নাজমুল লিখন: গ্যাস সঙ্কটে বাসাবাড়ি ও শিল্প-কারখানায় ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অবৈধ গ্যাস ব্যবহারও বন্ধ করতে পারেনি সরকার। অন্যদিকে গণশুনানিতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের নতুন দাম ঘোষণা করতে প্রস্তুতি নিয়েছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। যে কোনো দিন গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
সূত্র জানায়, গ্যাসের দাম যতটাই বাড়ানো হোক না কেন, এর প্রধান কারণ হবে গ্যাসের দামের ওপর থেকে সরকারের শুল্ক ও কর সংগ্রহের সিদ্ধান্ত এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি। সরকার যদি শুল্ক ও কর সংগ্রহের হার কিছুটা কমায়, তাহলে দাম অনেক কম বাড়বে।
সরকার গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও বাসাবাড়িতে গ্যাস সঙ্কট দূর করতে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। সঙ্কট দূর করার বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বারবার বলছেন, তারা সমাধানের চেষ্টা করছেন। কিন্তু সমাধান মিলছে না। গ্রাহকদের অনেকেরই গ্যাস ব্যবহার না করেই মাস শেষে নির্ধারিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বিইআরসির এক সদস্য গতকাল বলেন, আগে কমিশনের সদস্য সংখ্যা কম ছিল। এ মাসে চেয়ারম্যানসহ আরও দুজন সদস্যকে কমিশনে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। দাম বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে তারা কাজ করছেন। তবে কমিশনের চেষ্টা থাকবে বৃদ্ধির হার যেন গ্রাহকদের জন্য সহনীয় পর্যায়ে থাকে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেছেন,
গণশুনানিকালে প্রমাণিত হয়েছে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কোনো দরকার নেই। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অনেক কমেছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানো একেবারেই অযৌক্তিক। কোনোভাবেই দেশের জন্য ইতিবাচক হবে না। তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুতের দাম বাড়বে, সারের দাম বাড়বে। কারখানায় উত্পাদন খরচ বেড়ে যাবে। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন-জ্বালানির দাম কমালে অর্থনীতি চাঙ্গা হয়, প্রবৃদ্ধি হয়। সেখানে নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ালে জ্বালানিখাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে। যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
অধ্যাপক শামসুল আলম আরও বলেন, গ্যাস খাতের প্রতিটি কোম্পানির হাতে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে, যা এ খাতের উন্নয়নের কোনো কাজে লাগছে না। এ অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো যুক্তি নেই। জ্বালানি খাতে সরকারের অব্যবস্থাপনাই এজন্য দায়ী-এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই সরকার গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে। জনগণের প্রতি কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা না থাকলেই সরকার যা খুশি তা করতে পারে।
সূত্রমতে, পেট্রোবাংলা ও এর অধীন সংস্থাগুলোর প্রস্তাব এবং তার ওপর অনুষ্ঠিত গণশুনানির আলোকে গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে হিসাব-নিকাশ প্রায় চূড়ান্ত করেছে বিইআরসি। গ্যাসের নতুন দাম নির্ধারণের বিষয়ে সম্মতি রয়েছে সরকারেরও। আগামী মাসে দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০১৫ সালের আগস্টে সর্বশেষ গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল বিইআরসি। যা কার্যকর হয় সেপ্টেম্বর থেকে। তখন গড়ে ২৬.২৯ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়। এবার গড়ে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ দাম বাড়ানো হতে পারে। বাসাবাড়ির গ্যাসের দাম দুই চুলার জন্য মাসিক বিল ৬৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার, এক চুলার জন্য ৬০০ থেকে বেড়ে ৮০০ টাকা হতে পারে। এছাড়া সিএনজির দাম প্রতি ঘনমিটার ৩৫ থেকে বেড়ে ৪৩-৪৫ টাকা, গৃহস্থালিতে মিটারভিত্তিক গ্যাসের দাম ৭ থেকে বেড়ে ৯-১০ টাকা এবং শিল্প-কারখানায় ব্যবহূত ক্যাপটিভ বিদ্যুতের জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৮ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১০ টাকা হতে পারে। অন্য খাতেও বাড়বে গ্যাসের দাম।
শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পেট্রোবাংলাসহ গ্যাস বিক্রেতা সরকারি কোম্পানিগুলো প্রায় প্রতিটিই লাভজনক। তাই গ্যাসের দাম বর্তমানে বাড়ানো যৌক্তিক হবে না। এতে সার্বিক অর্থনীতি ও জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়বে।
গত বছর ৭ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত বিইআরসি কার্যালয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি হয়। বিতরণকারী কোম্পানিগুলো গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মূল্যায়ন করে বিইআরসি মূল্যায়ন কমিটি বিভিন্ন মন্তব্য করে। সেখানে বলা হয়, বেশিরভাগ কোম্পানিই লাভ করছে বলে তাদের গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। পেট্রোবাংলা গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এফডিআর করে রেখেছে। এ অবস্থায় আবার গ্যাসের কেন দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে; সে বিষয়ে কোনো যুক্তিও দিতে পারেনি।
তিতাস গ্যাসের গণশুনানিতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি তপন চৌধুরী বলেছিলেন, সর্বশেষ গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে বস্ত্র খাতের উত্পাদন ব্যয় বেড়ে গেছে ব্যাপকভাবে। ফলে অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ এত কম থাকে যে, উত্পাদন কার্যক্রম চালিয়ে রাখা যায় না। কিন্তু মিটারে ঠিকই বিল ওঠে। নতুন করে দাম বাড়ানো হলে বস্ত্রসহ শিল্পখাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস কোম্পানিগুলো দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপচয় কমাতে পারে। সেখান থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক সাশ্রয় হতে পারে।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, গ্যাসখাত থেকে বিভিন্ন নামে প্রায় ৮১ শতাংশ অর্থ শুল্ক ও কর হিসাবে সরকার নেয়। তার মধ্যে রয়েছে সম্পূরক শুল্ক ৪০ শতাংশ। মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ১৫ শতাংশ। অগ্রিম আয়কর ৩ শতাংশ। গ্যাস বিক্রি থেকে কোম্পানিগুলোর মুনাফার ২০ শতাংশ ডিভিডেন্ট, যা মোট রাজস্বের ২ শতাংশ। গ্যাসের ওপর যে সম্পদমূল্য আরোপ করা হয়েছে, তা থেকে ১৬ শতাংশ ও গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ) থেকে প্রায় ৫ শতাংশ।
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকার যদি ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক না নেয়, তাহলেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর দরকার হয় না। সাধারণত যেসব পণ্য ব্যবহারে সরকার নিরুত্সাহিত করতে চায় সেগুলোর ওপরই সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়।
এর আগে ২০১৫ সালে ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবাসিকসহ কয়েকটি শ্রেণির গ্রাহকের গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। তখন দুই চুলার বিল ৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ এবং এক চুলার বিল ৪০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছিল। এছাড়া সব গ্রাহকশ্রেণির ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম সর্বশেষ বাড়ানো হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে।
সূত্র দৈনিক সকালের খবর-১৭-২-১৭
