
শওকত আলী ঃ
চাঁদপুরে স্বাধীনতা যুদ্ধে দলিত ও সংখ্যালঘুদের উল্লেখযোগ্য ভূমীকা ও অবদান থাকলেও দলিতরা সকলক্ষেত্রে অবহেলার মধ্যে থাকতে হয়েছে এবং বর্তমানেও থাকছে। দেশ মাতৃকার টানে তারা পাক হানাদার বাহীনির সাথে থেকেও মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বক্ষেত্রে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো এ জন্য তাদেরকে যেমন প্রাণ দিতে হয়েছে, তেমনি মা বোনদের ইজ্জত পর্যন্ত হারাতে হয়েছে। এক পর্যায়ে তারা তাদের হরিজন পল্লি থেকে পালিয়ে গিয়ে অন্যত্রে আশ্রয় পর্যন্ত নিতে হয়েছে। নিজেদের জীবনের কথা চিন্তা না করে মুক্তিযোদ্ধাদের তাদের পল্লিতে আশ্রয় দিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর অবস্থান নির্ণয় করার সুযোগ করে দিয়েছেন। দলিত হরিজনরা শিক্ষা না থাকায় মুক্তিযুদ্ধ করলেও তারা সে সময় তাদের জীবনের অর্জন সর্টিফিকেটটুকু পর্যন্ত সংগ্রহ করে নেননি। দলিত হরিজনরা নিজেদের কাজের ফাঁকে ফাঁকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখতেন বলে তাদের স্বজনরা জানান।
দলিত হরিজনদের নতুন প্রজন্মের সন্তানরা জানান, আমাদের অভিভাবকরা এ দেশে প্রায় দু’শ বছর বসবাস করেছে। তাদের প্রজন্ম হিসেবে আমাদের এ দেশে বসবাস। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে এদেশের মুক্তিকামি জনতার সাথে মুক্তিযুদ্ধ হয়। তখন এদেশে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন দলিত হরিজন সংখ্যালঘু কোন বেদাবেদ ছিলনা। সকল শ্রেণী পেশার মানুষ এদেশটিকে বাংলাদেশ হিসেবে স্বাধীনতা অর্জন করবে, এটাই ছিল সকলের একমাত্র লক্ষ। ধর্মবর্ণ এর কোন বৈষম্য তখন তুলতোনা। সবার একটিই লক্ষ ছিলো স্বাধীন সার্ববৌম একটি স্বাধীন রাষ্ট্র চাই। চাঁদপুর শহরের উল্লেখযোগ্য স্থানে দলিত হরিজনদের তিনটি কলোনি ছিলো। এরা ওই সময় শহরকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতো। এ দেশে যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, তখন মুসলমান হিন্দুদের পাশাপাশি দলিতরাও মুক্তিযুদ্ধে একত্রতা ঘোষণা করে পাকিস্তানি পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে থাকে। দলিত যুবকরাও অন্য সম্প্রদায়ের যুবকদের মতো যুদ্ধ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন।
দলিতরা জনান, চাঁদপুরে পুরান বাজার নদীর পাড় মদিনা মসজিদ সংলগ্ন স্থানে ও শহরের বড় স্টেশন রেলওয়ে এলাকায় হরিজন কলোনির সন্নিকটে পাক হানাদার বাহিনীর ঘাটি ছিলো। তারা এদেশের মানুষদের হত্যা করে এ দু’টি স্থানে ফেলে রাখতো। তখন হরিজনরা মানুষের মৃত দেহ এনে কবর দিয়ে দিতো বলে তারা জানান। পাক হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা দলিত হরিজনদের উর্দু ভাষায় ভাঙ্গী (পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মী) হিসেবে আখ্যায়িত করতো। তারা হাতে লাল কাপর লাগিয়ে চলাচল করতে হতো। এতে পাক হানাদার বাহিনীরা বুঝতো এরা ভাঙ্গি। যার ফলে এদেরকে কোন সমস্যা করতো না। পাক বাহিনী এদেরকে অনেক বিশ^াস করতো। অনেক যুবতি মা বোনদের যখন পাক বাহিনী তুলে নিয়ে আসতো বড় স্টেশন ক্যাম্পে। তখন দলিতরা আত্মীয় স্বজন পরিচয় দিয়ে এদের ইজ্জত ও প্রাণে রক্ষা করেছে বলে তাদের দাবী। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হলেও দলিত হরিজনদের তালিকা হয়নি। তাদের শহীদদের কথা কেহ মনে রাখেনি। এছাড়া যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো কেহই এখন আর বেঁচে নেই। স্বাধীনতার ৪৫ বছরে বহুবার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন হলেও হরিজনদের কোন খোঁজখবর নেওয়া হয়নি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতা ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। দলিত হরিজন মুক্তিযোদ্ধারা তাদের জীবদ্দশায় কোন সহযোগীতা পায়নি সরকারের পক্ষ থেকে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকুও পায়নি। তাদের সন্তানদের দাবী এসব দলিত হরিজনদের নামের তালিকা করা সরকারের একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন। তা না হলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কারা ছিলো তা বেড়িয়ে আসবে না। যে সব দলিত হরিজন মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যু বরণ করেছে, তাদের সন্তানরা রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতির মাধ্যমে অন্তত বলতে পারবে তাদের পূর্ব পুরুষরা এদেশের স্বাধীনতার জন্য তাদের অবদান রেখেছিলো। তারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক মুক্তিকামি একজন বীর পুরুষ ছিলো। তাদের প্রজন্ম তারা রেখে গিয়েছে। এছাড়া অনেক দলিত হরিজনদের সন্তানরা এখন অসহায় জীবন যাপন করছে। দলিত হরিজন অনেক নারী পাক হানাদরদের হাতে ধর্ষিতা হয়ে লজ্জায় এ দেশ ত্যাগ করে চলে গেছে। স্বাধীনতার পর এদের খোঁজ আর পাওয়া যায়নি। বর্তমানে যারা বেঁচে আছে তারা সরকারে সু-দৃষ্টি ও সহযোগীতা কামনা করছে। মহান স্বাধীনতা যুুদ্ধে দলিতদের পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দুরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো। তারা পাশর্^বর্তি দেশ ভারত গিয়ে পর্যন্ত ট্রেনিং দিয়েছে। বহু সংখ্যালঘু স্বাধীনতা যুদ্ধে চাঁদপুরে শহীদ হয়েছে বলে হিন্দু নেতারা জানান। যারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বেঁচে আছে তারা তাদের অবস্থান মতো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদের নাম তালিকা ভূক্ত করে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছে। সংখ্যালঘুদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তারা চাঁদপুরে অনেকেই ৪৫ বছরের মধ্যে মৃত্যু বরণ করেছে। যারা বেঁচে আছে তারা ভালো ভাবে জীবন যাপন করে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে সম্মান নিয়েই আছে। অনেকে এদেশে নেতৃত্ব পর্যন্ত দিয়ে যাচ্ছে। তারা বিগত সরকারের সময় তেমন সরকারি সুবিধা না ফেলেও বর্তমান সরকারের সময় আরো মুল্যায়িত হচ্ছে।
চাঁদপুরের কয়েকজন প্রবীন হিন্দু নেতা জানান, তারা সরকারি বেসরকারি ও সামাজিক সর্বক্ষেত্রে তাদের অবস্থান সৃষ্টি করে সংখ্যালঘুদের প্রয়োজনে চাঁদপুুরে বীরদর্পে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে বলে হিন্দু নেতাদের অভিমত।
হরিজন সমাজ উন্নয়ন সংস্থার চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি আকাশ দাস হরিজন ও সাধারণ সম্পাদক হিরা সরকার মুন্না বলেন, অনেক হরিজনরা মুক্তিযুদ্ধে সহযোগীতা করেছে। মুক্তি বাহিনীদের তাদের বাসায় আশ্রয় দিয়েছে এবং ক্যাম্প থেকে খাবার ও অন্যান্য জিনিস পত্র এনে তাদেরকে সহযোগীতা করেছে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কাছে দলিত হরিজনরা ভাঙ্গি নামে পরিচিত ছিলো। যুদ্ধের সময় দলিতরা পাকিস্তানিদের ভয়ে গ্রাম গঞ্জে চলে যায়। যার ফলে তাদেরকে মুসলিম লীগের নেতাদের মাধ্যমে খুজে এনে শহর পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজীত করে। পাক বাহিনী এদেরকে চিনার জন্য ডান হাতে লাল ফিতা বেঁধে দিয়ে কাজ করার জন্য সুযোগ দিতো। অনেক দলিত মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু তারা মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নেয়নি। অনেক দলিত যুদ্ধের সময় শহীদ পর্যন্ত হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধে সহযোগীতা করেছেন তাদের অনেকেই এখন অসহায় জীবন যাপন করছে। চাঁদপুরে একজন দলিত নারী পাক বাহিনীর হাতে ধর্ষনের শিকার হন। স্বাধীনতার পর তাকে আর খোঁজে পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রীয় সহযোগীতা পায়নি এসব মুক্তিবাহিনীর সহযোগী পারিবার গুলি। তারা রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতিও পায়নি এমন অনেক দলিত রয়েছে। সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারেনি আজও স্বর্ণখোলা হরিজন কলোনির দলিত হরিজনরা। তাদের জানা মতে ওই সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতায় যারা এগিয়ে গিয়েছিলেন তারা হচ্ছেন, ফনিলাল বাসফোর, জগন্নাথ হরিজন, লক্ষণ লাল হরিজন, কিনন লাল ডোম, ডেউয়া ডোম, রাম প্রসাদ হরিজন, রামপল হরিজন, রাধামহন হরিজন, মণি লাল হরিজন, কালিদিন হরিজন, ছোট লাল, নারায়ন হরিজন, পুরন হরিজন সহ অসংখ্য হরিজনরা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ভাবে সহযোগীতা করেছেন। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাদের নাম আসেনি। যার ফলে তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে সব সুযোগ সুবিধা পাওয়ার কথা তা পায়নি। বর্তমানেও তারা অবহেলিত। তাদের প্রতি সরকারের সু-দৃষ্টি নেই। তাই তারা সরকারের রাষ্ট্রের সহযোগীতা চাচ্ছে। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে যে সব সহযোগীতা করছে তা দলিত হরিজনরা পায়নি। বর্তমানে তাদের সন্তানরাও তা থেকে বঞ্চিত আছে। এদের অনেকের পরিবার বর্তমানে কাজ না থাকায় অভাব অনটানে তাদের জীবন কাটছে অতি কষ্ঠে।
নতুন বাজার মুচি বাড়ির রবিদাস সম্প্রদায়ে সভাপতি নারায়ন রবি দাস বলেন, আমাদের মুচি বাড়িতে ৭জন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতায় কাজ করে গেছেন। এর মধ্যে রয়েজন মতি লাল রবিদাস, লকমন রবিদাস সহ অনেকেই যারা বর্তমানে বেঁচে নেই। বিগত ২২ বছর পূর্বে এরা একেক করে সবাই মারা যায়। এরা ভারত থেকে ট্রেনিং দিয়ে এসেছিলো। এসব মুক্তিযোদ্ধারা শিক্ষিত ছিলনা। যার ফলে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেনি এবং এর মর্যাদাটুকুও বুঝেনি। যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো তারা সরকারি সহযোগীতা পায়নাই। যার ফলে কষ্ঠ স্বিকার করে অবশেষে মৃত্যু বরণ করেছে। যারা মৃত্যু বরণ করেছে তাদের সন্তানরা সরকারি কোন সহযোগীতা পায়নি। মৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা রাষ্ট্রিয় সহযোগীতা কামনা করছে। বর্তমানে নতুন বাজার মুচি বাড়ির মুক্তিযোদ্ধা মতি লাল রবি দাসের ৩ ছেলে নারায়ান রবিদাস, রবিন্দ্র রবিদাস ও লিটন রবিদাস এখানে কষ্ঠ স্বিকার করে বসবাস করছে। অপর মুক্তিযোদ্ধা লকমন রবিদাসের দু’ছেলে রয়েছে, কার্তিক রবিদাস ও উত্তম রবিদাস।
নারায়ন রবিদাস জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতা করার করনে তার পিতা মতিলালকে তিনবার পাকহানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। তখন অনেক নির্যাতন করেছে আমার পিতাকে। তবুও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগযোগ রাখতেন। বর্তমানে কুমিল্লা রোডের বাসিন্দা বিহারী জাভেদ ও জীবন কানাই চক্রবর্তী ওই সময় পাক বাহীনির হাত থেকে সুপারিশ করে মতিলালকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। মতিলাল রবিদাস মারা গেলেও তার স্ত্রী পুতুল রাণী রবিদাস (৮০) এখন অসহায় অবস্থায় কষ্ঠ স্বিকার করে বেঁচে আছেন। পুতুল রাণী সরকারি সহযোগীতা পান নাই মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে। আমরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি সহযোগীতার চেষ্ঠা করিনাই। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের এতো মূল্যায়ন হবে তখন বুঝতে পারি নাই। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে সরকারি সহযোগীতা পেতে চাই আমরা।
পুরাণবাজার হরিজন যুবক্লাবের সভাপতি শ্যামল হরিজন জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা আমার দাদু তখনকার জামাদার সমাজ প্রধান এলাকার মুরব্বিদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেক শুনেছি। ওই সময় সমাজ প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন সিদি লাল হরিজন সহকারী সমাজ প্রধান রাম অবতার ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রামফল, নারায়ন বীর, বসন্ত, মতিলাল, বলরাম। এরা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করার সময় পাকিস্তানিদের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর অভিযোগের খবর পাইতেন। তখন তারা মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারের কাছে এসব খবরাখবর পৌছাতেন। মুক্তিবাহিনীরা ওই সময় হরিজন কলোনিতে রাত্রি যাপন করতেন অনেক সময়। তখন হরিজনরা তাদেরকে খাদ্য ও বিভিন্ন সহযোগীতা করতো এবং পাক হানাদার বাহিনীর ঘাটি ছিল তখন পুরাণ বাজার মদিনা মসজিদের কাছে। সেখান থেকে এসব মুক্তিযোদ্ধারা মৃত ব্যাক্তিদের লাশ এনে কবর দিতো। পাক বাহিনী একসময় এসব খবর পেয়ে হরিজন কলোনিতে হানা দেয়। তখন এখানকার লোকেরা পালিয়ে গোবিন্দিয়া স্কুলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। যার ফলে পুরাণ বাজার এলাকার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তখন পাক বাহিনীর অনুরোধে মুসলিমলীগ নেতা আব্দুল লতিফ খান হরিজনদেরকে বুঝিয়ে পূণরায় পুরানবাজার হরিজন কলোনিতে এনে আশ্রয় দেন। তখন তারা মাটির নিচে ভাংকার করে নারীদের হেফাজতের জন্য ব্যবস্থা করেছেন। পরিস্কার পরিচ্ছন্নের জন্য তাদের প্রয়োজন যার ফলে পাক বাহিনী তাদের উপর আর হানা দেয়নি। এখানকার যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করে তারা শিক্ষিত ছিলনা বলে সার্টিফিকেট নেয়নি। বেঁচে থাকা অবস্থায় কোন রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতিও পায়নি। যার ফলে সরকারি সুবিধা ভোগ করতে পারেনি। পুরাণবাজার হরিজন কলোনির যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলো এবং যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতা করেছে তারা কেহই এখন বেচে নেই। বর্তমানে তাদের সন্তানরাও রাষ্ট্রিয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারছেনা। তারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে কোন রকম সুবিধা ভোগ করছে না। তাদের পূর্ব পুরুষেরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলো এবং বর্তমানে তাদের সন্তারাও বঞ্চিত রয়েছে। আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে সরকারের সহযোগীতা কামনা করছি।
চাঁদপুর রেলওয়ে হরিজন কলোনির শ্রী শ্রী মহাবীর রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক বিধান চন্দ্রদাস (জনি) বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় চাঁদপুর রেলওয়ে হরিজন কলোনির বাসিন্দারা তৎকালিন সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো। ১৯৭১ সালে চাঁদপুর মহাকুমার মধ্যে পাক হানাদার বাহিনী যে শক্ত ঘাটি করেছিলো সেটি বড় স্টেশন হরিজন কলোনির সন্নিকটে ছিলো। পাক হানাদার বাহিনীরা কি হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো তা হরিজনরা বাস্তবে খুব কাছাকাছি থেকে উপলব্দি করতে পেরেছিলো। এক পর্যায়ে হরিজনরা সকলে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু হরিজনরা পূর্ব থেকেই একে অপরের পাশাপাশি থেকে দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করতো। তাদের মধ্যে মূল সর্দারকে জমাদার বলা হতো। ব্রিটিশ আমলে এ জমাদারদেরকে প্রচুর মূল্যায়ন করা হতো। আমাদের এলাকার মুরব্বিদের মুখে অনেকবার শুনেছি। আমাদের কলোনিকে যখন পাক হানাদার বাহিনী ঘিরে পেলে। অস্ত্রমূখী অবস্থায় হরিজনদের জমাদার প্রাণের ভয়ে বাঁচার জন্য পাকহানাদার বাহিনীকে বলে হুজুর আমরা ভাঙ্গি (পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মী)। আমরা আপনাদের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করি। তখন রেলওয়ে হরিজন কলোনিতে ৬০-৭০ জন রেলওয়ে সুইপার হিসেবে কর্মরত ছিলো। তখন ভাঙ্গি হরিজনদেরকে পাক বাহিনী লাল কাপর ডান হাতে বেঁধে দেয়। এটা ছিলো তাদের পরিচিতি এবং প্রাণে বেঁচে থাকার উপায়। কিন্তু এসব কিছু বাঁধা উপেক্ষা করেও তারা প্রথমত অনেক নারীর জীবন বাঁচিয়ে ছিলো। অনেক নারীর ইজ্জত কেড়ে নিয়ে হানাদার বাহিনীর বড়স্টেশন গোডাউনের ভিতরে বস্ত্রহীন অবস্থায় রেখেছিলো। রাতের অন্ধকারে স্টিমার ঘাটের প্লাট ফর্মে এদেরকে মেরে ফেলা হতো। অনেক সময় সুযোগ সুবিধা বুঝে হরিজনরা অনেক নারীর জীবন রক্ষা করেছিলো। চাঁদপুরের অনেক পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে খাদ্য দিয়ে উপকার করেছে। খবরাখবর আদান প্রদান করতো। ওই সময় হরিজনদের মধ্যে উল্লেখিত মুক্তিযোদ্ধার ভূমীকা পালন করেছে রেলওয়ে হরিজন কলোনীর বীরবল হরিজন, রামফল, রাম স্বরন হরিজন, রাম প্রসাদ জমাদার, রামদিন হরিজন, হেম লাল হরিজন সহ আরো অসংখ্য হরিজনরা মুক্তিযোদ্ধাদের খবরাখবর দিয়ে সহযোগীতা করতো। এদের মধ্যে আজ অনেকেই বেঁচে নেই। রাম পল হরিজন ৭১ সালে তার নাম হয়ে যায় রাম খাঁ। এ রাম খাঁ খুব সুন্দর হারমনিয়াম বাজানোর মাষ্টার ছিলো। উর্দু ও হিন্দি ভাষা ভালো জানতো। প্রচুর পরিমান মদ পান করতো সে। পাক হানাদারা বাহিনীর মেজর তাকে ধরে নিয়ে যায়। তার কাছ থেকে হারমানিয়াম বাজানো শিখা সহ উর্দু গান শুনতে পছন্দ করতো। তখন এ রাম খা বিভিন্ন অযুহাতে আত্মীয়র পরিচয় দিয়ে পাক বাহিনীর হাত থেকে বহু নারীর ইজ্জত ও জীবন রক্ষা করেছিলো। স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা অবদান রেখেছিলো তার কেহই এখন বেঁচে নেই। তাদের স্মৃতি হরিজনদের মাঝে উপলব্ধি হয় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেও তারা এর পরিবর্তে নিজের দেশে স্বাধীনতা সারা অন্য কিছু চায়নি এবং পরবর্তি সরকারি সার্টিফিকেট নেওয়ার প্রতি তাদের গুরুত্ব বা লোভ লালসা ছিলোনা। বিশেষ করে তৎকালিন হরিজনরা নিন্ম শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলো। সরকারি সুযোগ সুবিধা আদো পর্যন্ত পায়নি চাঁদপুরের হরিজন পরিবারের লোকেরা।
চাঁদপুর শহরে অবস্থানরত তিনটি হরিজন পল্লির কয়েক হাজার দলিত হরিজনরা বর্তমান সরকারের কাছে তাদের পূর্ব পুরুষেরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতায় এগিয়ে আসার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তাদের পরিবারদের সহযোগীতার জন্য সরকারের সু-দৃষ্টি কামনা করছেন।
