দ্বিতীয় শ্রেণীর অদক্ষ মাস্টার দিয়ে লঞ্চ চালানোর খেসারত দিতে হলো চাঁদপুর রেলওয়ে হকার্স মার্কেট ব্যবসায়ীদের। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাদের আর কুয়াকাটা-সুন্দরবন ভ্রমণ করা হলো না। রাতের অাঁধারে পাঁচ শতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি চরে আটকে গেলে ২৩ ঘন্টা তাদেরকে সেখানে থাকতে হয়। অবশেষে ভ্রমণ ছাড়াই দুঃখ ও ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তাদের চাঁদপুরে ফিরে আসতে হলো।
চাঁদপুর শহরের সর্ববৃহৎ বিপণী বিতান চাঁদপুর রেলওয়ে হকার্স মার্কেট। এ মার্কেটের নির্বাচিত ব্যবসায়ী সমিতি এ বছর আনন্দ ভ্রমণের লক্ষ্যে কুয়াকাটা ও সুন্দরবন সফরের উদ্দেশ্যে গত ১ মার্চ বৃহস্পতিবার শহরের মুখার্জী ঘাট থেকে তিনতলা লঞ্চ নিয়ে যাত্রা করে। এদিন রাত সাড়ে ১০টায় ৫ শতাধিক যাত্রী তথা মার্কেট ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আল-আরাফ শিপিং কর্পোরেশনের যাত্রীবাহী লঞ্চ অভিযান-৭ কুয়াকাটা সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। রাত অনুমান পৌনে ৪টায় বোরহান উদ্দিন থানার দেউলার চরে লঞ্চটি উঠিয়ে দেয় মাস্টার। এ সময় থেকে দীর্ঘ ২৩ ঘণ্টা লঞ্চটি দেউলার চরে আটকা থাকে। এ সময়ে যাত্রীরা ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ভ্রমণের এ লঞ্চটিতে পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিশুদের সংখ্যাও কম ছিলো না। কেননা মার্কেটের ব্যবসায়ীরা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে এই ভ্রমণে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু তাদের কুয়াকাটা ও সুন্দরবন ভ্রমণের স্বপ্ন যেনো দেউলারচরে আটকা পড়ে ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। ২৩ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১০ ঘণ্টার মতো সকলকে থাকতে হয়েছে অন্ধকার ও পানিবিহীন অবস্থায়। লঞ্চটি চরে আটকা পড়ার সাথে সাথেই জেনারেটর বন্ধ হয়ে যায়। অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায় পুরো লঞ্চের ভেতর। এতে করে যাত্রীরা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
যাত্রীরা জানান, লঞ্চের প্রথম শ্রেণির মাস্টার ইউনুছ বেপারী লঞ্চটি চালানোর কথা থাকলেও তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। লঞ্চটি তখন চালান দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার মোঃ জাফর হোসেন। যার জন্যে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেন। এদিকে লঞ্চটি চরে আটকা পড়ার পর যাত্রীদেরকে লঞ্চের মাস্টার মোঃ জাফর জানান, শুক্রবার দুপুর ১২টায় জোয়ার আসলে লঞ্চটি নামানো হবে। আর যদি লঞ্চ নামানো না যায়, তাহলে তাদের কোম্পানীর আরেকটি জাহাজ এনে কুয়াকাটার পথে যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হবে। যাত্রীরা জানান, কোম্পানীর অভিযান-৫ লঞ্চটি আসার কথা থাকলেও সেটিও পরে আর আসে নি। নিরুপায় হয়ে ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ বোরহান উদ্দিন থানার সহযোগিতা চাইলে তাৎক্ষণিক থানার এসআই মামুনের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা এসে যাত্রীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। কিন্তু যাত্রীরা ২৩ ঘণ্টা আটকে থাকলেও লঞ্চ কর্তৃপক্ষ একবারও তাদের খোঁজ খবর নেয়নি।
লঞ্চের প্রথম শ্রেণীর মাস্টার ইউনুছ বেপারী জানান, রাতে নদীতে প্রচ- কুয়াশা পড়েছিল। যার জন্যে মাস্টার জাফর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেউলারচরে জাহাজটি উঠিয়ে দেয়। তিনি আরও জানান, রাত পৌনে ৩টায় তিনি ঘুমিয়ে পড়লে এ ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে শুক্রবার দিবাগত রাত ২টায় জোয়ার আসলে লঞ্চটি চর থেকে নামানো হয়। এরপর আমরা কুয়াকাটা যেতে চাইলে যাত্রীরা লঞ্চটিকে চাঁদপুর নিয়ে আসে।
রেলওয়ে হকার্স মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন আনু জানান, গত ৭ ফেব্রুয়ারি আল-আরাফ শিপিং কর্পোরেশনের মালিক পক্ষের সাথে ঢাকার সদরঘাট এলাকার অফিসে গিয়ে কুয়াকাটা যাওয়ার জন্যে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকায় অভিযান-৭ লঞ্চটি ভাড়া করে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। ওই চুক্তিনামা অনুযায়ী ভিআইপি কেবিনে লঞ্চের মালিক আমাদের সাথে কুয়াকাটা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আমাদের সাথে যাননি। লঞ্চটি চরে আটকা পড়লে লঞ্চের লোকজন যারা ছিল তারা আমাদের সাথে রুঢ় আচরণ করেন। তিনি জানান, লঞ্চ কর্তৃপক্ষ টাকা বুঝে পাওয়ার পর আমাদের যাত্রা শুরু হয়। লঞ্চটি ২৮ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর শহরের মুখার্জী ঘাট এলাকায় আসার কথা থাকলেও তা আসে ১ মার্চ সন্ধ্যায়। রাত সাড়ে ১০টায় আমাদের যাত্রা শুরু হয়। তিনি আরো জানান, চুক্তি হওয়ার পর থেকে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ আমাদের সাথে অন্য ধরনের আচরণ শুরু করে। মালিক আমাদের সাথে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি আমাদের সাথে যাননি। এতে করে আমাদের মনে হয় লঞ্চটির কাগজপত্রের কোনো বৈধতা নেই। যার জন্যে চুক্তিনামা হলেও তাদের কাগজে উল্লেখ করা হয় কুয়াকাটার পরিবর্তে আমতলি ও সুন্দরবন। তারা আমাদেরকে বিপদে ফেলার জন্যে এ ধরনের কাজ করেছে। আমাদের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে এবং কেনো আমাদেরকে নাজেহাল করা হয়েছে এর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত লঞ্চটি চাঁদপুর নৌ পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। গতকাল ৩ মার্চ বিকেল ৫টায় অভিযান-৭ লঞ্চটি চাঁদপুর শহরের মুখার্জী ঘাটে এসে পেঁৗছলে যাত্রীরা সবাই যার যার বাসা-বাড়িতে চলে যান।
এদিকে লঞ্চটি চাঁদপুর এসে পেঁৗছলে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা লঞ্চটি ভাংচুরের চেষ্টা চালালে লঞ্চে অতিথি যাত্রী হিসেবে থাকা চাঁদপুর পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান বাবুলের হস্তক্ষেপে তা আর হয় নি। তবে লঞ্চটি নৌপুলিশের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জানা গেছে, লঞ্চ মালিক পক্ষ ও মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দের মধ্যে এ নিয়ে রফাদফা চলছে।
