খন্দকার শরীফ উদ্দিনের (৪০) যমজ সন্তান নিহা (৫) ও নিশাদ (৫)। ৯ মাস আগে পৃথিবীতে এসেছে তাঁর আরেক সন্তান নীরব। স্ত্রী নার্গিস আক্তার, বৃদ্ধ মা হাসিনা বেগম আর তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে ছিল তাঁর সুখের সংসার। পরিবারের ভরণপোষণ ও সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতেন শরীফ। বিদেশ থেকে ফিরে ঋণের কিস্তিতে ট্রাক কিনে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ট্রাকে চালক ও হেলপারের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছুটে চলতেন তিনি। কিন্তু গত বুধবার রাতে পেট্রলবোমার নির্মম ছোবল থামিয়ে দিয়েছে তাঁর সেই ছুটে চলা। গত বুধবার রাতে চাঁদপুরে পেট্রলবোমার শিকার হয়ে পুড়েছেন ট্রাকমালিক শরীফ। তিনি এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, যেকোনো মুহূর্তে নিভে যেতে পারে শরীফের জীবন-প্রদীপ। তবে মৃত্যুপথযাত্রী শরীফের কাছে নেই তাঁর পরিবারের কেউ। আত্মীয় আবুল কালাম আজাদ শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘যশোরে গ্রামের বাড়ি। এত দূর থেইকা বউ-বাচ্চারে আনা যাচ্ছে না। জানি না, আর দেখতে পারব কি না!’
শরীফের সঙ্গে দগ্ধ হয়েছেন ট্রাকের হেলপার রুবেল হোসেন (২০) ও গরুর রাখাল খোরশেদ আলম (৩৫)। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁদের অবস্থাও সংকটাপন্ন। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত রুবেলের চাচা আনিসুর রহমান ছাড়া তাঁদের স্বজন বলতে কেউই ছিলেন না বার্ন ইউনিটে। শরীফ উদ্দিনের বেয়াই আজাদ ও রুবেলের চাচা আনিসুরই তিনজন রোগীর জন্য ছোটাছুটি করছিলেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল কালের কণ্ঠকে জানান, আগুনে শরীফের শ্বাসনালিসহ শরীরের ৮৮ শতাংশ পুড়ে গেছে। রুবেলের শরীরের ২৫ শতাংশ এবং খোরশেদের ৩৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাঁদের দুজনেরও শ্বাসনালি পুড়েছে। এ কারণে তাঁরাও আশঙ্কাজনক। রুবেল ও শরীফকে বার্ন ইউনিটের চতুর্থ তলায় ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।
পার্থ শংকর পাল আরো জানান, চাঁদপুরে আক্রান্ত এই তিনজনসহ গতকাল পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে নাশকতায় দগ্ধ ২৮ রোগী চিকিৎসাধীন ছিল। এখন পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের শিকার ১৭৯ জন রোগী ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিয়েছে।
দগ্ধ শরীফের বাবার নাম খন্দকার শাহাব উদ্দিন। তাঁর বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছার বারাকপুরে। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে শরীফই বড়। তিনি মা, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকতেন।
দগ্ধ রুবেলের চাচা আনিসুর রহমান জানান, শরীফ, রুবেল, খোরশেদ ও চালক জাহাঙ্গীর মণ্ডল যশোর থেকে ট্রাকে গরু বোঝাই করে চট্টগ্রামে যান। সেখানে গরু রেখে ফেরার পথে কাগজের রোল নিয়ে খুলনায় যাচ্ছিলেন তাঁরা। বুধবার মধ্যরাতে চাঁদপুরের চান্দ্রা এলাকায় তাঁদের ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলা চালায় অবরোধকারীরা। এতে ট্রাকের চালক জাহাঙ্গীর ঘটনাস্থলেই পুড়ে মারা যান।
আনিসুর আরো জানান, ট্রাকের হেলপার রুবেল যশোরের ঝিকরগাছার ট্রাকচালক গোলাম মোস্তফার ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে ছোট রুবেল বাবাকে সহায়তা করতেই ট্রাকে হেলপারের কাজ নেন। তাঁর বড় ভাই ফারুক স্থানীয় একটি কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে পড়েন। এদিকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত দগ্ধ খোরশেদের কোনো স্বজন বার্ন ইউনিটে পৌঁছায়নি। আনিসুর রহমান ও আবুল কালাম আজাদ জানান, ট্রাকে করে নেওয়া গরুগুলোর রাখাল খোরশেদ। তাঁর বাড়ি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার দারকি গ্রামে। যশোরের শার্শা উপজেলার বাগাচরা এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকেন খোরশেদ। তাঁর বাবার নাম মৃত সুলতান বিশ্বাস। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছোট।

