মোঃ শিমুল হাছান, ফরিদগঞ্জ ঃ
বিশাল চাকার জটিল প্রযুক্তির ট্রাক্টরগুলো রাস্তায় চলাচলের সময় কখন যে কার উপর গিয়ে উঠে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এদের চাকার নিচে পিষ্ট হলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ইতিমধ্যে ফরিদগঞ্জে পশ্চিম ষোলদানা গ্রামের তফুরা বেগম (৫৫), খুরুমখালী গ্রামের আব্দুর রহিম (৪), বিশকাটালির নাজিমউদ্দিন (১২) সহ বহুসংখ্যক মানুষ এ দানব যানের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে।
কৃষি জমি চাষাবাদে গরুর লাঙ্গলের বিকল্প হিসেবে প্রায় তিন দশক পূর্বে সারা দেশের ন্যায় ফরিদগঞ্জে আবির্ভাব ঘটে ট্রাক্টর নামক যান্ত্রিক লাঙ্গলের। কিন্তু সে কৃষি ট্রাক্টর মাঠের জমিতে খুব একটা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। আবাদি জমি ছেড়ে সে স্থান করে নিয়েছে গ্রামাঞ্চল, শহর ও বাজার কেন্দ্রিক সড়কগুলোতে।
চাষাবাদের জন্য আমদানিকৃত ট্রাক্টরগুলো পরিবহণে রূপান্তরের পর থেকেই গ্রামীণ জনপদে সর্বনাশ ঘটাতে শুরু করে। যদিও তা মাত্রায় ছিল সহনশীল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সময় চাহিদা মেটাতে ট্রাকের চেয়ে ট্রাক্টরের ভাড়া তুলনামূলক কম হওয়ার সুবাদে যেই মাত্র তার সংখ্যাটা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, ঠিক তখনি তা জনসাধারণের কাছে এক অজানা আতঙ্ক রূপে আবির্ভূত হয়েছে।
এ সব ট্রাক্টরের চাকায় পিষ্ট হয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে পাকা রাস্তা। ইটের রাস্তা হচ্ছে চূর্ণ-বিচূর্ণ। গ্রামের মেঠো পথগুলোর মাটি আলগা হয়ে তা পরিণত হচ্ছে ধুলোয়। ফলস্বরূপ, সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তা-ঘাট হচ্ছে বিনষ্ট। বেপরোয়া গতি ও কানফাটা আওয়াজে চলাচলকারী ট্রাক্টরের কারণে এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে ব্যাপকভাবে শব্দ দূষণ দেখা দিয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যালয়, মহা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া।
ইট ভাটাগুলো পূর্ণদ্যোমে উৎপাদনে আসার ফলে ট্রাক্টরগুলোর চাহিদা বছরের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন অত্যধিক। আর সে সুযোগেই তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এখানকার প্রায় সমস্ত সড়কগুলোতে। তাদের বেপরোয়া গতি ভীতির সঞ্চার করছে জনমনে। যে কোন সময় ঘটতে পারে জীবনহানির মত মারাত্মক দুর্ঘটনা। প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয়ে যায় তাদের দৌরাত্ম্য।
কয়েকমাস বিরতি দিয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলার প্রায় সর্বত্র দাপটের সাথে চলছে ট্রাক্টর নামক যন্ত্র দানব। তাদের বেপরোয়া চলাচলে অতিষ্ট এখানকার জনজীবন। গত কয়েক সপ্তাহ পূর্বে পুলিশ সুপারের নির্দেশনা অমান্য করে এ অবৈধ যানটি দুর্বার গতিতে অবাধে এ উপজেলার সড়কগুলো মাড়িয়ে যাচ্ছে।
পৌরসভাসহ উপজেলার অনেক স্থানেই চলছে বর্ষা পরবর্তী রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন কর্মকান্ড। কিন্তু এ উপজেলাবাসীর আশঙ্কা ট্রাক্টরগুলোর এ অবাধ চলাচল অব্যাহত থাকলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ সব রাস্তা ঘাটগুলো আগামী বর্ষার পূর্বেই আবারও বেহাল অবস্থায় পতিত হবে।
শোল্লার আব্দুর রহিম অভিযোগের সুরে বলেন, ট্রাক্টর চলা বন্ধকালীন সময়ে অনেকটা নির্বিঘেœ পথচারীরা চলাফেরা করতে পারতো। ছাত্র ছাত্রীরা নির্ভয়ে তাদের স্ব স্ব বিদ্যালয়ে যেত। কিন্তু এগুলো আবার চালু হওয়ায় অভিভাবক হিসেবে তারা খুব ভয়ে আছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ সব ট্রাক্টরগুলোর চালকদের নেই কোন ড্রাইভিং লাইসেন্স। কয়েকদিন পুরনো চালকদের সঙ্গে থেকে নেয়া নামমাত্র প্রশিক্ষণই তাদের চালান। এরপরই তারা চলে আসে ট্রাক্টর চালনায়। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সঠিক ভাবে অবগত না হওয়ায় আবার অনেক ক্ষেত্রে জেনেও না মানায় তাদের দ্বারা সংঘটিত হয় নানা দূর্ঘটনা।
সরেজমিনে দেখা যায়, এ উপজেলার পূর্বাঞ্চল ইট ভাটা অধ্যুষিত এলাকা ও পশ্চিমাঞ্চল বালু ব্যবসা জমজমাট হওয়ায় মূলতঃ এ অঞ্চলগুলো থেকেই উপজেলার সর্বত্র ট্রাক্টরগুলো অবাধে চলাচল করে। আর এ কারণেই ফরিদগঞ্জ-গাজীপুর-চান্দ্রা, ফরিদগঞ্জ-রূপসা-খাজুরিয়া, ফরিদগঞ্জ-কালিরবাজার, আষ্টা-গল্লাক, আষ্টা-কামতা, ফরিদগঞ্জ-ধানুয়া-বাগড়া সড়কে এ যন্ত্রদানবের বিচরণ সর্বাধিক। ফলে এ সড়কগুলোর অবস্থা বছরের বেশিরভাগ সময়ই অন্যান্য সড়কগুলোর তুলনায় বেশি জরাজীর্ণ থাকে এবং এদের কারণে সংঘটিত সড়ক দূর্ঘটনা বেশি পরিলক্ষিত হয়।
গাজীপুরের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পুলিশ সুপারের নির্দেশক্রমে ট্রাক্টর চলাচল বন্ধ হলে যানবাহন সংক্রান্ত দুর্ঘটনার হার অনেকটাই কমে আসে। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য সড়কগুলোতে এ যন্ত্রদানবটি বিচরণের কারণে সেগুলো চলাচলের অযোগ্য হয়ে আমাদের কাছে মরণ ফাঁদ হিসেবে হাজির হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.এইচ.এম মাহফুজুর রহমান জানান, বিদ্যুতের খুঁটি পরিবহণের জন্য সপ্তাহে দু’দিন ট্রাক্টর চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অচিরেই এর অবাধ চলাচলের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শাহ্ আলম বলেন, পারিপাশির্^ক বিভিন্ন চাপের কারণে অনেক সময় ট্রাক্টরের বিরুদ্ধে অভিযান সফলতার মুখ দেখে না। তা সত্ত্বেও জনকল্যাণে এ যানের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলায় গত কয়েক বছরে যে কয়টি সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, তার সিংহভাগই ট্রাক্টরের কারণে। ট্রাক্টরগুলের বিভিন্ন হাট-বাজারের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করার সময় ভয়ে আতঙ্কিত হতে হয় সাধারণ পথচারিদের। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণহীন ট্রাক্টরগুলো যাতে স্থায়ী ভাবে সড়কে চলাচল করতে না পারে সে ব্যবস্থা নেয়া সময়ের দাবি বলে মনে করেন এ উপজেলার সচেতন মহল।
