ফরিদগঞ্জ: সাজানো-গুছানো এবং খুবই শক্তিশালী ও সক্রিয় ফরিদগঞ্জ উপজেলা কমিউনিটি পুলিশ এখন শুধু নাম সর্বস্ব কমিউনিটি পুলিশে রূপ নিয়েছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আজ ফরিদগঞ্জে কমিউনিটি পুলিশের প্রাণ নিভু নিভু অবস্থা। এতে করে এ উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। বেড়ে গেছে চুরি, ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ফরিদগঞ্জ কমিউনিটি পুলিশকে এমন গলাটিপে হত্যা করে কতিপয় ব্যক্তির হীন স্বার্থ চরিতার্থ হলেও পুরো উপজেলাবাসী এর পরিণতি ভোগ করছে।
১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর উপজেলা ফরিদগঞ্জ উপজেলা। আয়তনের দিক দিয়ে এবং জনসংখ্যার দিক দিয়ে ফরিদগঞ্জ জেলার মধ্যে সবচে’ বড় উপজেলা। এই উপজেলাটি এমন একটি উপজেলা যেটির চারদিক দিয়ে বিভিন্ন উপজেলা ও জেলার সীমানা রয়েছে। লক্ষ্মীপুর জেলা সদর, রামগঞ্জ, রায়পুর, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলা চারদিক থেকে ঘিরে আছে ফরিদগঞ্জ উপজেলাকে। এ কারণে এ উপজেলা একটি অপরাধ প্রবণ উপজেলা। এ উপজেলার বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রবাসে থাকে। প্রবাসী অধু্যষিত উপজেলাও বলা যায় ফরিদগঞ্জকে। এক সময় চুরি, ডাকাতি, খুনসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ফরিদগঞ্জে খুব বেশি হতো। বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর জেলা সদরসহ রামগঞ্জ ও রায়পুর উপজেলার বর্ডার হওয়ায় ফরিদগঞ্জে ডাকাতির ঘটনা খুব বেশি ঘটতো। এসব মোকাবেলা করতে পুলিশ বাহিনীকে হিমশিম খেতে হতো। বিশেষ করে বর্ডার এলাকা চেক দিতে পুলিশ বাহিনী গলদঘর্ম হয়ে যেতো। ফরিদগঞ্জের এই চরম অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য উপজেলার সচেতন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এ উপজেলায় কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম চালুর সিদ্ধানত্দ নেন। সে আলোকে ২০০৯ সালে বেশ ঘটা করে থানার সামনে চৌরাসত্দা মোড়ে বিশাল প্যান্ডেল করে সহস্রাধিক মানুষের উপস্থিতিতে ফরিদগঞ্জ উপজেলা কমিউনিটি পুলিশ গঠন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চাঁদপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার কৃষ্ণ পদ রায়। আর তখন ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন মুশফিকুর রহমান। সহস্রাধিক মানুষের উপস্থিতিতে ভোটাভুটির মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশ ফরিদগঞ্জ উপজেলার সভাপতি নির্বাচিত হন ফরিদগঞ্জের শহীদ পরিবারের সনত্দান আবুল হোসেন বাবুল পাটওয়ারী। আর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এক কালের তুখোড় ছাত্রনেতা জিএস তছলিম। তবে এর আগে একটি কমিটি থাকলেও সেটি ছিলো নামকা ওয়াসত্দে।
বাবুল পাটওয়ারী ও জিএস তছলিমের নেতৃত্বে ফরিদগঞ্জে কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রম বেশ জোরেশোরে শুরু হয়। এই কমিটির নেতৃত্বে অল্প সময়ের মধ্যে ফরিদগঞ্জ পৌর কমিটি ও উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রতি ওয়ার্ডেও কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সময় পুরো উপজেলায় ২শ’ জন টহল সদস্য যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ দেয়া হয়। বিভিন্ন ডাকাতি জোন এলাকায় রাতে তারা পাহারা দিত। রাতে এ কাজের মনিটরিং করতেন তৎকালীন ওসি, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সভাপতি বাবুল পাটওয়ারী ও সেক্রেটারী জিএস তছলিম। তাদের এ তৎপরতার কারণে ফরিদগঞ্জে ডাকাতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
এখানে উল্লেখ্য যে, ওসি মুশফিকুর রহমানের সময় ফরিদগঞ্জে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম চালু হলেও ওসি সুব্রত ব্যানার্জীর সময় এটি বেশ চাঙ্গা হয়। সুব্রত ব্যানার্জী বাবুল পাটওয়ারী ও জিএস তছলিমকে সাথে নিয়ে নানামুখী পদৰেপ গ্রহণ করে ফরিদগঞ্জ কমিউনিটি পুলিশকে মডেল হিসেবে দাঁড় করান। অথচ এতো সুন্দর, সাজানো-গোছানো ও সক্রিয় এই কমিটিকে বাদ দিয়ে গত বছরের নভেম্বর মাসে হঠাৎ নতুন কমিটি করা হয়।
এ বিষয়ে পূর্বের কমিটির সভাপতি আবুল হোসেন বাবুল পাটওয়ারী বলেন, আমরা নতুন কমিটির ব্যাপারে কিছুই জানি না। ওসি মুশফিকুর রহমানের সময় বিরাট আয়োজন করে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে ভোটাভুটির মাধ্যমে আমাদের কমিটি হয়। আমরা অনেক দানবীর ও সমাজসেবক থেকে ২শ’ টহল সদস্যের জন্য ড্রেস, বাঁশি, লাঠি ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি অনুদান হিসেবে সংগ্রহ করি। প্রতি মাসে আমরা মিটিং করতাম। প্রতি ঈদে টহল সদস্যদের আমরা সেমাই-চিনি দিতাম। এভাবে কমিউনিটি পুলিশকে আমরা একটি মডেল হিসেবে দাঁড় করাই। অথচ একদিন হঠাৎ শুনি নতুন কমিটি। আমাদের কমিটি কী জন্য পরিবর্তন করা হলো, এ ব্যাপারে আমাদেরকে কিছু বলাও প্রয়োজনবোধ করলো না।
তিনি বলেন, ৰমতাসীন দলের জেলার এক শীর্ষ নেতার হস্তক্ষেপে ফরিদগঞ্জ কমিউনিটি পুলিশকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। বর্তমান সভাপতির পিতা রুস্তমপুর এলাকার জামায়াতের একজন প্রভাবশালী নেতা। তাকে সমপ্রতি পুলিশ আটক করার পর অনেক টাকার বিনিময়ে তাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয় তার ছেলে উপজেলা কমিউনিটি পুলিশের বর্তমান সভাপতি। এ নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল খায়ের পাটওয়ারী খুব ক্ষুব্ধ হন।
পূর্বের কমিটির সেক্রেটারী জিএস তছলিম বলেন, আমরা সামাজিক কর্মকাণ্ড ও দায়িত্ববোধের কারণে জনস্বার্থে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত হই। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে। কিন্তু হঠাৎ শুনি নতুন কমিটি। আমাদেরকে কোনো কিছুই জানানো হয়নি। জেলা কমিটির সাথে যোগাযোগ করার পর তারাও বলেছেন আমরা এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। আসলে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার আশীর্বাদপুষ্ট এই কমিটি। এই কমিটির সাথে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কষ্ট লাগে আমাদের শ্রমের ফসল ফরিদগঞ্জ কমিউনিটি পুলিশকে গলা টিপে হত্যা করা হলো।
এ ব্যাপারে চাঁদপুর জেলা কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সাধারণ সম্পাদক সুফী খায়রুল আলম খোকন বলেন, বাবুল পাটওয়ারী-জিএস তছলিম নেতৃত্বাধীন ফরিদগঞ্জ উপজেলা কমিউনিটি পুলিশের কমিটি পরিবর্তন করার ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। আমাদেরকে এ ব্যাপারে কোনো কিছুই বলা হয়নি। নতুন কমিটি জেলা কমিটির কোনো অনুমোদনও নেয়নি। আমাদের কাছে এখনো অনুমোদিত কমিটি হচ্ছে বাবুল পাটওয়ারী-জিএস তছলিম নেতৃত্বাধীন কমিটি।
ফরিদগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নূরুন্নবী নোমান নিজ উপজেলার কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, ফরিদগঞ্জে এখন কমিউনিটি পুলিশের কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। যা আছে তা শুধু নাম সর্বস্ব। যারা বর্তমানে নেতৃত্বে আছেন তারা শুধু পুলিশ প্রশাসনের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতেই ব্যসত্দ।
এমনিভাবে কথা হয় ১৬নং রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি আব্দুল কাদের খোকন মেম্বার, ১৫নং রূপসা উত্তর ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি এম অলি উল্যাহ, ১৪নং ফরিদগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়ন সভাপতি রফিকুল ইসলাম মেম্বার, সেক্রেটারী সফিকুল ইসলাম পাটওয়ারী, ৯নং গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়ন সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান কায়েম পারভেজ লাভলু, সেক্রেটারী মুজিবুর রহমান এবং ২নং বালিথুবা ইউনিয়ন সভাপতি আতিকুর রহমান বাবুল ও সেক্রেটারী কামাল হোসেনের সাথে। এরা সবাই প্রায় এক ও অভিন্ন ভাষায় বলেছেন, ফরিদগঞ্জে এখন কমিউনিটি পুলিশের কোনো কার্যক্রম নেই। তারা বলেন, শুনেছি নতুন কমিটি হয়েছে। কিন্তু আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই, সমন্বয় নেই।
১৬নং ইউনিয়নের সভাপতি বলেন, আমরা আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে বাজারে ৩জন টহল সদস্য ধরে রেখেছি। থানা কমিটির এ ব্যাপারে কোনো সহযোগিতা নেই এবং কোনো খোঁজ খবরও তারা রাখে না।
ফরিদগঞ্জবাসী চাচ্ছে ফরিদগঞ্জ কমিউনিটি পুলিশের অচলাবস্থা দূর করে পূর্বের ন্যায় চাঙ্গা করে তোলা হোক।
