চাঁদপুর নিউজ রিপোর্ট
বিদায় নিলো সাফল্য-ব্যর্থতার বছর ২০১৬। এ বছরটি চাঁদপুরবাসীর জন্য যেমন ছিল অপার সম্ভাবনা ও সাফল্যের, ঠিক তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছিল বিষাদেরও। এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, বিগত অন্য কোনো বছরের তুলনায় এ বছরে জেলার আইন শৃঙ্খলা ছিল অনেকটাই স্থিতিশীল। এর মধ্যেও জেলায় গত এক বছরে খুন, অপমৃত্যু ও দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ১৬১ জন। স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে গত এক বছরে জেলায় মোট খুন হয় ৩৮ জন, অপমৃত্যুতে প্রাণ হারায় ৯০ জন এবং সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৩৫ জন। প্রতিটি মৃত্যুর পরই থানায় মামলা হয় কিংবা হামলা হয়। সেই মামলা-হামলার ভিড়েই হারিয়ে যায় এক একটি তাজা প্রাণ ঝরে পড়ার করুণ ঘটনাগুলো। সংশ্লিষ্ট থানায় ফাইলের পর ফাইলে চাপা পড়ে থাকে মামলার নথিপত্র। আদৌ মামালাগুলো আলোর মুখ দেখবে কিনা তা জানে না নিহতের স্বজনরা।
গত বছর জানুয়ারি মাসে জেলায় খুন হয় ১টি, অপমৃত্যুতে প্রাণ হারায় ৭জন আর সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে ৩ জনের। ৫ জানুয়ারি হাজীগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় আক্তার হোসেন (৩০) নামে এক স্কুটার চালক। ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে একই উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান কামরুল হাসান (২২) নামে আরেক আরোহী। দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ১০ দিনের মাথায় শাহরাস্তির হান্নান (৩৫) নামে আরেক ব্যাক্তির সড়ক দুর্ঘটনায় নির্মম মৃত্যু ঘটে। এ মাসের ২৬ তারিখ চাঁদপুরের পুরাণবাজারে তানজিলা আক্তার নামে এক গৃহকর্মী খুন হয়। এ ঘটনায় পুলিশ ৩ জনকে আটক করলেও পরবর্তীতে তার কোনো সুরাহা হয়নি। জানুয়ারিতে জেলায় ঘটে ৫টি রহস্যজনক মৃত্যু। ১০ জানুয়ারি ফরিদগঞ্জে শাহাদাত হোসেন (১৯), ১৩ জানুয়ারি চাঁদপুরের পশ্চিম রামদাসদী গ্রামের রিয়াদ (১৮), ১৯ জানুয়ারি মতলব দক্ষিণের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী মরিয়ম আক্তার (১৪), ২০ জানুয়ারি হাজীগঞ্জের শারমিন বেগম (২০) এবং ২৪ জানুয়ারি কচুয়ার শাহজালাল (১৭) নামের আরেক যুবক সহ মোট ৫জন আত্মহত্যা করে প্রাণ হারায়। এছাড়াও ১০ জানুয়ারি চাঁদপুর মদনা গ্রামে পানিতে ডুবে নাজনীন নামের ১৮ মাসের এক শিশুর এবং ১৫ জানুয়ারি চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার অভাবে এক বৃদ্ধের করুণ মৃত্যু হয়।
ফেব্রুয়ারি মাসে হাইমচরে ট্রলার ডুবিতে প্রাণ হারান ৭ জন, ৮ ফেব্রুয়ারি মেঘনায় খুন করে ফেলে রাখা হয় অজ্ঞাত এক ব্যক্তিকে। পরদিন পুলিশ ঐ অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। একই দিনে কুমিল্লা বিজ্ঞান কলেজের ছাত্রের লাশ উদ্ধার করে থানা পুলিশ। মাসের শেষ দিন ২৯ তারিখ হাজীগঞ্জেরে ৫নং সদর ইউনিয়নের মাতৈন পূর্ব পাড়া সর্দার বাড়ির বাগানে খুন হন কামরুল (২৭) নামের আরেক যুবক। একই দিন পুলিশ কামরুলের হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে। এ মাসের ৬ ফেব্রুয়ারি ঘটে আরেক মর্মান্তিক মৃত্যু। চাঁদপুর বাগাদী ইউনিয়নে পুলিশের আতঙ্কে সাঁতার না জানা এক যুবক পানিতে ঝাঁপ দেয়। পরবর্তীতে তাকে লাশ হয়ে ফিরতে হয়।
মার্চ মাসে খুন হয় আরও দুইজন। ২৪ মার্চ শাহরাস্তি পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের উপলতা গ্রামে চাচী ও চাচীর প্রেমিকার হাতে প্রাণ হারায় রুমা আক্তার (২২) নামের এক তরুণী এবং মাসের শেষ দিকে ৩০ মার্চ ঘটে গত বছরের একটি আলোচিত হত্যাকা-। ফরিদগঞ্জ ১৫নং রূপসা ইউনিয়নের জামালপুরের মমিন হোসেন বাবুকে রাতের অাঁধারে হত্যা করে পৌরসভার আল মদিনা হাসপাতালের পাশের জামিতে লাশ ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। বাবু হত্যাকা-ের বিচারের দাবিতে একাধিক মানববন্ধন হলেও আজও বের হয়নি এ হত্যার মূল রহস্য। এ মাসে যন্ত্রদানব ট্রাক্টরের চাপায় প্রাণ হারায় ৩জন। ১২ মার্চ চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়কের বাকিলা বাজার এলাকার খলাপাড়া গ্রামের রবিউল (১৫), ১৮ মার্চ হাজীগঞ্জ-রামগঞ্জ সড়কের বেলচোঁ বাজারে শিপন (১৪) নামে এক স্কুল শিক্ষার্থী এবং ৩০ মার্চ হাজীগঞ্জ-কচুয়া সড়কে কাঠালী কদমতলী দোকানঘর এলাকায় সিফাত (৪) নামের এক শিশু প্রাণ হারায়। এ মাসে চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় প্রাণ হারায় ২ শিশু। ৮মার্চ চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে মাত্রাতিরিক্ত ইনজেকশন পুশ করায় ২ মাসের এক শিশু এবং ১৭ মার্চ ফরিদগঞ্জ উপজেলা সদরস্থ ফ্যামিলি কেয়ার ডায়াগনস্টিক এন্ড চেম্বারের কর্ণধার ডাঃ পরেশ চন্দ্র পালের মেয়ে ডাঃ লিপিকা রাণী পালের ভুল চিকিৎসায় এক নবজাতক শিশু প্রাণ হারায়। এছাড়াও ১০ মার্চ মতলব দক্ষিণের নওদা গ্রামের ফকির বাড়িতে রেশমা (১৮) নামে এক গৃহবধূর আত্মহনন, ২০ মার্চ একই উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় অটোরিঙ্া চার্জ দিতে গিয়ে মোস্তাক (৩০) নামে এক ব্যক্তি এবং ১৩ মার্চ ফরিদগঞ্জ পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামে গাছের গুঁড়ির চাপায় এনামুল হক (২৫) নামে আরেক ব্যক্তি মারা যান।
এপ্রিল মাসে মোট খুন হয় ৫টি। ২ এপ্রিল ফরিদগঞ্জে অজ্ঞাত এক নারীকে খুন করে ফসলী জমিত ফেলে রাখা হয়। পরদিন পুলিশ অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে। ১৪ এপ্রিল শাহরাস্তি উপজেলার মেহের উত্তর ইউনিয়নের নয়নপুর বেপারি বাড়িতে মোঃ জামাল হোসেন (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে খুন করে মাটি চাপা দেয় তার পাষ- স্ত্রী ও পুত্র। ঘটনার ১৬ দিন পর কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে থানা পুলিশ। ১৮ এপ্রিল চাঁদপুর সদরের ঘাসিপুর গ্রামের বেপারী বাড়ির সাবিনা বেগম (২২) কে পিটিয়ে হত্যা করে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ২৪ এপ্রিল কচুয়া গোহট উত্তর ইউনিয়নের আইনগিরি কামার এলাকায় স্বামীর পাশবিক নির্যাতনে গুরুতর জখম হয়ে মারা যায় স্ত্রী। এ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ৪জন। ১৬ এপ্রিল চাল ভর্তি ট্রাক নদীতে ডুবে গেলে ২জন মারা যায়। ১৭ এপ্রিল শাহরাস্তি পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডে রাজন হোসেন (২৫) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী এবং ৩০ এপ্রিল ফরিদগঞ্জে ট্রাক্টর চাপায় আব্দুর রশিদ রিয়াদ (১২) নামে আরেক শিক্ষার্থী নিহত হয়। জেলার পৃথক পৃথক স্থানে এ মাসে আত্মহত্যা করে ৫ জন। ২ এপ্রিল ফরিদগঞ্জ সন্তোষপুর গ্রামে আলী হোসেন (৬০) নামে এক বৃদ্ধ বিষপানের মাধ্যমে, ৬ এপ্রিল একই উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের চির্কা চাঁদপুর গ্রামে হেলেনা আক্তার (২৪), ৭ এপ্রিল চাঁদপুর তালতলায় এসএসসি পরীক্ষার্থী সারমিন আক্তার (১৬), ১২ এপ্রিল শাহরাস্তি টামটা দক্ষিণ ইউনিয়নের আলপিুর গ্রামে মোঃ আল-আমিন (১২) এবং ১৫ এপ্রিল প্রবাসী স্বামীর সাথে ঝগড়া করে ফরিদগঞ্জ চররামপুর গ্রামের হিরামনি (২৩) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে প্রাণ হারায়।
গত বছরে জেলায় সর্বোচ্চ খুন হয় মে মাসে। এ মাসে খুন হয় মোট ৮জন। ৪মে মতলব উত্তরের চর কাশিম গ্রামের মনজিল বকাউলের সবজির জমিতে কৃষিকাজজনিত বাকবিত-ায় খুন হয় সাদ্দাম হোসেন নামে এক যুবক। ৭মে শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়নের খেড়িহর গ্রামের রূমা বেগমকে হত্যা করে বাড়ির সেফটিক ট্যাংকে ফেলে দেয় তার পাষ- স্বামী। ৮মে একই উপজেলায় নির্বাচনী সহিংসতায় জামাল হোসেন (২৪) নামে এক যুবক প্রতিপক্ষের হামলায় প্রাণ হারায়। ১৬ মে হাজীগঞ্জে নিখিল চন্দ্র (৪২) নামে আরেক ব্যক্তিকে খুন করে ডাকাতিয়া নদীতে ফেলে রাখা হয়। একই দিন কচুয়ার কালিরপাড়া সড়কের ব্রীজের নিচে আরও এক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে খুন করে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। ২৫মে মাত্র এক হাজার টাকা লেনদেনকে কেন্দ্র করে এক সিএনজি স্কুটার চালক খুন করে আরেক সিএনজি স্কুটার চালককে। ২৭মে হাজীগঞ্জে সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর জখম হয়ে প্রাণ হারান রায়হান নামে আরেক যুবক এবং মাসের শেষ দিন ফরিদগঞ্জ পাইকপাড়ায় কামাল হোসেন (৩২) নামে আরেক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। পুলিশ এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করলেও তার পরিবারের দাবি এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকা-। এ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় হাজীগঞ্জ বাজারস্থ ডাকাতিয়ার দক্ষিণ অংশে বালু মহলের ভেতরে ট্রাক্টর চাপায় প্রাণ হারায় রুবেল হোসেন (৩০) নামে এক যুবক। মে মাসে মোট অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে ৫টি। পহেলা মে কালবৈশাখী ঝড়ে ফরিদগঞ্জের বালিথুবা গ্রামের সামছুন্নাহার (৫৫), একই দিন অজ্ঞান পার্টির খাবারের বিষক্রিয়ায় অজ্ঞাতানামা এক বৃদ্ধ, ৬মে মতলব উত্তরে বজ্রপাতে স্বামী-স্ত্রী ২জন এবং ৮মে ফরিদগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মোঃ মমিন (৩২) নামে এক দিনমজুর নিহত হয়।
জুন মাসে মোট খুন হয় ৭জন। এর মধ্যে ৭জুন চাঁদপুরে যাত্রীবাহী লঞ্চ আবে জম জম-এ কেবিনে এক নারী খুন হয়। ১৫ জুন কচুয়ার দেনাদারের হাতে শহীদ উল্যাহ (৫০) নামে এক ব্যক্তি খুন, ২২ জুন জমি সংক্রান্ত বিরোধে ফরিদগঞ্জ পৌরসভার চরহোগলা মিজি বাড়িতে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, একই দিনে চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়নের নিখোঁজ হওয়ার দু’দিন পর মোঃ নূরুল ইসলাম পাটওয়ারী (২৭) নামে এক ব্যক্তি খুন, ২৬ জুন মতলব উত্তরে পরকীয়ায় বাধা দেয়ায় পুত্রবধূর হাতে শাশুড়ি খুন হয়। ২৮ জুন চাঁদপুরে খুন হওয়া রাসেল (২০) নামের এক যুবকে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ মাসে মোট সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ৩টি। এর মধ্যে ২৩ জুন হাজীগঞ্জে ট্রাক্টর চাপায় চালক, ২৮জুন কচুয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় হাসান (১০) নামে এক কিশোর এবং ৩০ জুন মতলবে সিএনজি স্কুটার দুর্ঘটনায় চালক নিহত হয়।
জুলাই মাসে খুনের পরিমাণ কমলেও বেড়েছে অপমৃত্যুর সংখ্যা। এ মাসে খুন হয় একটি। ২৩ জুলাই চাঁদপুর মধ্য শ্রীরামদী কবরস্থানের রাসু তালুকদার নামে এক ব্যক্তিকে পার্শ্ববর্তী কবর স্থানে ফেলে রাখা হয়। এ মাসের ১১ তারিখ সড়ক দুর্ঘটনায় চাঁদপুর পুরাণবাজারে সিএনজি স্কুটার চালক প্রাণ হারায়। অপমৃত্যুতে প্রাণ হারায় মোট ১৩ জন। এর মধ্যে ৯ জুলাই শাহরাস্তিতে পানিতে ডুবে এক শিশু, ২০ জুলাই মতলব উত্তরে সাপের কামড়ে আমেনা খাতুন (৫০) নামে এক বৃদ্ধা, ২৪ জুলাই মতলব পৌরসভায় বিয়ের ৯দিনের মাথায় স্ত্রীর আত্মহনন, ২৫ জুলাই সাপের কামড়ে আলমাছ সর্দার (৭০) নামে এক বৃদ্ধ, ২৬ জুলাই হাজীগঞ্জে মোবাইল ফোন না পেয়ে অপূর্ব (১২) নামে এক কিশোরের আত্মহনন, ২৮ জুলাই শাহরাস্তিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ২জন, পানিতে পড়ে ২জন, ২৯ জুলাই মতলব ও কচুয়ায় বজ্রপাতে দু’জন এবং শাহরাস্তিতে পানিতে পড়ে দু’শিশুর করুণ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
আগস্ট মাসে খুন হয় আরও চার ব্যক্তি। ৮ আগস্ট চাঁদপুর শহরে মুক্তা বেগম নামে গৃহবধূ রহস্যজনকভাবে খুন হয়। ১৩ আগস্ট কচুয়ার জেরিন আক্তার (২৫) নামে এক গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা, হাজীগঞ্জে মনোয়ারা নামে এক গৃহবধূ খুন হয় এবং ৩১ আগস্ট চাঁদপুর বড়স্টেশন ক্লাবে অটোবাইক চালকের ঘুষিতে প্রাণ হারায় আরেক রিঙ্া চালক। এ মাসের ৭ তারিখ ইভটিজারদের অত্যাচার সইতে না পেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে শাহরাস্তির এক স্কুল ছাত্রী। আগস্ট মাসে মোট অপমৃত্যুর ঘটনায় মারা যায় ৮জন। ঘটনাগুলো হলো পানিতে পড়ে ফরিদগঞ্জের শামীম নামে ২ বছরের শিশুর করুণ মৃত্যু, ২০ আগস্ট সাপের কামড়ে মিনহাজ (৭) নামের আরেক শিশুর মৃত্যু, ২১ আগস্ট মতলবে ঝড়ে গাছের চাপায় শিশুর মৃত্যু, ২৮ আগস্ট কচুয়ায় পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যু এবং ২৯ আগস্ট শিক্ষকের কটুক্তিতে চাঁদপুর বাগাদীতে সাথী নামের এক শিক্ষার্থীর আত্মহনন।
সেপ্টেম্বর মাসে চাঁদপুর জেলায় খুন হয় আরও ৪ জন। এর মধ্যে ৪ সেপ্টেম্বর ফরিদগঞ্জের চরঃদুখিয়া ইউনিয়নে ছুরিকাঘাতে কাঞ্চন (২৫) নামে এক যুবক খুন হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর হাজীগঞ্জ বাজারের রওশন সুপার মার্কেটের নৈশ প্রহরী মোঃ আলম (৫৪) নামে এক যুবককে গলায় ফাঁস দেয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। কিন্তু পরিবারের দাবি ছিল এটি ছিল পরিকল্পিত আত্মহনন। ১৭ সেপ্টেম্বর তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুত্রকে না পেয়ে পিতার উপর প্রতিপক্ষ হামলা চালিয়ে খুন করে। এ মাসের ৫ তারিখ জ্বালানি তেলের দোকানে আগুন লেগে চাঁদপুর শহরে প্রাণ হারায় ৫ ব্যক্তি। ২৩ সেপ্টেম্বর শাহরাস্তিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ইসলামী যুবসেনার তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক মারা যান। একই মাসে অপমৃত্যুতে প্রাণ হারায় মোট ১১ জন। এর মধ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর চাঁদপুর কালেক্টরেট স্কুলের এক শিক্ষার্থীর বজ্রপাতে মৃত্যু, ১৯ সেপ্টেম্বর মতলবে পানিতে ডুবে এক শিশুর করুণ মৃত্যু, ২১ সেপ্টেম্বর মতলব উপজেলার দীঘলদী গ্রামে বিষপানে মফিজ (২৫) নামে আরও একজনের মৃত্যু, ২২ সেপ্টেম্বর কচুয়ার সাচার বাজারে দোকানের এক কর্মচারীর আত্মহত্যা, ২৪ সেপ্টেম্বর স্বপন চন্দ্র সাহা নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার, একই দিন মাইন উদ্দিন নামে আরেক ব্যক্তি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু বরণ এবং ২৫ সেপ্টেম্বর মতলবে পানিতে পড়ে মুশফিক নামের এক বছরের এক শিশুর মৃত্যু ঘটে।
খুন, দুর্ঘটনা ও অপমৃত্যুতে গত বছরে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারায় অক্টোবর মাসে। এ মাসে মোট প্রাণ হারায় ২৩ জন। এর মধ্যে খুন হয় ৬ জন, দুর্ঘটনায় ৩ জন এবং অপমৃত্যুতে ১৪ জন। খুন হওয়া ঘটনাগুলো হলো : ১৮ অক্টোবর হাজীগঞ্জ উপজেলার গন্ধর্ব্যপুর ইউনিয়নের পাথৈর গ্রামের হামিদ মোল্লা তার স্ত্রী মরিয়ম বেগম (৩৮) কে লঞ্চ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা, ১৯ অক্টোবর কচুয়ায় দুই ব্যক্তিকে হত্যা করে রাস্তার পাশে ফেলে যাওয়া, ২৬ অক্টোবর ফরিদগঞ্জ কালিরবাজারে এক নবজাতক সন্তানকে হত্যা করে রাস্তার পাশে পাষ- মায়ের ফেলে যাওয়া এবং ২৮ অক্টোবর মতলবে সালিশে প্রতিপক্ষের হামলায় হাফেজ আলী (৭৫) নামের এক বৃদ্ধ খুন হওয়ায়। ৩টি দুর্ঘটনায় ৫ অক্টোবর হাজীগঞ্জ ট্রাকের চাপায় পিষ্ট হয়ে এক মোটরসাইকেল আরোহীর করুণ মৃত্যু, ১৯ অক্টোবর মতলব দক্ষিণ উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় সাবেক মাদ্রাসা অধ্যক্ষ আব্দুল হাই (৭০) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু এবং ২২ অক্টোবর হাজীগঞ্জে ট্রাক্টর চাপায় আকলিমা (৩) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। এছাড়াও এ মাসে আত্মহত্যা, পানিতে ডুবে এবং লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে প্রাণ হারায় আরও ১৪ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ১৩ অক্টোবর ফরিদগঞ্জের আকিব নামে এক কলেজ শিক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু।
নভেম্বর মাসে খুন হয় আরও ৩ জন। ৩ নভেম্বর মতলবের বাক প্রতিবন্ধী সাথী আক্তারকে হত্যা করে ঘরের পেছনে আমগাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখা, ২০ নভেম্বর ফরিদগঞ্জ প্রত্যাশী গ্রামে হোসেন মিজি (৩৮) নামে এক ব্যক্তি খুন, অতঃপর পরদিন পার্শ্ববর্তী পুকুর থেকে লাশ উদ্ধার এবং ২৩ নভেম্বর মতলবের উপাধি উত্তর ইউনিয়নের মোঃ সোহেল হোসেন (৩০) নামের এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ মাসের ৬ তারিখ হাজীগঞ্জ কাকরৈতলা জনতা কলেজের অধ্যক্ষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান, ১৮ তারিখ কচুয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় রিফাত হোসেন (৭) নামের এক শিশুর মৃত্যু ঘটে, ২৩ তারিখ কচুয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন মনির হোসেন মিজি নামে আরও এক ব্যক্তি এবং ২৪ নভেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ইসমাইল হোসেন (১৮) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী। এছাড়াও এ মাসে বিভিন্ন অপমৃত্যুতে মারা যায় আরও ১০ জন।
ডিসেম্বর মাসে কোন খুনের ঘটনা না ঘটলেও ৩ তারিখে ফরিদগঞ্জে অটোরিঙ্ার চাপায় প্রাণ হারান ইসমাইল হোসেন (১৯) নামে এক ব্যক্তি। এ ছাড়াও মাসের ১৪, ২২ ও ২৬ তারিখ পৃথক পৃথক স্থানে আত্মহত্যা করে মারা যায় আরও ৫ জন।
মাসের পর মাস লাশের বোঝা বাড়লেও বাড়ছে না বিচারের সংখ্যা। বছর শেষে এ ১৬৭টি লাশের কথা হয়তো মনে থাকবে না অনেকের। কিন্তু স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব যে সকল পরিবার তারা কি ভুলতে পারবে এ যন্ত্রণা? যার চলে যায় সেই বুঝে হয় বিচ্ছেদের কী যন্ত্রণা। তাই নতুন বছরটিতে আর যেন কোন লাশের মিছিল দেখতে না হয়, আর যেন কোন মায়ের বুক খালি না হয় এমনটাই কাম্য সকলের।
