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে নিঃশেষ হচ্ছিল তার স্বপ্নগুলো। ১২ জুন ক্ষোভে অভিমানে বিষপানের পর তার মৃত্যু হয়। ময়না তদন্ত শেষে মতলব দক্ষিণ উপজেলার নওগাঁও গ্রামে নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গত ২০ মে বিকেল ৩টায় লিপি নওগাঁও বাজারে ড্রেস বানাতে যায়। ফেরার পথে ডলিয়াউড়া গ্রামের মিজি বাড়ির সামনের ব্রিজের উপর থেকে সে অপহরণ হয়। ২১ মে তার বাবা মোঃ ওয়ালী উল্যাহ একই উপজেলার অাঁচলছিলা গ্রামের শাহ আলমের ছেলে সাইফুল ইসলাম, বাচ্চু মিয়াজীর ছেলে তাজউদ্দিন ইসলাম ও নওগাঁও গ্রামের মোঃ আবুল বাসারের ছেলে শাহাদাত হোসেনকে আসামী করে অপহরণ মামলা করেন। মতলব দক্ষিণ থানা পুলিশের সহযোগিতায় সাইফুলের নানা বাড়ি নায়েরগাঁও গ্রাম থেকে লিপিকে উদ্ধার করা হয়। সে থেকে সাইফুল আত্মগোপনে।
লিপির পিতা ওয়ালী উল্যাহ জানান, আমার মেয়ে অপহরণ হওয়ার পর আমরা মতলব দক্ষিণ থানায় মামলা করি। থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে মতলব বারঠালিয়া এলাকার জাকির, অাঁচলছিলা এলাকার সোহেলসহ বেশ ক’জনের হস্তক্ষেপে এলাকায় বিচার-সালিসের ব্যবস্থা করা হয়। পরে তারাও বিভিন্নভাবে টালবাহানা ও সময়ক্ষেপণ করে। সে থেকে লিপি বিমর্ষ এবং আনমনা হয়ে থাকতো। এছাড়া সাইফুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের মোবাইল ফোনে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি অব্যাহত ছিলো। লিপির ভাই মাহফুজ জানান, গত ১২ জুন শুক্রবার আমার বোন খালাতো ভাই সুমনদের বাড়ি মতলব পৌরসভার দগরপুর এলাকায় ছিলো। খালাতো ভাই সুমন তাকে জানায়, অপহরকারী সাইফুলের পিতা শাহআলম তাকে জানিয়েছে লিপিকে তার ছেলে সাইফুল তুলে নিয়ে গেছে। পরে লিপির পিতা ওয়ালী উল্যাহর দায়ের করা মামলার কারণে তাকে ফেরৎ দেয়া হয়েছে। লিপির ভাই মাহফুজের দাবি, শাহআলমের ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করায় তাদের নিপীড়নে আমার বোনকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে।
লিপির ভাই মাহফুজ মিয়া বলেন, দু’ বছর পূর্বে আমার খালাতো ভাইয়ের সাথে আমার বোনের বিবাহের কথাবার্তা হয়েছিলো, সে মতে মুঠোফোনে বিবাহ হবে, আগামী আগস্ট মাসে সুমন দেশে আসলে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু সবশেষ হয়ে গেলো। শাহআলমের ছেলে সাইফুলের কাছে বিয়ে না দেয়ায় অপপ্রচার চালিয়ে আমার বোনকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে। আমি আমার বোন হত্যার বিচার চাই। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে গতকাল ১৮ জুন কথা হয়েছে। তিনি জানান, মামলার প্রস্তুতি চলছে।
লিপির ভাবী মর্জিনা জানান, গত ১২ জুন শুক্রবার সকালে লিপি আমাকে জানায়, ভাবী, সাইফুল ও তার পিতা আমাকে বাঁচতে দিলো না। তারা সুমনকে মুঠোফোনে বলেছে, আমার সাথে সাইফুলের সম্পর্ক রয়েছে। খালাতো ভাই সুমন আমাকে মোবাইলে বলেছে, এ ঘটনা সত্য হলে আমাকে বিয়ে করবে না।
সাইফুলের বোন ও মা আমেনা বেগম বলেন, সাইফুল লিপিকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে এটা এ এলাকার সবাই জানে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা গরিব বলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তবে আমার স্বামী সুমনকে ফোন দেয়নি। এ ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না।
লিপি আক্তারের আত্মহত্যার ঘটনা সম্পর্কে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সাংবাদিকদের সাথে পুলিশ সুপার শামসুন্নাহারের মতবিনিময়কালে তাঁকে অবহিত করা হলে তিনি বলেন, আমি লিপিদের বাড়িতে যাবো। ঘটনার জন্যে কেউ দায়ী হলে তাকে রেহাই দেয়া হবে না।
