আওয়ামী লীগের নাছির উদ্দিন, বিএনপি’র শফিক ভুঁইয়া, অ্যাডঃ সেলিম, আক্তার মাঝি, মিশন ও কাজী জুয়েল মেয়র প্রার্থী হিসেবে এখন মাঠে
চাঁদপুর: চলতি মে মাসের যে কোন দিন বহুল প্রত্যাশিত ঐতিহ্যবাহী চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনের নতুন তফসিল ঘোষিত হতে যাচ্ছে। এমন খবরে নড়ে চড়ে বসেছে সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। তারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন কৌশলে নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন। যথারীতি এলাকা সফর করে ভোটারদের দ্বারস্থ হচ্ছেন এবং গণসংযোগসহ কুশল বিনিময় করছেন। রাজনৈতিক প্রধান দুই দলের জন্য চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচন প্রেস্টিজ ইস্যু হিসেবে দেখছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশেস্নষক মহল। মেয়র প্রার্থী হিসেবে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তাদের নাম এখন শহর জুড়ে বেশ আলোচিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে বর্তমান মেয়র নাছির উদ্দিন আহামেদ রয়েছেন সুবিধাজনক অবস্থানে। তিনি পৌর পরিষদের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হয়ে পৌর এলাকার সীমানা বৃদ্ধি, নাগরিক সুযোগ সুবিধা বাড়ানো, পৌরবাসীর প্রধান সমস্যাগুলোর সমাধান সহ গত ৭ বছরে রেকর্ড পরিমাণ উন্নয়ন কাজ করিয়েছেন। দলের ভেতর মেয়র পদে নাছির উদ্দিন আহামেদের প্রার্থিতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সহসাই পৌরসভার নতুন নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হবে এমন নিশ্চয়তা পেয়ে নাছির উদ্দিন আহামেদ নির্বাচনী মাঠ গোছানোর কাজে নেমে পড়েছেন। গত কয়েকদিন তিনি বিভিন্ন এলাকা সফর করে এলাকাবাসীর সাথে মতবিনিময় এবং মহিলা সমাবেশও করতে দেখা যায়। গত বৃহস্পতিবার চাঁদপুর পৌর পাঠাগারে শহর আওয়ামী লীগের ম্যারাথন সভা করা হয়। এ সভার মূল লক্ষ আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এ সভায় জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের সকাল নেতাকেই উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে নাছির উদ্দিন আহামেদকে পুনরায় মেয়র নির্বাচিত করার পক্ষে তাদের শক্ত অবস্থান দলীয় সভাগুলোতে ফুটে উঠে।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী নাছির উদ্দিন আহামেদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ব্যানারে বিএনপি’র অনেকের নাম আলোচনায় শোনা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছে সাবেক পৌর চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান ভুঁইয়া। বর্তমান বিএনপির নেতৃত্বে তিনি দলের কোনো অবস্থানে নেই। শক্ত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তিনি আঁটঘাট বেঁধে নির্বাচনী মাঠে বিচরণ করছেন। তার কাছের লোক, পরিচিত বিএনপি নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে শহরের কোথাও না কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকাতে অবস্থান করছেন এবং দলীয়ভাবে তার সকল পদ পদবী স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের এবং কেন্দ্রীয়ভাবে যাতে তাকে একক প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেয়া হয় তার জন্য কেন্দ্রে জোর লবিং চালাচ্ছেন।
অপর মেয়র প্রার্থীর মধ্যে আছেন চাঁদপুর পৌর বিএনপি’র সভাপতি অ্যাডঃ সলিমউল্লাহ সেলিম, সাধারণ সম্পাদক আক্তার হোসেন মাঝি, জেলা যুবদলের সভাপতি শাহজালাল মিশন ও তরুণ ছাত্র নেতা কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম জুয়েল। এছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আরেকজন মেয়র প্রার্থীর নাম চমক হিসেবে থাকছে। তিনি বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন চাঁদপুরের নেতা, শহর বিএনপিকেও দীর্ঘ দিন নেতৃত্ব দিয়েছেন। পেশায় প্রবীণ একজন আইনজীবী এবং সাংবাদিকদের নেতাও। সামাজিক অবস্থানও তার সুদৃঢ়। এদের মধ্যে সলিম উল্লাহ সেলিম বিএনপি’র জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতার একজন। অনলবর্ষী একজন বক্তা হিসেবে তার বেশ পরিচিতি রয়েছে। আদি গ্রামের বাড়ি ফরিদগঞ্জ উপজেলায় হওয়ায় তার ১০ থেকে ১৫ হাজার রিজার্ভ ভোট রয়েছে বলে একটি সূত্রে জানা যায়। মেয়র প্রার্থী হিসেবে তার বেশ জনপ্রিয়তা এবং যোগ্যতা রয়েছে।
আরেকজন মেয়র প্রার্থী আক্তার হোসেন মাঝি। চাঁদপুরের বিএনপি’র ছাত্র রাজনীতি থেকে তার উত্থান। তিনি ছাত্রদল থেকে চাঁদপুর সরকারি কলেজে নির্বাচিত ভিপিও ছিলেন। বর্তমানে পৌর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তার মেয়র প্রার্থিতায় ব্যক্তিগতভাবে আলাদা একটা ইমেজ রয়েছে। তিনি গত নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ভোটারদের কাছে তার পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। তিনি এবারও প্রার্থী হচ্ছেন বলে জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।
আরেক মেয়র প্রার্থী মোঃ শাহজালাল মিশন। চাঁদপুরের বিএনপি তথা ছাত্র রাজনীতিতে তাকে শহরবাসী খুব ভালভাবেই চেনেন ও জানেন। তিনি ছাত্রদলের জেলার নেতৃত্ব সহ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। চাঁদপুরের যুব সমাজের এবং সুধী মহলের কাছে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এখন বিএনপি’র যুব চালিকা শক্তির প্রধান শাহজালাল মিশন। জেলা যুবদলের সভাপতি। গত বুধবার জেলা যুবদলের বিশাল পরিসরে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সে সভায় জেলা যুবদলের পৰ থেকে তাকে মেয়র প্রার্থী দাবি করে সিদ্ধানত্দ নেয়। মেয়র প্রার্থী হিসেবে তারও বেশ সুনাম, জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
অপরদিকে আরেক মেয়র প্রার্থী কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম জুয়েল। জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন তিনি নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তার আলাদা বৈশিষ্ট্য হলো সে নিজেকে শুধুমাত্র ছাত্রদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বিএনপি’র জেলা ও শহর পর্যায়ে অঙ্গ ও সহযোগী অনেক সংগঠনের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজের অবস্থানকে সাধারণ নেতা-কর্মীদের কাছে অনেক গ্রহণযোগ্য করে রেখেছেন। প্রথম থেকেই ইব্রাহিম কাজী জুয়েল চাঁদপুর পৌরসভার তরুণ নেতা হিসেবে মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন এবং তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় নেতা-কর্মীরাও তাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায়। সামাজিক কর্মকাণ্ডে এবং সাংবাদিকদের দৃষ্টিতে জুয়েলের আলাদা ইমেজ রয়েছে বলে অনেকেরই ধারণা। বিএনপি’র দুঃসময়ে অর্থাৎ ১/১১ সময়ে যখন চাঁদপুরে বিএনপি নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে ছিলেন তখন ইব্রাহীম কাজী জুয়েল সাহসী ভূমিকা রেখে সাধারণ নেতা-কর্মীদের পাশে ছিলেন এবং বিএনপি’র চেয়ারপার্সনের সাথে টেলি কনফারেন্সও করেছিলেন। মেয়র প্রার্থী হিসেবে তার নাম বেশ আলোচিত হচ্ছে।
এখানে উল্লেখ্য, চাঁদপুর পৌরসভার আসন্ন নির্বাচনে দলের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ এক হয়ে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পেরেছেন। অপরদিকে তাদের নির্বাচনী প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি’র মেয়র প্রার্থিতায় রয়েছে একাধিক নাম। যদিও স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় পরিচয় বা দল থেকে সরাসরি মনোনয়ন বা সমর্থন পৌর নির্বাচনে প্রার্থী দেয়া হয় না। তবুও রাজনৈতিক সমর্থন নির্বাচনী মাঠে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। এক্ষেত্রে বিএনপি মেয়র প্রার্থী নিয়ে রয়েছে চরম বিপাকে। উপরের প্রার্থীদের নাম পর্যালোচনায় এটাই এখন স্পষ্ট জেলা বিএনপিতে দীর্ঘদিন যাবৎ যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ রয়েছে সে বিরোধের জের ধরে পৌরসভায় বিএনপি’র নেতৃত্ব কার দখলে থাকবে এমন প্রতিযোগিতায় শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক, জিএম ফজলুল হক, মাহবুবুর রহমান শাহীন, সাবেক এমপি এসএ সুলতান টিটু দলীয় এমপি মনোনয়ন বিষয়ে তাদের মধ্যে যে চলমান গ্রুপিং রয়েছে সে গ্রুপিং ধরে রাখার জন্য বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী হিসেবে সব গ্রুপ থেকে প্রার্থী করার সব ধরনের কৌশল এবং হিসাব নিকাশ করা হচ্ছে বলে স্থানীয় অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পর্যালোচকরা ধরে নিয়েছে। এখন দেখার অপেক্ষা, আসন্ন চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী নাছির উদ্দিন আহামেদের সাথে নির্বাচনী মাঠে শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে আর কারা কারা থাকছে।
উল্লেখ্য, চাঁদপুর পৌরসভার এক সময় আয়তন ছিল মাত্র ৯ বর্গ কিঃমিঃ। বর্তমান পৌর পরিষদ পৌর এলাকার সীমানা বর্ধিত করে তা গেজেট আকারে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছেন। সে সুবাদে বর্তমানে চাঁদপুর পৌরসভার মোট আয়তন ২২.২৫ বর্গ কিঃমিঃ। ২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে পৌরসভার শেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নাছির উদ্দিন আহামেদ ২০০৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চেয়ারম্যান ও পরে নির্বাচিত মেয়রের দায়িত্বভার নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বর্তমান পৌর পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ভোটার হালনাগাদ ত্রুটি বিচ্যুতি এবং সংশোধন করে নতুনভাবে ভোটার হালনাগাদ কাজ সম্পূর্ণ করে নতুন নির্বাচন করার উপর উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। সে কারণে প্রায় ২ বছর যাবৎ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বর্তমান পৌর পরিষদ। সে সময় দু’দফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় এবং প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দও দেয়া হয়েছিল। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞায় সে সময় ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এখন আইনি জটিলতার অবসান হওয়ায় নির্বাচন কমিশন মেয়াদ উত্তীর্ণ পৌরসভা হিসেবে চাঁদপুর পৌরসভার নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছে। যা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
