শওকত আলী,
চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথের ৫৭ কি.মি. এলাকার ১শ’ ৭৭ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ ৪ বছরেও শেষ হয়নি। সংস্কার কাজ আবারও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। গত শনিবার পর্যন্ত হাজীগঞ্জ এলাকায় কাজ চলাকালীন অবস্থায় হঠাৎ করে কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা দেয়। এ ব্যাপারে কালিন্দি কোম্পানীর ঠিকাদার জানান, অর্থ সংকট ও লোকবলের কারণে চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথের কাজ যে কোন মুহুর্তে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যে উক্ত কাজের ৬০ ভাগ শেষ হতে সময় লেগেছে ৪ বছর। বাকী ৪০ ভাগ যথা সময়ে শেষ হওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে সন্দেহ। এখনও ৪টি স্টেশন ভবনের ও ১১টি পয়েন্টের কাজ শুরু করা হয়নি। ভারতীয় কালিন্দি কোম্পানীর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ দিন যাবত এ পথের কাজ আরম্ভ হওয়ার পরও এ পর্যন্ত ৬ বার বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ভারতীয় এ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় এ রেলপথের কাজ ডিমেতালে চললেও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ উপ-প্রকৌশলী কুমিল্লা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মৈশাদী, ওয়ারুক, শাহরাস্তি ও চাঁদপুর স্টেশন ভবনের কাজ নতুন করে করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সকল কাজ কবে নাগাদ শুরু করার হবে, তা শু নির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারছে না। এ বছরের জুন মাসের মধ্যেই পুরো কাজ শেষ করার সময় বেধে দিয়েছিল রেলওয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এ কাজ শেষ হওয়ার পর ৫৭ কি.মি. রেলপথ অতিক্রম করতে যেখানে ২ ঘন্টা সময় লাগতো, সেখানে মাত্র ৪৫ মিনিট সময় লাগবে। চাঁদপুর লাকসাম রেলপথের উন্নয়নে সরকারের একনেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালে ১শ’ ৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। চাঁদপুর জেলা তথা দক্ষিণ অঞ্চলীয় হাজার হাজার যাত্রী এ পথে প্রতিদিন যাতায়াত করে থাকে। যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ও সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যে এ পথের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেন সরকার। বৃটিশ শাসন আমলে প্রায় ২শ’ বছর পূর্বে এ রেলপথ স্থাপন করা হয়। সেই সময় থেকে এ পথের উন্নয়নে কোন বড় ধরনের সংস্কার করা হয়নি। বর্তমানে এ সংস্কারের লক্ষ্যে রেলপথ, ব্রীজ, স্টেশন ভবন ও ডিজিটাল পদ্ধতির সিগনাইলের কাজ হাতে নেয় বিগত ২০১২ সালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এ ৫৭ কি.মি. কাজের দায়িত্ব পান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ভারতীয় কালিন্দি কোম্পানি। এ কোম্পানি ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি এ কাজ শুরু করে হাজীগঞ্জ এলাকা থেকে। ১ বছরের মধ্যে ২০১৩ সালের ৩০ জুন এ কাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। ভারতীয় কোম্পানির জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় ৪ বছরে ৬ বার কাজ শুরু করে, আবার বন্ধ করে রাখে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, এ পর্যন্ত এ কোম্পানি কে কাজের সময়সীমা ৫ বার বর্ধিত করে দেওয়া হয়। প্রশাসনিক জটিলতা ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের গাফলতির কারণে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ ছিল। এ কাজ আগামী ১ বছরেও শেষ হবে কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এছাড়া এ পথের ৫৮টি ব্রিজের কাজ চলছে সম্ভুক গতিতে। রেলওয়ে চট্রগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মফিজুর রহমানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১৪ সালে কালিন্দি কোম্পানি নিজেরা কাজ করতে না পারায়, এ দেশীয় কোম্পানি চট্টগ্রাম আজমাইন ট্রেড ইন্টার ন্যাশনাল কোম্পানির নিকট কাজটি বিক্রি করে দেয়। সেই কোম্পানি ২ বারই কাজ শুরু করে বন্ধ করে দেয়। অবশেষে ভারতীয় কোম্পানি তাদের বিরাট অঙ্কের জামানতের অর্থ ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পুনরায় কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই মতে গত এক সপ্তাহ যাবত এ পথের উন্নয়ন কাজ চলছে। পুরাতন রেলপথ খুলে ফেলে দিয়ে, নতুন কংক্রিট স্লিপার বসিয়ে ৭৫ পাউন্ড ওজনের রেলপাত স্থাপন করা হচ্ছে। এর পূর্বে ৬০ পাউন্ড রেলপাত ছিল এ পথে। এ পথে বর্তমানে ট্রেন চলাচল করছে ২৫/৩০ কি.মি. গতিতে। পুরো কাজ শেষ হলে ট্রেন চলাচল করবে ঘন্টায় ৭২/৭৫ গতিতে। এতে সময় বাচবে সোয়া ১ ঘন্টা। ২ ঘন্টার স্থলে লাগবে ৪৫ মিনিট। এ তথ্য দিয়েছেন এ পথের দায়িত্বরত কর্মকর্তা এস.এস.এ ই/ পথ মো. লিয়াকত আলী মজুমদার। এতে এক দিকে যাত্রী ভোগান্তি যেমন বাড়ছে তেমনি রাজস্ব হারাচ্ছে রেল বিভাগ।
রেলওয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ১ বছরের স্থলে এ কাজ করতে ৪ বছর সময় লেগে যাওয়ায়, রাস্তার কিনারে পড়ে থাকা রেলপাতগুলো অনেকাংশে মাটিতে পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে।
স্বাধীনতার পূর্বে ও পর থেকে এ রুটে কোন উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়নি। যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ পথে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হচ্ছে। রেলপথটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথের অধিকাংশ স্থানে পাথর নেই। রেলপথের সাইড লাইন ছায়াবানি এলাকা থেকে সিএসডি গোডাউনের প্রবেশকৃত রেলপথ সংস্কার বা লাইন পরিবর্তন না করায় রেলপথ মাটির নিচে ঢুকে গেছে। এছাড়া ৩নং ও ৫নং ঘাট এলাকায় বিভিন্ন স্থান থেকে আসা তৈল জাতীয় পদার্থের গাড়ি গুডস অফিসে প্রবেশের পথে যে রেল পথ রয়েছে, তা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মালবাহী গাড়ি প্রবেশে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। মাঝেমধ্যে লাইন থেকে মালবাহী বগি পরে গিয়ে পথচারীদের জীবন হারানোর উপক্রম হয়ে পড়েছে বিগত দিনে।
এ রেলপথে ৫৭ কি.মি. এলাকার ব্রিজের কাজ করার সময় অবিরাম বৃষ্টিতে ব্রিজের গোড়ায় পানি জমে রেলপথ ঢেবে গিয়ে ঝুঁকি বিরাজ করছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বালির বস্তা ও পাথর ফেলে, রেলপাথ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা করেছে। রেলপথের কয়েকটি স্টেশন এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে রেলপথ সংলগ্ন স্থান থেকে মাটি কাটার ফলে এ পথ আরও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

