
।। ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম।। রাসেল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। ক্লাসে বরাবরই প্রথম স্হান অধিকার করে। মেধাবী এবং ভালো ছেলে বলে এলাকায় তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। এজন্য স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ সবাই তাকে প্রচন্ড স্নেহ করেন। পাড়াতেও তার কদর। রাসেলের পিতা স্হানীয় এক এনজিও-র প্রধান কর্মকর্তা। মা গৃহিণী। সে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্নের শেষ নেই। বাবার ইচ্ছে ইন্জিনিয়ার এবং মায়ের ইচ্ছে ডাক্তার হবে। বাবা-মা তাকে নিয়ে সবসময় স্বপ্নের জাল বুনেই চলেন। তাইতো মা তাকে সবসময় বুকের মধ্যে আগলে রাখেন। খাওয়া-দাওয়া, গোসল করানো, লেখাপড়া শেখানো সব ক্ষেত্রেই রাসেলকে মা দেখাশোনা করে থাকেন। এমনকি স্কুলে নিয়ে যাওয়া এবং ছুটি শেষে বাসায় ফিরিয়ে আনা সবকিছুই তিনি করেন। রাতে রাসেল মায়ের পাশে শুয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। কখনও ঘুম না এলে মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে রুপকথার গল্প কিংবা ঘুমপাড়ানির গান শোনান। কিছুক্ষনের মধ্যেই রাসেল ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু এতো সুখ রাসেলের কপালে সইল না।
প্রতিদিনের মতো আজও রাসেলকে নিয়ে তার মা স্কুলে পৌঁছে দিয়ে দুপুরে স্কুল শেষে বাসায় ফেরার পথে কেন জানি তাকে বলেন, খোকা আমি যেদিন থাকবোনা সেদিন তুই আমাকে ছাড়া থাকতে পারবি তো? আমার অবর্তমানে তুই লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবি। সবসময় ভালো পথে থেকে জীবন যাপন করবি। মা তুমি দোওয়া করো।কিন্তু হঠাৎ এধরনের কথা বলছো কেন? রাসেল অবাক দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে দেখে মায়ের দু’চোখে পানি। মা তুমি কাঁদছো? কই নাতো? চোখে কী যেন পড়েছে। মা মাথা ঘুরিয়ে চোখের পানি মুছে কান্না আড়াল করার চেষ্টা করেন। রিকশা বাসার কাছাকাছি আসার পথে হঠাৎ একটি ট্রাক পেছন থেকে রিকশাকে ধাক্কা দিলে রাসেলের মা ছিটকে মাটিতে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারান। রাসেলও পড়ে যেয়ে সামান্য আহত হয়। সে দ্রুত উঠে মায়ের কাছে যায়। দেখে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে মা অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন। তার মাথা দিয়ে প্রচুর রক্ত বের হচ্ছে। অবস্থা মুমুর্ষ। মায়ের এ অবস্থা দেখে রাসেল চিতকার করে কেঁদে ওঠে। এ্যাকসিডেন্টের কারনে এরই মধ্যে সেখানে অনেকেই ছুটে আসেন। তাদের কয়েকজনের সহায়তায় রাসেল মাকে নিয়ে হাসপাতালে যায়।
হাসপাতালে পৌঁছার পর কর্তব্যরত ডাক্তার রাসেলের মাকে মৃত ঘোষণা করেন। মাথায় গুরুতর আঘাতের কারনে তিনি অনেক আগেই মৃত্যুবরন করেছেন। মায়ের মৃত্যুর কথা শুনে ছোট্ট রাসেলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সে কেঁদে কেঁদে হাসপাতালের টেলিফোনে তার বাবাকে মায়ের মৃত্যুর খবর জানিয়ে দ্রুত হাসপাতালে আসার জন্য বলে। এরপর মায়ের লাশের কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে অনবরত কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে, মাগো তুমি আমাকে ছেড়ে এভাবে চলে গেলে কেন, এখন কে আমাকে দেখবে, কে খাওয়াবে, কে আদর করবে, কে স্কুলে নিয়ে যাবে, রাতে কাকে জড়িয়ে ঘুমাবো, কে ঘুম পাড়ানির গান শোনাবে? তার কথা শুনে এবং এ হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে উপস্থিত কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননা। কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া। অনেকেই কেঁদে ফেলেন। কিছুক্ষনের মধ্যে তার বাবাসহ অনেকই হাসপাতালে আসেন। রাসেল তার পিতাকে দেখে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কাঁদতে থাকে। বাবাও কেঁদে কেঁদে রাসেলকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকালে মাকে যখন কবরের ভেতরে নামানো হয় তখন রাসেল কেঁদে বলে, মাগো আামাকে তোমার সাথে নিয়ে যাও। তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচবো, আমার তো কেউ রইলোনা। এসময় বাবাসহ অনেকেই তাকে সমবেদনা জানান। কিন্তু রাসেল কেঁদেই চলে। মায়ের দূর্ঘটনার পর থেকে সেই যে কেঁদে চলেছে এখন পর্যন্ত তাকে কেউ থামাতে পারেনি। অতিরিক্ত কাঁদার জন্য চোখের পানি ফুরিয়ে গলার স্বর ভেঙে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তবুও থামার নাম নেই।
মাটি হবার পর সবাই চলে গেলেও রাসেল কবরস্থানে তার মায়ের কবর জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে এবং বলে, মাগো আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলে কেন, আমি কী অপরাধ করেছি, মাগো তুমি স্বার্থপর, আমার কথা একবারও ভাবনি? এজন্যই কী মৃত্যুর আগে বলেছিলে, যেদিন থাকবেনা সেদিন তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো কী না? মনে হয় তুমি বুঝতে পেরেছিলে, তুমি থাকবেনা। তাহলে কেন আমাকে রেখে গেলে? এসময় বাবা তাকে বুঝিয়ে বাসায় নিয়ে যান। রাসেল যেতে যেতে বারবার পেছন ফিরে মায়ের কবরের দিকে তাকায়। এসময় তার দু’চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। তাকে মায়ের কবর ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না। বাবা একপ্রকার জোর করেই তাকে নিয়ে যান।
প্রায় পনেরদিন পর রাসেল একাই স্কুলে যায়। যাবার সময় বাবাকে সঙ্গে যেতে বলেছিল, কিন্তু অফিস আছে বলে বাবা যেতে চাননি। রিকশায় স্কুলে যাবার সময় মায়ের কথা তার খুব মনে পড়ছিল। মা বেঁচে থাকলে কী তাকে একাই স্কুলে যেতে হতো? স্কুলে যাবার সময় মা কত গল্প শোনাতেন। রিকশা থেকে যাতে পড়ে না যায় সেজন্য রাসেলকে জড়িয়ে ধরে রাখতেন। মাঝে মাঝে চলতি পথে চিনা বাদাম কিনে খোসা ছাড়িয়ে খাইয়ে দিতেন। কখনও আইসক্রীম। আবার কখনও চকলেট, চানাচুর কিনে খাওয়াতেন। এখন কে খাওয়াবে, কে স্কুলে নিয়ে যাবে, কে আদর করবে? এসব ভাবতে ভাবতে রিকশা স্কুলের গেটে এসে থামে। স্কুলে ঢুকতেই প্রধানশিক্ষকসহ অন্যান্য স্যার এবং সহপাঠীরা ছুটে এসে সমবেদনা জানায়।
সামনে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা। তাই রাসেল আগের চেয়ে আরও বেশি মনোযোগী হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করে। রাসেল খেয়াল করে মায়ের মৃত্যুর পর কয়েকসপ্তাহ তার বাবা খোঁজ খবর নিলেও ইদানীং আগের মতো আর নেননা। সারাদিন কার সাথে যেন কথা বলে হাসাহাসি করেন। মা মারা যাবার পর কয়েকদিন বাবার মন খারাপ থাকলেও ইদানীং সবসময় হাসিখুশি এবং খোশমেজাজে থাকেন। তার এধরনের আচরনের কারন রাসেল বুঝে উঠতে না পারলেও মোটেও ভালো লাগেনা। মা মারা যাবার পর বাবা তাকে নিয়ে একসাথে থাকলেও ইদানীং তাকে রাত্রিতে পাশের ঘরে শোবার ব্যবস্হা করেছেন। রাত্রিতে একা থাকতে রাসেলের খুবই কষ্ট হয়, ভয়ও লাগে। বিছানায় শুয়ে সারারাত এপাশ ওপাশ করে মায়ের কথা ভাবে। আহারে মা থাকলে কী একা শুতে হতো? ওদিকে পাশের রুম থেকে তখন বাবার হাসির শব্দ ভেসে আসে। তিনি মোবাইলে কার সাথে যেন গভীর রাত পর্যন্ত হাসাহাসি করে কথা বলে রাত কাটিয়ে দেন। এসব দেখে রাসেল মনে কষ্ট পেয়ে চুপিসারে কেঁদে মায়ের অভাব তীব্রভাবে অনুভব করে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে দেয়।
দু’মাস পরের কথা। রাসেল বৃত্তি পরীক্ষার কোচিং শেষে বাসায় ফিরে দেখে যে তার মায়ের ঘরে একজন মেয়ে মানুষ। বাসায় ঢুকতেই বাবা বলে ওঠেন, ইনি তোমার নতুন মা। আজ সকালে কাজী অফিস যেয়ে তাকে বিয়ে করে এনেছি। তিনি আমার অফিসেই চাকরি করেন। বাবার কথা শুনে রাসেল বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চরম ব্যাথিত হয়। মা মারা যাবার দু’মাস যেতে না যেতেই তার বাবা আবার বিয়ে করেছেন। এখন সে বুঝতে পেরেছে গভীর রাত পর্যন্ত বাবা কার সাথে কথা বলে হাসাহাসি করতেন। নতুন মাকে সালাম জানাতেই তিনি সালামের উত্তর না দিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক এবং ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে ওঠেন, এটাই তোমার সুপুত্র। চেহারা দেখে তো মনে হয় ভিজাবিড়াল। প্রথম দিনেই নতুন মায়ের এধরনের তিক্ত কথা শুনে রাসেলের মন খারাপ হয়ে চোখে পানি আসে। ভাবে, তাকে না দেখে, তার সম্পর্কে না জেনে প্রথম দেখাতেই তার এমন আচরন? ভবিষ্যতে কী যে হবে তা অনুমান করতে পেরে রাসেল ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এসময় তার বাবা কোনো কথা না বলে নিশ্চুপ থেকে নতুন স্ত্রীর কথায় সমর্থন জানান। এই ছোড়া, এখন থেকে তুই বাহিরের ঘরে থাকবি, ওখানে তোর সঙ্গে থাকবে কাজের ছেলে রহিম। হতচ্ছাড়া দাঁড়িয়ে কী দেখছিস। আমার কথা কানে যায়না? এই মুহূর্তে বাইরের ঘরে গিয়ে ওঠ। তা নাহলে তোর বিছানা এবং বইপত্র ছুড়ে ফেলে দেব। নতুন মায়ের কর্কশ কথায় রাসেল বাধ্য হয়ে তার বিছানা এবং বইপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাহিরে কাজের ছেলে রহিমের ঘরে ওঠে। এখন থেকে সে সেখানেই থাকবে।রাসেল ভেবেছিল তার বাবা বাঁধা দেবে। কিন্তু তিনি দাঁড়িয়ে থেকে নতুন মাকে নীরবে সমর্থন জানান যা রাসেলের দৃষ্টি এড়ায় না। রহিমকে নতুন মা কাজের ছেলে হিসেবে সঙ্গে করে এনেছেন। প্রথম দিনেই রাসেল বুঝতে পেরেছে, এ বাড়িতে রহিমের যা কদর তা তার নেই। নতুন মায়ের ভাবসাবে মনে হয় সেই এ বাড়ির কাজের ছেলে।
ইদানীং বাসায় নতুন মায়ের অত্যাচারের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলে। কথায় কথায় নতুন মা রাসেলকে মারপিট করেন। খরচের অজুহাতে তার পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছেন। তাকে দিয়ে কাপড় ধোয়ানো, বাজার করা, ঘর ঝাড় দেয়া ও মোছানো প্রতিদিনের ব্যাপার। কোনো কোনো সময় তাকে কাজের ছেলে রহিমের ময়লা কাপড়চোপড় ধুয়ে দিতে হয়। তা নাহলে রহিম অহেতুক রাসেলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে বকাবকি এমনকি মার পর্যন্ত খাওয়ায়। একারনে নতুন মা মাঝে মাঝে তাকে খেতে দেননা। বাধ্য হয়ে মুখ বন্ধ করে সবকিছু সহ্য করে যায়। তাছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।
একদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে বাবা ও নতুন মা দেখেন যে রাসেল বাসায় নেই। কোথাও খোঁজ করে না পেয়ে থানায় ডাইরি করেন। কিন্তু তবুও রাসেলকে পাওয়া যায়না। সে ঢাকায় গিয়ে একটি এতিমখানায় ভর্তি হয়। বাবা বেঁচে থাকা সত্বেও সে এতিম। রাসেল শুধু তার মায়ের স্মৃতি মনে রেখে অতীতের সব স্মৃতিকে ভুলে যেতে চায়, এমনকি তার বাবাকেও।
কারন সে তো এতিম, এ পৃথিবীতে তার কেউ নেই।

লেখক ও কলামিস্ট।
রাজশাহী বাংলাদেশ।
১০, মার্চ ২০২১
