মিজান লিটন
ফরিদগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় চলছে অশ্লীল নৃত্য আর প্রতিদিনই র্যাফেল ড্রর নামে চলছে জমজমাট জুয়া খেলা। আরেকদিকে পুতুল নাচ ও যাদু প্রদর্শনীর নামে চলছে কিশোরীদের অশ্লীল দেহভঙ্গীর নৃত্য। এ সবের ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন শিশু কিশোর, বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষসহ তরুণ-তরুণীদের ভিড় বাড়ছে। মেলায় নেই ৭১-এর সেই বিজয়ের গৌরবগাঁথা নিয়ে উল্লেখ করার মতো কোনো নিদর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্মৃতিচারণ। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের শ্রেষ্ট সন্তান মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী।
এদিকে এ মেলায় চলমান বিভিন্ন অশ্লীলতা ও জুয়া খেলার তথ্য প্রমাণসহ অভিযোগ পেয়ে জেলা পুলিশ সুপার মোঃ আমির জাফর তা বন্ধের জন্য থানার ওসিকে শুধু নির্দেশ দিয়েই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি। পাশাপাশি তিনি উক্ত বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সরজমিনে ফরিদগঞ্জে আসেন। তবে এ বিষয়ে প্রতিকারের জন্য পুলিশ সুপারের আন্তরিকতা দেখা গেলেও ক্ষমতার দাপটে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারছে না বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক সূত্র জানায়, এই মেলা মোটা অংকের টাকার বিনময়ে একাধিক হাত বদল হয়েছে। গোপন সমঝোতার কারণে একাধিক মহলের হাতে বিক্রি করা হয়েছে বিজয় মেলাটি। যে কারণে গোপনে সব ম্যানেজ করেই চলছে বিভিন্ন অশ্লীলতা এবং সরকারি অনুমোদন ছাড়াই র্যাফেল ড্রর নামে চলছে জুয়া খেলা।
গত ২৫ নভেম্বর স্থানীয় ওয়াপদা মাঠে ২৫ দিনব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের ৮নং সেক্টরের সেক্টর কামান্ডার এবং চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক লেঃ কর্নেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী। প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। প্রধান বক্তা ছিলেন এলাকার সাংসদ ড. মোঃ শামছুল হক ভূঁইয়া। এছাড়া জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
মেলায় অশ্লীলতার কথা উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে বেশ কজন মুক্তিযোদ্ধা জানান, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিলো বিজয়ের গৌরবগাঁথা উপস্থাপন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র ও মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন প্রদর্শনী করা হবে। যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলা হবে। তারা অভিযোগ করে বলেন, ফরিদগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলাস্থলে এর কিছুই নেই। বরং সেখানে বেআইনিভাবে প্রতিদিন লটারীর নামে চলছে জুয়া খেলা। পুতুল নাচ ও যাদু প্রদর্শনীর নামে মঞ্চ তৈরি করে চলছে কিশোরী মেয়েদের অশ্লীল দেহভঙ্গীর নৃত্য। যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
এ ব্যাপারে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ও বিজয় মেলা কমিটির মহাসচিব যুদ্ধ সহিদ উল্লা তপাদার বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়ের সম্মানে আমরা মেলার উদ্বোধনী দিনে হাজির হয়েছিলাম মাত্র। বিভিন্ন কারণে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ অলিখিতভাবে এ মেলা বর্জন করেছে। শুধুমাত্র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর থেকে আজ অব্দি এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শুনেছি সেখানে ব্যতিক্রমী কাজ কারবার চলছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মেলা শুরুর দিন থেকেই সেখানে মেলার মূল মঞ্চে গভীর রাত পর্যন্ত চলে লটারীর নামে জুয়া খেলা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টিকেট বিক্রি শেষে মেলার মূল মঞ্চে গভীর রাত পর্যন্ত ড্র চলে। ড্রর ফলাফলের জন্য ৮-১০ বছর বয়স থেকে শুরু করে শিশু কিশোর ও কিশোরীরা পর্যন্ত সেখানে বসে থাকে। তার ১শ’ গজ দূরে এক পাশে পুতুল নাচ ও অন্য পাশে যাদু প্রদর্শনীর নামে চলে কিশোরী মেয়েদের অশ্লীল দেহভঙ্গীর নৃত্য। প্রতিদিন বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব দেখছে অবুঝ শিশু কিশোররা। এর ফাঁদে পড়ে শিশু-কিশোর ও কিশোরীরা সেখানে ভিড় করছে। সেখানে মেলার নামে যা কিছু হচ্ছে এসব মেনে নেয়া যায় না। তারা অভিযোগ করে আরো বলেন, মেলার আশপাশে প্রতিদিন রাতে গাঁজাসেবীদের আড্ডা বসছে।
মেলা প্রসঙ্গে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ জয়নাল আবেদীন জানান, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতিবিহীন লটারী আয়োজন করা যায় না। তাছাড়া পুতুল নাচ ও যাদু প্রদর্শনীর নামে অশ্লীলতার কোনো সুযোগ নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেলা আয়োজনে কী ধরনের অনুমতি আছে তা খতিয়ে দেখে অপসংস্কৃতি রোধকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জকে বলেছি।
এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবু সাহেদ সরকার উক্ত মেলায় অশ্লীলতা ও র্যাফেল ড্রর নামে জুয়ার অভিযোগ পেয়েছেন স্বীকার করে বলেন, ইউএনও’র সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, উক্ত মেলায় যে কোনো অশ্লীলতা কঠোর হস্তে দমন করার জন্যে সংসদ সদস্য মহোদয় ড. মোঃ শামছুল হক ভূঁইয়ার কড়া নির্দেশ রয়েছে।

