সময় ও কালের পরিক্রমায় আমরা অনেক কথাই ভুলে যাই। ভুলে যাই আমাদের শিকড়ের কথা। ভুলে থাকি সেই সকল ব্যক্তিত্বকে,যাদের অসীম সাহসীকতা আর আত্মত্যাগ সমৃদ্ধ করেছে আমাদের ইতিহাসকে। আজকের দৃশ্যমান সোনালী ভবিষ্যতের যারা ছিলেন দিক নির্দেশক। এমনি একজন ছিলেন, শহীদ প্রফেসর ড.মোহাম্মদ শামছুজ্জোহা স্যার। যিনি বাঙ্গালীর স্বাধীকার আন্দোলনের ইতিহাসে একজন কিংবদন্তী হয়ে থাকবেন ।
১৯৩৪ সালে জন্মগ্রহন করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে রসায়নে স্নাতক এবং ৫৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন । ১৯৬৪ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন থেকে পিএইচডি ডিগ্রীও নেন তিনি । ঢাবির ছাত্র থাকাকালীন ভাষা আন্দোলন মুভমেন্টের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনিও ছিলেন একজন সক্রিয় সৈনিক ।
শহীদ শামছুজ্জোহা স্যারই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রথম শিক্ষক যিনি পাক মিলিটারির গুলিতে শহীদ হোন। ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করে পাকি প্রশাসন । আন্দোলনে ফুঁসে উঠে ছাত্রসমাজ। শামছুজ্জোহা স্যার তখন রাবির শিক্ষক। রাবির ছাত্ররাও বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে । পুলিশ হামলা করে এবং গুলি চালায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর। মাত্র এক বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব নেয়া শামছুজ্জোহা স্যার ১৬ তারিখ শিক্ষকদের এক সভায় বলেন,”ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত আমি,ছাত্রদের উপর আর একটি গুলি চালানোর আগে আমাকে গুলি করতে হবে “।কি অনন্য ছাত্রবৎসল এবং সাহসী মনোভাব…।।
১৭ ফেব্রুয়ারি উত্তপ্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদের সাথে আবার সংঘর্ষ বাঁধে পুলিশের। আহত হয় বেশ কিছু সংখ্যক ছাত্র। স্থানীয় প্রশাসন নাটোর-রাজশাহী রোডে ১৪৪ ধারা জারি করে।
১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙলে পুনরায় সংঘর্ষ বাধে। এবার পুলিশের সাথে যোগ দেয় পাক আর্মিরা। শিক্ষক প্রক্টর শামছুজ্জোহা পাক আর্মিদের সাথে ছাত্রদের পক্ষে বাক-বিতন্ডায় জড়ান এবং ছাত্রদের উপর গুলি করতে নিষেধ করেন। কিন্তু পাক আর্মিরা যখন দেখল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাহিরে তখন তারা ছাত্রদের বাদ দিয়ে শামছুজ্জোহা স্যারকেই গুলি করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। ছাত্রদের জীবন বাচাতে অকুতোভয় বীরের মতো প্রাণ দেন পাক মিলিটারির হাতে। সকল শিক্ষকদের জন্য রেখে যান সদা অনুকরণীয় অনন্য এক দৃষ্টান্ত ।।
কিন্তু আজকের সমাজে শহীদ শামছুজ্জোহা স্যারের মতো কতজন শিক্ষক তৈরি হচ্ছেন,এটি বিশদ বিবেচনার বিষয় । আর আজকের তরুন প্রজন্মের কতজনই বা আমরা স্যারকে মনে রাখতে পারছি এটাও চিন্তার উদ্রেক ঘটায়…!!
তবে একটি কথাই বলবো,শহীদ শামছুজ্জোহা স্যারেরা ছিলেন বিধায়ই আমরা মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলতে পারি,ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা কিভাবে করতে হয় তা শিখেছি,স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে বসবাস করতে পারি,দেশোন্নয়নে ভূমিকা রাখার মতো চিন্তার খোরাক পাই ।।
ইতিহাসের রক্তিম পাতায় আপনি অমর হয়ে থাকবেন শহীদ ড.মোহাম্মদ শামছুজ্জোহা স্যার । শ্রদ্ধাবনত মস্তকে স্মরণ করছি,করব আপনাকে ।।
……………………………………..
ভূঁইয়া মোঃ ফয়েজউল্লাহ মানিক
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য,বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এবং সাবেক সহ-সভাপতি,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ ;
সাবেক সভাপতি,স্লোগান’৭১,টিএসসি,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।।
