
নারী কি শুধুই নারী। তার কি আর কোন পরিচয় হতে পারে না ? সে ও তো মানুষ । একটি শিশু জন্মের পর তার প্রথম পরিচয় হয় মেয়ে বা ছেলে হিসাবে। তার বেড়ে উঠা, লালনপালন,মায়া মমতা,অংশীদারত্ব সবক্ষেত্রেই থাকে বিভেদ। পরিবার থেকেই শুরু হয় ছেলে এবং মেয়ের পার্থক্য করা। এমন পরিবার আছে যেখানে মেয়েশিশুর জন্মকে পাপ মনে করা হয়। বংশের বাতি জ্বালাবে কে, মারা গেলে খাটিয়া ধরবে কে বা মুখাগ্নি করবে কে এসব নানা ছুতায় একটা ছেলের আশায় বার বার সন্তানের জন্ম দিতে থাকে, কখনো স্বামী পরিবারের চাপে নতুন বিয়ে করে ঘরে বউ নিয়ে আসে। কিন্তু সে বা তার পরিবারের লোকেরা কখনো কি ভেবেছে একটি ছেলের আশায় বার বার গর্ভধারণ করে নিজের জীবনকে যে হুমকির মুখে ফেলছে,স্বামী লোকটি যাকে বিয়ে করে ঘরে এনেছে কিংবা ঘরের বউটিকে কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ায় যে শ্বাশুড়ি কটুক্তি করছে তারা সবাই কিন্তু নারী,ভিন্ন রূপে।
একটা মেয়ে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে ও তার সামনে থাকে বাধা। মেয়েকে পড়িয়ে কি হবে বরং বিয়ে দিলে সংসার, স্বামী সন্তান সামলাবে এই ভাবনা নিয়ে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয় অনেক বাবা মা। মেয়েটির মনে যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সোনালী স্বপ্ন জাগে তা অঙ্কুরেই ঝরে যায় । যে মেয়েটি
তার ভাইয়ের মত ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার বা শিক্ষক হয়ে দেশ সেবার ব্রতী নিয়েছিল পরিবার আর সমাজের ইচ্ছার বলি হয়ে তাকে সংসারের চার দেয়ালে বন্দী জীবন কাটাতে হয়।
নারীকে তার কর্মক্ষেত্রে ও বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার হতে হয়। পুরুষ সহকর্মীর সমান বা তার চেয়ে বেশি দক্ষতা থাকা সত্বেও তাকে শুধু একটা মেয়ে হিসাবে দেখা হয়। তার কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন করা হয় না।সেখানে ও তাকে বিভিন্ন সময় শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
কখনো কখনো নারীকে ভোগ্যপন্য হিসাবে দেখা হয়। পন্যসামগ্রীর প্রচার প্রচারণায় নারীকে অশালীনভাবে উপস্থাপন করা হয়। তার পছন্দ অপছন্দের কোন মুল্য দেয়া হয় না।
দুই বেনী দুলিয়ে স্কুলে যাওয়া মেয়েটি একসময় তার ছোট গন্ডি পেরিয়ে বাইরের জগতে বের হতে চায়,খোলা চুলে শাড়ির আচল ছেড়ে হাটতে চায়,তার ভালো লাগা না লাগাকে প্রকাশ করতে চায়, কিন্তু সেখানে ও তাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শোষণের স্বীকার হতে হয়,ইভটিজিং, এসিড সন্ত্রাস কখনো বা ধর্ষণের শিকার হতে হয়।আর এর অজুহাত হিসাবে মেয়েটির স্বাধীনভাবে চলার ইচ্ছা বা তার বেপর্দা চলাকে দায়ী করা হয়। অথচ তিন বছরের একটি মেয়ে শিশু যে স্বাধীনতা কি জানে না কিংবা আপাদমস্তক বোরখার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখা মেয়েটিও এসিড সন্ত্রাস বা ধর্ষণ নামক সহিংসতার হাত থেকে রেহাই পায় না।
আর মেয়েরা যে সব সময় বাইরের অপরিচিত মানুষের জিঘাংসার স্বীকার হয় তা নয়, তারা নিজ ঘরে কাছের মানুষদের নির্যাতন ও লোলুপ দৃষ্টির স্বীকার ও হয় অনেক সময় । কখনো কখনো কোন মেয়ে নিজের সন্মান রক্ষা করতে বা নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সবার কাছে সে শুধু একজন মেয়ে। তাকে মানুষ ভাবতে না পারাটাই তার প্রতি বৈষম্য আর সকল সহিংসতার মূল কারন।
বর্তমান সময়ে যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষ পদ সহ নানা উচ্চপর্যায়ে নারীরা স্বমর্যাদায় আসীন রয়েছেন সেখানে নারীর প্রতি সহিংসতা,নারী কর্মীর অবমূল্যায়ন,নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অস্বীকৃতি এ যেন নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেয়েরা তাদের নিজ মেধা এবং যোগ্যতায় ডাক্তার,ইন্জিনিয়ার,আইনজীবি,শিক্ষক,
পাইলট, ব্যাংকার,উদ্যোক্তা এমন কি হিমালয় চূড়ায় ও আরোহন করছে তারপর ও এই
সমাজ সভ্যতা একটি মেয়ের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতে চায় না। তাই তার মানুষ হিসাবে টিকে থাকার সংগ্রাম অনুচ্চারিত থেকে যায়।
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে নারী উন্নয়নে ব্যাপক সক্রিয়। নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইতিবাচক ও আন্তরিক ভূমিকার কথা সর্বজনবিদিত। আর সে কারণে তার খ্যাতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ‘প্লানেট ফিফটি-ফিফটি’ ও ‘এজেন্ট অব চেইঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ সহ একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক ইচ্ছার কারণে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে নারীদের অবস্থান আগের চেয়ে সুসংহত হলেও সমাজে তার প্রভাব পুরোটা পড়েছে এটা বলা যাবে না।
এই সমাজের কিছু মানুষের কাছ থেকে নারীরা এখনো যথাযথ সম্মান পাচ্ছে না। তারা মনে করে নারীর কোন পৃথক সত্বা থাকবে না, পুরুষের ইচ্ছায় তাকে চলতে হবে।ধর্মের নাম নিয়ে যারা রাজনীতি করে তারা এবং উগ্র ইসলাম পন্থিরাও নারীদের ক্ষমতায়নে বরাবর বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।অথচ ইসলাম ধর্ম সহ প্রায় সকল ধর্মেই নারীর সন্মান এবং অধিকার প্রদানের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।
বিগত কয়েক দশকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ এবং শিশু সুরক্ষায় বাংলাদেশে আইনী কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে এবং সরকারি বেসরকারি নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে; কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারীদের প্রতি পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। প্রসঙ্গক্রমে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই এর কারন।তাই শুধু মাত্র
আইন করে বা রাস্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহন করে কখনো কারো অধিকার বা সন্মান রক্ষা করা যাবে না এজন্য দরকার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন,ব্যাপক পারিবারিক এবং সামাজিক আন্দোলন। রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার এবং সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। একজন মেয়ে বা নারীকে অসন্মান করার সময় পুরুষদের ভুলে গেলে চলবে না যে তার গর্ভধারিণী মা,তার জীবন সঙ্গী, তার কন্যা বা তার আদরের বোনটিও একজন নারী। তাদের সাথে ও কখনো কেউ খারাপ আচরণ করতে পারে। তাই একটি মেয়ে বা একজন নারীকে শুধু নারী হিসেবে না দেখে একজন মানুষ হিসাবে ভাবতে হবে। তাকে তার প্রাপ্য অধিকার ও সন্মান দিতে হবে। আমি মনে করি বিশ্বের সব নারীকে সন্মান করলেই তার মা,বোন,স্ত্রী,কন্যাকে সন্মান দেখানো হবে এবং তারা সন্মান পাবে।
উম্মে কুলসুম মুন্নি
লেখক ও আইনজীবী
ঢাকা।
