শওকত আলী ॥
প্রকৃতির অমোঘ আগমন বার্তায় অনুভূত হচ্ছে শীতের ঠান্ডা ভাব। আবার ভোরের মিষ্টি আলোয় ফসল ও ঘাসের উপর ছড়ানো শিশিরের হাজরো বিন্দু মুক্তো দানার মতো চিকচিক করছে। শহরেও শীতের আবহাওয়া বইছে। বাংলার গ্রামীণ জনপদে শীত হাজির হয় নানান বৈচিত্রের সম্ভারে। আসলেই শহরবন্দর গ্রাম নতুন আঙ্গিকে সাজে। মাত্রা পায় খাবার দাবারেও।
গ্রামের মত শহরের বাড়িতে বাড়িতে পিঠা পুলির পসলা না বসলেও রাস্তার মোড়ে মোড়ে ঠিকই মৌসুমী ব্যবসায়ীরা দোকান নিয়ে বসেন। শীতে পিঠা খাওয়ার রীতি যেন বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতিরই অংশ।
শীত আসলেই গ্রাম গঞ্জে পিঠা-পুলি তৈরির ধুম পড়ে যায়। আর শহুরে জীবনে এই আনন্দ অনেকটাই মলিন হলেও শীতে চাঁদপুর শহরের ফুটপাথে পিঠার দোকান নিয়ে বসেন অনেকে। সন্ধ্যার পর হরেক রকম পিঠার স্বাদ আর গন্ধ মুগ্ধ করে নগরবাসীকে। এই পিঠা তৈরি করেই শীতের সময় অনেকে সংসার চালান। তারা প্রতিদিন তৈরি করেন ভাপা পিঠা, পুলি পিঠা, তেল পিঠা ও চিতই পিঠাসহ আরো নানা রকমের পিঠা।
মৌসুমী পিঠা ব্যবসায়ীরা মোড়ে মোড়ে ভাপা পিঠার দোকান নিয়ে বসে পড়েছেন। আর সাধারণ মানুষও খাচ্ছেন এসব ধোয়া-ওঠা গরম পিঠা। অনেকেই মৌসুমী এই ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েছেন। তেমন একটা পুঁজি লাগে না বলে সহজেই এ ব্যবসা শুরু করা যায়। কিছু গুড়, আটা, নারিকেল নিয়ে খুলে বসেছেন মৌসুমী ব্যবসা।
গ্রামের বাড়িতে শীতের পিঠা পুলি তৈরি হলেও নগর সভ্যতার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। শহরে যাদের বসবাস নাগরিক ব্যস্ততার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ঘরে বানানো পিঠা খেতে পারেন না তারা। তাই রাস্তার মোড়ে মোড়ে জমে ওঠা বাহারি পিঠার দোকানই তাদের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার জীবিকার জন্য যারা শহরে এসে রিক্সা, অটোরিকশা, ব্যাটারি চালিত গাড়িসহ শ্রমিকের কাজ করছেন তারাও পরিচিত পিঠার এসব দোকানে ভীড় জমাচ্ছেন।
এবারের শীতকে সামনে রেখেও চাঁদপুর শহরের পাড়া মহল্লা ও বিভিন্ন রাস্তার পাশে ইতোমধ্যেই পিঠার দোকান নিয়ে বসেছেন পিঠা বিক্রেতারা। শহরের বাস স্ট্যান্ড, চিত্রলেখার মোড়, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আশপাশ, ছায়াবানির মোড়, কালিবাড়ি মোড়সহ বিভিন্ন স্থানের অলিগলির মুখে পিঠার দোকানও বসেছে।
অলিতে-গলিতে, মোড়ে-মোড়ে গড়ে উঠা এসব পিঠার দোকানে অফিসগামী কিংবা বাড়ি ফেরার পথে অনেকেই পিঠার স্বাদ নিতে আসছেন।
শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পিঠা বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দোকান গুলোতে পিঠা বলতে বেশির ভাগ পাওয়া যায় ভাপা ও চিতল পিঠা। তাই মৌসুমি এই পিঠার প্রতি অনেকের বেশ আগ্রহও দেখা যায়। বছরের সাময়িক সময়ের এই পিঠার বাজার এখন থেকেই জমে উঠেছে।
এক পিঠা বিক্রেতা জানান, তিনি ৬ বছর ধরে এখানে পিঠা বিক্রি করেন। এখানে মূলত আমরা ভাপা পিঠা বিক্রি করি। আর সারা বছরতো পিঠা বিক্রিও করা যায় না। শীতের সময় মানুষের ভাপা পিঠার প্রতি টান থাকে। তাই মৌসুমের এই সময়টাতেই আমি ভাপা পিঠা বিক্রি করি।
শহীদ মিনার এলাকায় মৌসুমের শুরুতেই ভাপা পিঠার দোকান দিয়েছেন রশিদা বিবি। সন্ধ্যায় ভাপা পিঠা বিক্রি করি। বিকেল ৩টার দিকে এখানে এসে চালের আটা দিয়ে ভাপা পিঠা তৈরি করে বিক্রি করি। সন্ধ্যার আগে এবং পরে বিক্রি বেশি হয়। তিনি বলেন, ৪ কেজি আটার ভাপা পিঠা বিক্রি করতে পারলে প্রায় ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকা লাভ হয়।
রশিদার মত শহরের ফুটপাতে বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ পিঠার দোকান ঘুরে দেখা যায়, প্রতি পিচ ভাপা ৫টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পিঠা খেতে আসা ব্যাটারি চালিত অকোরিকশা চালক রফিকুল ইসলাম জানান, শীত মানেই ভাপা পিঠা খাওয়ার সময়। ছোট বেলায় গ্রামের বাড়িতে খেজুরের গুড় দিয়ে ভাপা পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা। আবার গরম গরম এই পিঠা খেলে স্বাদ ভাল পাওয়া যায়।
এক কলেজের শিক্ষার্থী ওবায়দুল্লাহ বলেন, ছোট বেলায় ভাপা পিঠা খাওয়ার মধুর স্মৃতি মনে করতে গিয়ে, ছোট বেলায় মায়ের হাতের ভাপা পিঠার অন্যরকম স্বাদ। সেরকম স্বাদ দোকানে পাওয়া যায় না। তবে এখন সকাল সন্ধ্যা ভাপা পিঠার গন্ধে মুখর নগরীর অলি-গলি। তাই সেই স্বাদ না পেলেও গন্ধ কিন্তু মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এই শীতে ফুটপাতের পিঠাওয়ালা ভদ্রঘরের অভিজাত গৃহবধূদের মুক্তি দিয়েছে পিঠা তৈরির কষ্ট থেকে। শীতে পরিবারের সবাই নানা পিঠা খেতে উৎসাহী হয়। গ্রাম থেকে শহরের সকল পরিবারেই এ চাহিদা। কিন্তু এ পিঠা তৈরিতে নানা ঝক্কি। দরকার পড়ে নানা উপকরণ। তার সঙ্গে লাগে অভিজ্ঞতা। সব মিলে অন্যসব খাবারের মত সহজে তৈরি করা যায় না শীতের পিঠা। সামর্থেরও প্রয়োজন পড়ে। অনেকের সংসারে অধিক মূল্যের চিনি, গুড়, দুধ কেনা কষ্টসাধ্য। তাদের কাছে পিঠা খাওয়া সুস্বাধু। কিন্তু তারপরও তাদের পিঠা খাওয়া বন্ধ থাকছে না। দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের পিঠা খাওয়ার জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা প্রায় অর্ধশতাধিক পিঠার দোকান। আর এ সমস্ত দোকানের পিঠা খেয়েই স্বাদ মিটায় তারা।
শিরোনাম:
বুধবার , ২৬ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ , ১১ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এই ওয়েবসাইটের যে কোনো লেখা বা ছবি পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে ঋন স্বীকার বাঞ্চনীয় ।
