
শওকত আলী ঃ
চাঁদপুর দলিত নারীদের বর্তমান পুরুষ শাষিত সমাজে ও তাদের নিজেদের সামাজিক অবস্থান থেকে তারা উপেক্ষিত হচ্ছে বলে লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা এ দেশের সব ধর্মের মানুষের কাছে সমান মর্যাদা পচ্ছে না বলে আলোচনায় উঠে আছে। এছাড়া তারা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার কাছে ও সর্বক্ষেত্রে সঠিক ভাবে তাদের মূল্যায়ন হচ্ছে না বলে দলিত নারী ও দলিত সম্প্রদায়ের সাথে জিজ্ঞাসাবাদে তা বুঝা যায়। দলিত নারীরা এদেশের বহু ধর্মীয় মানুষের কাছে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেই। তাছাড়া দলিত সমাজের পুরুষদের নিকট থেকেও তাদের অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চাঁদপুরে অবস্থানরত দলিত হরিজন নেতা অনেকের সাথে ব্যাপক আলোচনা ও জিজ্ঞাসাবাদে ও দলিত নারীদের অনেকের সাথে তাদের মনের কথা জানতে চেয়েও তাদের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে জানতে চেয়ে জানা যায়, তারা আমাদের এদেশে স্বাধীন ভাবে বাঁচার যে অধিকার রয়েছে তা থেকে বঞ্চিত। তারা তাদের নিজেদের ইচ্ছেমতো সর্বক্ষেত্রে সর্বস্থানে যেতে বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। দলিত নারীদের সাথে মুসলিম ধর্মাবলম্বী ও সনাতন ধর্মীয়সহ অন্য ধর্মের নারীরা এক হয়ে চলাচলে তাদের মর্যাদা দিচ্ছে না। তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। দলিত নারী এ সমাজের অন্য নারীদেরমতো জীবন যাপন করতে পারছেনা, তারা অবহেলার শিকার। তাদেরকে দিয়ে শুধু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজটুকু করা হয়ে থাকে। এদের অন্য কাজে বা পেশায় নিয়োজিত করা হয় না। অন্য নারী যখন সংসার ধর্ম, স্বামী সন্তানদের নিয়ে ব্যাস্ত থাকে তখন তারা কঠোর রোদ ও বৃষ্টি উপেক্ষ করে নিজে কষ্ঠ শিকার করে কাজ করতে হয়। এছাড়া তারা যে শ্রম দিচ্ছে তার ন্যার্য্য মজুরী পাচ্ছে না। তারা সামান্য অর্থ দিয়ে সংসার জীবন যাপনে হিমশিম খেতে হয়। অনেকে কঠোর শ্রম দিয়ে কাজ করেও দু’বেলা সন্তানদের নিয়ে তাদের আহার জুটছেনা। অদ্যহারে অনাহারে জীবন কাটিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে অনেক দলিত নারী বর্তমান এ সময়ে কঠিন প্রতিযোগীতার বাজারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নের কাজটুকুও অনেক ক্ষেত্রে পাচ্ছে না। অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরা সে কাজ নিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে আবার এ কাজ করতে চাকুরী নিতে মোটা অংকের উৎকোচ পর্যন্ত দিতে হয় বলে হরিজন নেতারা জানান। শিক্ষিত নারীরা অনার্স ও বি.এ. পাশ করে চাকুরী পাচ্ছেনা। তারা বেকার জীবন যাপন করে অভিভাবকের বোঝা হয়ে থাকতে হচ্ছে। কেউ কেউ উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে নিন্ম চাকুরী করছে বলে তারা জানান। তাদের মর্যাদা ও শিক্ষা থাকা সত্বেও যোগ্যতাপূর্ণ চাকুরী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর পেছনে একমাত্র কারণ বৈষম্য বলে চিহ্নিত করে বলেন দলিত ও হরিজন নেতারা।
দলিত নেতারা বলেন, সারাদেশেই দলিত নারীরা সামাজিক ভাবে অবহেলিত। দলিত নারীরা এদেশের সমাজ ব্যবস্থা ছাড়াও তাদের নিজেদের সংসার জীবনেও পুরুষের কাছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার হন বলে জানাগেছে। দলিত হরিজনদের নিজেদের যে সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে নরীরা অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের যে পঞ্চায়েত কমিটি রয়েছে, সেখানে দলিত নরীদের সংযুক্তি নেই। পুরুষরা পঞ্চায়েত কমিটিতে যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা তারা মেনে নিতে হয়। নিজেদের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি হলে যে বিচার আচার করা হয় সেখানে সিদ্ধান্তে নরীদের অংশগ্রহণ রাখা হয় না। নারীদেরকে বিচারে শালিস হিসেবে রাখা হয় না। নারীরা শুধু বিচার আচারে উপস্থিত থেকে নিরবে একতরপা বিচার মেনে নিতে হয়।
একজন নারী ও পুরুষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিচারে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ছেলে ও মেয়ে অপরাধ করলেপিতা মাতাকে শাস্তি গ্রহণ করতে হয়। তাদেরকে ১ বা ২ বছর এক ঘরোয়া করে রাখা হয়। কেউ তাদের সাথে সম্পর্ক রাখে না। অনেক সময় বিচারক বা সমাজ প্রধানদের গোপনে অর্থ দেওয়া হলে বিচারের রায় পুণরায় বিবেচনা করে শাস্তি কমিয়ে দেওয়া হয় বলেও তারা জানান।
দলিত নারীরা বহিঃ যোগাযোগে তাদের অধিকার পচ্ছে। তারা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় এবং চাঁদপুরে সর্বক্ষেত্রে যোগাযোগের স্বাধীনতা রয়েছে। এরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশে পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং যাচ্ছেও। দলিত নরীরা বহিঃ যোগাযোগে তাদের স্বাধীনতা পাচ্ছে বলে তাদের নেতারা জানান। এক্ষেত্রে তাদের কোন বাঁধা নেই বলে জানা যায়। তবে তারা এ যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিজেদের ইচ্ছে মতো জীবন সঙ্গীনি নিতে পারছেনা। তাদের নারীদের একক সিদ্ধান্ত তাদের সমাজ মেনে নেয় না। সমাজ ব্যাবস্থার মাধ্যমে আলাপ আলোচনার মধ্যে থেকে বিবাহ বন্ধনে যেতে হয়। বিবাহ বিচ্ছেদ হলে কোর্ট কাচারী ও থানায় যেতে হয় না। দলিতদের সমাজ উন্নয়ন সংস্থার প্রধানের মাধ্যমে সামাজের অন্যদেরকে নিয়ে যে রায় বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তা মেনে নিতে হবেই। কোন কারনে হাজারে বা লাখে দু’একটি ঘটনা যদি কোর্ট কাচারী (আদালত) বা থানায় যায়, তা তারা পরবর্তীতে নিজেদের মধ্যে এনে মিমাংসা করে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
হরিজন সমাজ উন্নয়ন সংস্থ্যার চাঁদপুর জেলার সভাপতি আকাশ দাস জানান, পঞ্চায়ত কমিটিতে নারীদের সংযুক্তি নেই। এছাড়া বৃহত্তর সংগঠনের তাদের সংযুক্তি রয়েছে। হরিজন ঐক্য পরিষদ, হরিজন সমাজ উন্নয়ন সংস্থ্যা, বৃহত্তর সংগঠনের মধ্যে থাকা ছোট ছোট গ্রুপ করে দেওয়া কমিটিতে তাদের অবস্থান রয়েছে। তারা সেখানে তাদের ভূমিকা যথাযাথ ভাবে পালনও করে যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের জন্য যে কোন সমস্যা হলে সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নারীদের অংশগ্রহণ থাকে। তাদের ওই সিদ্ধান্তে তাদের মতামতের মূল্যায়ন করা হয়। আমাদের মধ্যে সম্প্রদায়ের এক নারী আছে সে হচ্ছে রাধা রাণী। তিনি বিদেশ ভ্রমন সহ বিভিন্ন যোগাযোগ করে থাকেন। এছাড়া হরিজন সমাজ উন্নয়ন সংস্থ্যার সিবিও সংগঠনের কার্যক্রমের জন্য এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে নারীরা সিবিও ফোরামে ভূমিকা রাখে। এলাকার মধ্যে বা বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার জন্য নারীদের স্বাধীনতা থাকে। তারা নিজেদের মনমতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষা অর্জনে তাদের জন্য কোন বাঁধা নেই। তারা স্বাধীনমতো পড়াশুনা করতে পারে। চাঁদপুরে দলিত নারীরা স্বাধীন ভাবে শিক্ষা অর্জন করে উচ্চ শিক্ষিত হলেও তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্ম পায়নি। তারা অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে উচ্চ আসনে যেতে পারছেনা। তাই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী অবস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
হরিজন সমাজ উন্নয়ন সংস্থ্যার চাঁদপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক হিরা সরকার মুন্না জানান, পঞ্চায়ত কমিটিতে নারীর সংযুক্তি না থাকলেও উন্নয়ন কর্মকান্ডে দলিত নারীদের সব জায়গায় অবস্থান রয়েছে। সংসার থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত কমিটির কার্যক্রম পর্যন্ত তাদের রাখা হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহনে নারীদের ভূমীকা ও মতামত নিয়ে সকল কাজ করা হয়। পুরুষ নারীর একই মতামত আমাদের সমস্যা আমরাই শেষ করি। যাতে কোর্ট কাচারী ও থানা পুলিশের কাছে যেতে না হয়। বিচারের সময় নারীর সম্পৃক্ততা থাকে। সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী দলিত নারীরা দলিত সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগ রেখে চলে। ভ্রমন ও তীর্থ ভ্রমনের জন্য নারীরা বাংলাদেশের বাহিরে যায়। চাঁদপুরের দলিত নারীরা উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরী পায় না। আমাদের এলাকায় ডিগ্রী অনার্স পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন করা নারী রয়েছে।
চাঁদপুর রেলওয়ে হরিজন কলোনির শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মহাবীর মন্দীরের সাধারণ সম্পাদক বিধান চন্দ্র দাস (জনি) জানান, চাঁদপুর জেলায় দলিত হরিজনদের মধ্যে পূর্বের মতো নারীদেরকে অবহেলিত করার যে পন্থা ছিলো, তা এখন বিলীন বললেই চলে। বর্তমানে চাঁদপুরে দলিত নারীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অনেক সচেতন। সংসারের সমস্যা জনিত জীবনের মধ্যে প্রথমতো স্বামীর সাথে তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সর্বদা সহযোগীতা করে থাকে। সমাজের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নারীদের সু-শৃঙ্খল অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায়। পূজা ও অর্চনা সহ বিভিন্ন সামাজিক বিচারিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহনে তাদের নৈতিকতা ও বাস্তবিক ভাবে কাজ করে যাচ্ছে চাঁদপুর জেলার দলিত নারীরা। পঞ্চায়েতে তাদের সংযুক্তি সহ সংরক্ষিত আসন রয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহনে পুরোপুরি ভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ না থাকলেও বর্তমানে তাদের অংশগ্রহনের অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে পুরোপুরি হবে বলে আমার বিশ্বাস। বহিঃ যোগাযোগে দলিত নারীদের চাঁদপুর জেলায় তেমন কোন স্পষ্ট যোগাযোগ লক্ষ করা যায় না। তবে আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জেলার মধ্যে অন্তত ৫০টি জেলার সাথে নারীদের যোগাযোগ রয়েছে।
চাঁদপুর জেলা রবি দাস সম্প্রদায়ের সভাপতি নারায়ন রবি দাস জানান, পঞ্চায়েত কমিটিতে নারীদের অবস্থান নেই। সেখানে পুরুষদের অবস্থান রয়েছে। বিচার আচার আমারা পুরুষরাই করি। কোর্টে যেতে হয় না। বিয়ে সাদি ও নারী গঠিত কোন সমস্যা হলে নিজেরা ব্যবস্থা গ্রহন করে থাকি। এভাবেই করে যাচ্ছি। সামাজিক ভাবে সব সমস্যার মিমাংসা করে থাকি। কোর্টে বা থানায় যেতে দেইনি আমরা। নিজেরা বসেই সমাধান করি। যদিও কোন সময় মামলা হয়, তাহলে উভয় পক্ষকে ডেকে মিমাংসা করে মিঠিয়ে দেই। সিদ্ধান্ত গ্রহনে নারীদের অংশগ্রহণ থাকে। তখন সব নারীদের উপস্থিত থাকতে হয়। সবাই মিলে সকলের মতামতে সমস্যার সমাধান হয়। শালিস হিসেবে নারীদের পঞ্চায়েত কমিটিতে অংশগ্রহন নেই। কিন্তু তারা উপস্থিত থেকে তাদের সমস্যার কথা বলতে হয়। বাহিঃ যোগাযোগে দলিত নারীদের কোন সুযোগ দেওয়া হয়নি। সব যোগাযোগ নারীদের বাদ দিয়েই করা হয়। যোগাযোগ পুরুষরা করে থাকি, নারীরা পারবেনা তাই তাদের কোন দায়িত্ব দেওয়া হয় না।
পুরানবাজার হরিজন যুব ক্লাবের সভাপতি শ্যামল দাস হরিজন জানান, সমগ্র বাংলাদেশে দলিত নারীরা সামাজিক ভাবে অবহেলিত। কারণ দরিদ্র সীমার মধ্যেই তাদের বসবাস। দলিত পরিবাররা সমাজরে সবচেয়ে অবহেলিত। তাদের সংসার চলে না। বাধ্য হয়ে নারীরা রাস্তা, ড্রেন সহ বিভিন্ন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয়। যে সময় সংসারে কাজ করার কথা তখন তারা রাস্তা, অফিস ও পৌরসভায় কাজ করে থাকে। পঞ্চায়েতে নারীদের কোন অবস্থান বা সংযুক্তি নাই। সিদ্ধান্ত গ্রহনেও নারীদের কোন অংশগ্রহণ থাকে না। তাদেরকে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে রাখা হয় না। ছেলে বা মেয়ে অপরাধ করলে বাবা-মা কে শাস্তি দেওয়া হয়। তাদের এক ঘরোয়া করে রাখা হয়। বহিঃ যোগাযোগে নারীদের স্বাধীনতা দেওয়া হয়। তারা স্বামী বা আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। বিদেশে যেতে পারে এবং এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে কোন বাঁধা নেই। তবে শিক্ষা অর্জন করে বাড়িতে অনেকে বেকার বসে আসে। তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরী পাচ্ছে না। তাদের জন্য মর্যদা সম্পন্ন চাকুরী ব্যাবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন।
