প্রায় দু বছর পর চাঁদপুর শহরে আবার আলোচনায় লেংটা বাড়ি। মাদক, সন্ত্রাসসহ এমন কোনো অপরাধমূলক কাজ নেই যা এই লেংটা বাড়ি থেকে হয় না। অথচ শহরের ব্যস্ততম এলাকা এবং নতুনবাজার পুলিশ ফাঁড়ির খুব কাছেই অবস্থান এই সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জনপদটির। ২০১২ সালে একবার এই পুরো লেংটা বাড়িটি উচ্ছেদ হয়েছিলো। লেংটা বাড়ি সন্ত্রাসী বাহিনীর মূল লিডার বর্তমানে শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক খোকন মজুমদারের বাহিনী ২০১২ সালে চাঁদপুর শহরের নাজির পাড়ায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে বিল্লাল দেওয়ান নামে এক যুবককে হত্যার পর লেংটা বাড়িটি উচ্ছেদ করা হয়। বছর না যেতেই এই খোকন তার ‘গুরু’ পাল্টিয়ে নতুন গুরুর আশীর্বাদে আবার ধীরে ধীরে পুরানো জায়গায়ই তার আস্তানা গাঁড়তে থাকে। উচ্ছেদের দু বছরের মাথায় শহীদ মিনারের পেছনে ও আশপাশে বিশাল এলাকা জুড়ে আস্তানা গড়ে তোলে এই খোকন বাহিনী। যেখান থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মাদক বেচাকেনা হয়। খোকনের সেকেন্ড ইন কমান্ড হচ্ছে তারই দুই সহোদর রাশেদ মজুমদার, সুমন মজুমদার, চাচা আক্কাছ ও অন্যতম সহযোগী মনির।
চাঁদপুর নতুনবাজার পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে পুরাণ আদালত পাড়া মজুমদার বাড়ি। এই মজুমদার বাড়ির সাথেই রয়েছে রেলওয়ের বিশাল জায়গা। এই মজুমদার বাড়ির বাসিন্দাই হচ্ছে খোকন। এই বাড়ির দুই পাশ খোলা থাকায় এবং বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চারা বর্ষার সময় উলঙ্গ হয়ে পার্শ্ববর্তী খালের পানিতে ডুবাডুবি করতো বিধায় এ বাড়ির নাম হয়ে যায় লেংটা। তবে লেংটা বাড়ি হিসেবে খুব বেশি পরিচিতি পায় যখন এই বাড়ি থেকে হরহামেশা ছোট ছোট ছেলেরা বড় বড় দা, ছেনি নিয়ে বের হয়ে শহরে ত্রাস সৃষ্টি করতো তখন থেকে। এই বাড়ির আক্কাছ থেকে মূলত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু হয়। সে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় এই বাড়ির উঠতি বয়সী ছেলেদের নিয়ে সে বিএনপির মিছিল-মিটিং করাতো এবং সে নিজে মাদক বেচাকেনাসহ বিভিন্ন অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলো। তারই আপন ভাতিজা খোকন। খোকন এক সময় জেলা ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে যায়। সে জেলা ছাত্রলীগের কার্যকরী কমিটির সম্পাদকীয় পদেও ছিলো। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর খোকন ও তার বাহিনী ক্রমান্বয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় উঠতি বয়সী সন্ত্রাসী, ছিঁচকে চোর ও ছিনতাইকারীদের ঠিকানা হয়ে যায় এই লেংটা বাড়ি। আর তাদের নেতা বনে যায় খোকন। তার বিশাল ‘বিচ্ছু’ বাহিনীর সুবাদে সে তাদের বাড়ির সাথে রেলওয়ের খালি জায়গায় অবৈধভাবে ঘর তোলে এবং শহীদ মিনারের আশপাশে আস্তানা গড়ে তোলে। যেখানে থাকতো দেশীয় ধারালো অস্ত্রের মজুদ এবং ফেন্সিডিলসহ নানা মাদকদ্রেব্যের মজুদ। দিনে নীরব সময়ে এবং সন্ধ্যার পর কোনো নারী-পুরুষ শহীদ মিনারের পেছন দিয়ে আসা-যাওয়া করতে পারতো না। তারা ছিনতাইয়ের শিকার হতো। শহরে বেশ ক’টি আলোচিত সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে এই লেংটা বাড়ির সন্ত্রাসীদের দ্বারা। সর্বশেষ ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল লেংটা খোকন অপর সন্ত্রাসী মুরগী রাজু বাহিনীর দ্বারা হামলার শিকার হলে তারই জের হিসেবে ওই দিন সন্ধ্যায় খোকন বাহিনী শহরের নাজির পাড়ায় ঢুকে এক নিরীহ যুবক বিল্লাল দেওয়ানকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। প্রকাশ্যে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর পুরো শহরে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। প্রশাসনসহ সকলের টনক নড়ে। প্রবল দাবি উঠে রেলের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা লেংটা বাড়ি উচ্ছেদের। এদিকে বিল্লাল দেওয়ান হত্যাকাণ্ডের পর খোকন ও তার সহযোগীরা পালিয়ে যায়। পরে ২০১২ সালের ১৯ ও ২০ মে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, পৌরসভা ও রেল বিভাগের যৌথ উদ্যোগে খোকনের পুরো আস্তানা লেংটা বাড়ি উচ্ছেদ করা হয়। লেংটা বাড়ি উচ্ছেদ করার পর পুরো জায়গাটি রেল বিভাগ কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে বাউন্ডারী দিয়ে দেয়। কিন্তু সে বাউন্ডারী এখন আর নেই। কিছুদিন পর খোকন বাহিনী আবার প্রকাশ্যে আসতে থাকে। এবার সে তার ‘গুরু’ পাল্টায়। ক্ষমতাসীন দলের ক’জন শীর্ষ নেতার আশীর্বাদে খোকন আবার লেংটা বাড়িতে আস্তানা গাঁড়তে থাকে। তাকে শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়কের পদ দেয়া হয়। এই পদ পেয়ে সে এবং তার বাহিনী অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে। লেংটা বাড়ির রেলওয়ের জায়গায় আবার পুরানো স্টাইলে আস্তানা গড়ে তোলার পাশাপাশি শহীদ মিনারের পেছনে বাউন্ডারী দেয়াল লাগোয়া রেলওয়ের জায়গায় বিশাল পরিসরে ভাঙ্গারি দোকান গড়ে তোলে। এ ছাড়া শহীদ মিনারের আশপাশে বেশ কিছু টং দোকান তুলে সেগুলো ভাড়া দেয় খোকন। এসব জায়গায়ই খোকন বাহিনীর অস্ত্র এবং মাদকের মজুদ থাকে। যার প্রমাণ মিলে গত বুধবার পৌরসভার উচ্ছেদ অভিযানকালে লেংটা বাড়ি থেকে ধারালো অস্ত্র নিয়ে এসে পৌরসভার স্টাফদের উপর হামলার ঘটনা। জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ ওই ক’ নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে খোকন ও তার বাহিনী এতোটাই বেপরোয়া হয়ে উঠে যে, পৌর মেয়রের সাথে হাত ধরতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। মেয়রের উপস্থিতিতে তারা অস্ত্র নিয়ে পৌরসভার স্টাফদের উপর হামলা চালায়।
চাঁদপুর শহরবাসী এই লেংটা বাড়ি অধ্যায়ের শেষ দেখতে চায়। রেলের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এই সন্ত্রাস ও মাদকের আস্তানা আবারো উচ্ছেদ করে এখানে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান করা হোক। শুধু লেংটা বাড়িই নয়, আর কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী যেনো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেড়ে না উঠে এ বিষয়ে সচেতন মহল সকলের কাছে আবেদন জানিয়েছে।
এই লেংটা বাড়ি ও শহীদ মিনারের আশপাশে অবৈধ সকল স্থাপনা ও দোকানপাট উচ্ছেদের ব্যাপারে পুলিশ সুপার শামসুন্নাহারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, আমি তিন বছর আগের ঘটনা সম্পর্কে জেনে নেবো এবং মেয়র সাহেবের সাথে কথা বলবো। অবৈধ কোনো আস্তানা বা স্থাপনা থাকতে পারবে না। এ ব্যাপারে অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে পদক্ষেপ নেয়া হবে।

