চাঁদপুর থেকে লাকসাম পর্যন্ত রেলপথের দৈর্ঘ্য ৪৮ কিলোমিটার। এই রেলপথে বৈধ ও অননুমোদিত রেলক্রসিং আছে ৩০টি। এর ২০টিই অননুমোদিত। বৈধ ক্রসিংয়ের মাত্র কয়েকটিতে সিগন্যাল বাতি কিংবা গার্ড আছে। ক্রসিংগুলোর বেশ কয়েকটি পড়েছে বাঁকে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ট্রেনযাত্রী ও পথচারীদের জীবন। প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, ঘটছে প্রাণহানি।
রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, চাঁদপুর থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার উদ্দেশে চারটি করে ট্রেন ছাড়ে। এর মধ্যে দুটি এক্সপ্রেস ট্রেন ও দুটি কমিউটার ট্রেন। এই পথে ট্রেনের নিয়মিত যাত্রী ও রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হিসাবে চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথে প্রতি দেড় কিলোমিটার পর একটি ক্রসিং রয়েছে। অননুমোদিত ক্রসিংগুলোর ওপর দিয়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে যানবাহন ও পথচারী চলাচলের কারণে এ পথে ট্রেন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। প্রতি মুহূর্তে থাকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। তাই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধে যত দ্রুত সম্ভব অননুমোদিত ক্রসিংগুলো বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
২১ ডিসেম্বর লাকসাম যেতে যাত্রী হিসেবে চাঁদপুর থেকে কুমিল্লাগামী ডেমু কমিউটার ট্রেনে চড়া। সকাল ১০টায় ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হয় একটানা হুইসেল। খানিক পরপর কমতে থাকল ট্রেনের গতি। কারণটি পরিষ্কার করলেন যাত্রীরা। তাঁদের একজন শফিউল হক বললেন, সামনে রেলক্রসিং থাকলে গতি কমানো হয়। সপ্তাহ দুয়েক আগে হাজীগঞ্জ স্টেশন পার হওয়ার পর একটি ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার দুজন যাত্রী নিহত হন। গুরুতর আহত হন তিনজন। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো দুর্ঘটনা লেগেই থাকে।
টানা হুইসেলে বিরক্তি ভাব পেছনের বগির প্রায় সব যাত্রীর চোখেমুখে। হাজীগঞ্জ স্টেশনের আগে হঠাৎ ট্রেন থেমে গেল। যাত্রীদের হইচই-হট্টগোল। ‘এক নারী ট্রেনে কাটা পড়েছে’—এমন কথা শোনা গেল। ট্রেন থেকে নেমে দেখা গেল, লোকজন ট্রেনের নিচে স্লিপারের ওপর সমান্তরালভাবে শুয়ে থাকা এক নারীকে টেনে বের করে আনার চেষ্টা করছেন। স্লিপারে সমান্তরাল শুয়ে থাকায় বেঁচে যাওয়া ওই নারী কিছুতেই বের হতে চাইছেন না। তিনি আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে রেললাইনে শুয়ে ছিলেন। ট্রেনের চালক আগেই তাঁকে দেখে ফেলায় ট্রেন থামাতে পেরেছেন।
লাকসাম পৌঁছাতে বলতে গেলে পুরো পথেই ট্রেন চলল ধীরগতিতে,
টানা হুইসেল বাজিয়ে। কুমিল্লা ঘুরে ট্রেনটি আবার এল লাকসামে। লাকসাম থেকে চাঁদপুরে ফিরতি যাত্রা শুরু হলো বেলা ১টা ৪০ মিনিটে। এবার আসন পাওয়া গেল ট্রেনচালকের কক্ষ লাগোয়া বগিতে। কাচের ওপারেই চালক। ফেরার পথে যা চোখে পড়ল তা ভয়াবহ। অননুমোদিত ছোট-বড় ক্রসিংগুলোর বেশ কয়েকটি এমন বাঁকে, যা দূর থেকে বোঝার উপায় নেই। এমনকি বৈধ ১০টি ক্রসিংয়ের অন্তত চারটিতে গার্ডও নেই। রেলক্রসিং পার হয় অটোরিকশা, নছিমন, মিনি ট্রাকসহ বিভিন্ন যান।
আলাপকালে ওই ট্রেনের চালক লোকোমাস্টার ইকবাল হোসেন বললেন, এ কারণে চালককে টানা হুইসেল বাজাতে হয়। আর বাঁকের সামনে হঠাৎ কোনো যানবাহন কিংবা পথচারী পড়ে গেলে দ্রুত গতি কমানোর চেষ্টা করা মানে ট্রেনের যাত্রীদের ঝুঁকিতে ফেলা। এই পথে তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে ট্রেন চালাচ্ছেন। ট্রেনটিতে চালকের সহকারী ছিলেন শাহ আলম।
ইকবাল হোসেন বললেন, ‘অননুমোদিত ক্রসিংগুলোর জন্য আমাদের তো অসুবিধা হয়ই, লোকজনেরও অসুবিধা হয়।’ তাঁর মতে, কমিউটার ট্রেন ছোট হওয়ায় এর শব্দ কম। বাঁক থাকায় ও শব্দ কম হওয়ায় লাইনের ওপর উঠে আসা লোকজন কিংবা যানবাহনের চালকেরা বেশির ভাগ সময় ট্রেন আসছে কি না, তা বুঝতে পারেন না। তাই টানা হুইসেল দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কমিউটার ট্রেনে হাইড্রোলিক ব্রেকের সুবিধা থাকায় এটা দ্রুত থামানো যায়। কিন্তু বড় এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো দ্রুত থামাতে পারে না।
ট্রেনচালক ও রেলওয়ের কর্মকর্তারা বললেন, মেহার থেকে হাজীগঞ্জ পর্যন্ত অননুমোদিত পাঁচটি ক্রসিং সবচেয়ে বিপজ্জনক। এই স্থানগুলোতেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বলাকা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের কাছে, বাকিলা গেট, শাহতলি স্টেশনের কাছে ও মধুরোড স্টেশনের কোলঘেঁষে যে ক্রসিংগুলো আছে, সেগুলোও বিপজ্জনক। নিয়ম অনুসারে স্টেশন থেকে এত কম দূরত্বে ক্রসিং থাকার কথা নয়। হয় এই অবৈধ ক্রসিংগুলো বন্ধ করা হোক, না হলে এলাকার লোকজন এগুলোকে নিরাপদ করতে ব্যবস্থা নিক।
মাত্র ৪৮ কিলোমিটার পথে ৩০টি ক্রসিংয়ের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে চাইলে চাঁদপুর জিআরপির উপপরিদর্শক (এসআই) দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ঝুঁকি তো বটেই। এই পথে আমরা প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর পাই। অননুমোদিত ক্রসিংগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো বন্ধের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব রেল কর্তৃপক্ষের।’
চাঁদপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘এটা অবশ্যই একটা গুরুতর সমস্যা। অবৈধ ক্রসিংয়ের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব প্রকৌশল বিভাগের।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ রেলওয়ের কুমিল্লা অঞ্চলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি ফোন ধরে পরে যোগাযোগ করার কথা বললেও আর সাড়া দেননি।
