শওকত আলী, ॥
চাঁদপুরে দলিত জনগোষ্ঠীর লোকেরা তাদের পূর্ব পুরুষের পেশাগত কাজ পাচ্ছে না। তাই তারা এ পেশা বাদ দিয়ে জীবন-জীবিকার জন্য বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বিকল্প কর্মসংস্থান করে বেছে নিয়েছে। এরা এদেশের অন্য পেশার মানুষের সাথে নিজেদের জড়িয়ে কর্মসংস্থান করে যাচ্ছে। তবুও এরা সঠিকভাবে শ্রমের মর্যাদা অনুযায়ী অর্থ পাচ্ছে না। এরা অবহেলিতভাবে বেঁচে থাকছে। অনেকে শিক্ষা অর্জন করে দলিত জনগোষ্ঠীর বংশ মর্যাদা গোপন রেখে মর্যাদাপূর্ণ পেশা করে যাচ্ছে এবং এদেশের মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মেয়েদের বিয়ে করে সংসার জীবন চালিয়ে যাচ্ছে বলে অসংখ্য প্রমান পাওয়া গেছে।
দলিত জনগোষ্ঠীর পুরুষ-মহিলা, যুবক-যুবতীদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের সংবিধান অনুযায়ী দলিত, হরিজন, ডোম, ঋশি, রবিদাসসহ এ সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের মত নির্ধারিত কোঠা থাকলেও তারা জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, রেলওয়ে সংস্থা, শিক্ষা বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে দলিত জনগোষ্ঠীর লোকেরা ইন্টারভিউ দিয়ে উত্তীর্ণ হলেও তাদের কপালে চাকরী জুটে না। অদৃশ্য কালো শক্তি ও বৈষম্যের কারণে এরা অবহেলার শিকার হচ্ছে ও চাকরীর বাজার থেকে বঞ্চিতের খাতায় তালিকা ভূক্ত হচ্ছে এদের জীবনে। এদের অভিসাপ এরা কেন দলিত জনগোষ্ঠীর পরিবারে জন্ম গ্রহণ করল? এরা এদেশে তাদের সন্তানদের জীবন-জীবিকার জন্য যুদ্ধ করেও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরী পাচ্ছে না। যার ফলে পূর্ব পুরুষের পেশা বাদ দিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান বেছে নিচ্ছে। চাঁদপুর জেলার ৮টি উপজেলাসহ জেলা শহরে ঘুরে সরেজমিনে এদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে গিয়ে দেখা যায়, এরা এখন অবহেলার অভিসাপ থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত পেশায় সঠিকভাবে মূল্যায়িত না হওয়ায় ও সে পেশা সঠিকভাবে তাদের অনুকুলে না থাকায়, তারা বিকল্প কর্মসংস্থান বেছে নিচ্ছে। এরা এখন শহরের প্রাইভেট হাসপাতাল, লঞ্চঘাট, হোটেল, প্যাথলজি, স্টেশনারী ব্যবসা, যানবাহনচালক, শিক্ষকতা, পাসপোর্ট অফিস, গার্মেন্টস, রিপ্রেজেন্টিভ, রেলওয়ে চাকরী, ঔষুধের ব্যবসা, সাংস্কৃতিক যন্ত্রবাধক, চুলকাটা, পুলিশ বিভাগের পিয়ন পদে চাকুরী, কাঠ মিস্ত্রি, টেইলার্সসহ বিভিন্ন ভাল মানের পেশা বেছে নিয়ে দিন দিন এরা সেসব পেশায় এরা জড়িয়ে পড়ছে। দলিত জনগোষ্ঠীরা এখন শহরের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে নার্স, ব্রাদার ও রিসিপশেনে কাজ করে যেতে দেখা যায়। লঞ্চঘাটে টিকেট কালেকটরের কাজ করে দীর্ঘ বহু বছর যাবত দলিত সম্প্রদায় লোকেরা। শহর ঘুরে দেখা যায় দলিত জনগোষ্ঠী সুন্দর ও সুশ্রী চেহারার অধিকারী ছেলেরা হোটেল রেস্টুরেন্টগুলোতে বয়ের কাজ করে জীবন-জীবিকা সুন্দরভাবে করে যাচ্ছে পরিবারের লোকজনদের নিয়ে। অনেক দলিত সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা শহরের প্যাথলোজিতে টেকনিশয়ানের কাজ করে মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। অনেক বেকার দলিত যুবক শহরের স্টেশনের দোকানগুলোতে চাকরী করছে। এছাড়া দলিত সম্প্রদায়ের যুবকরা শহরে অটো বাইক ও সিএনজি স্কুটারসহ বিভিন্ন যানবাহনে চালকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় ঘুড়ে দেখা যায়, দলিত শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা স্কুল কলেজ পড়–য়া ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট শিক্ষা দান করে অর্থ উপার্যন করছে। অনেকট যুবক-যুবতী দেখা যায় পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্টের অফিসিয়াল কাজগুলো করছে। এমনকি কমশিক্ষিত দলিত যুবক-যুবতীরা গার্মেন্টস গুলোতে চাকরী করছে। অনেকে আবার ঔষদ কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টিবের স্থানীয় ডাক্তারের সাথে দেখা করে কোম্পানীর পক্ষে ভিজিট করছে। বাংলাদেশ রেলওয়েতে ইদানিংকালে কর্মরত থাকতে দেখা যাচ্ছে। দলিত সম্প্রদায়ের অনেক শিক্ষিত যুবক শহরে ঔষুধের ব্যবসা করে জীবন-জীবিকার চালিয়ে যাচ্ছে। এ সম্প্রদায়ের অনেক সাংস্কৃতিমনা যুবক-যুবতীদের সাংস্কৃতিক যন্ত্রবাধক, হারমনিয় অধিকার বাজিয়ে অর্থ উপার্যন করে জীবন চালাচ্ছে। শহরের পুরাণবাজারে অসংখ্য দলিত যুবক শীলের কাজ করে যাচ্ছে। তারা প্রতিদিন মানুষের চুল কেটে এক দিকে সেবা অপর দিকে অর্থ উপার্যন করছে বেঁচে থাকার তাগিদে। শহরের বিভিন্ন বেসরকারি অফিসগুলোতে অল্প শিক্ষিত দলিত যুবক-যুবতীরা পিয়ন পদে চাকরী করছে। অনেক শিক্ষা অর্জন থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ফার্ণিচারের দোকানগুলোতে কাঠ মিস্ত্রি ও নকশার কারিগরি হিসেবে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। এ পর্যায়ের অনেক যুবক বিভিন্ন ফেব্রিস্কের দোকানে টেইলার হিসেবে কাজ করে নিজেকে সাবলম্বি করে গড়ে তুলছে। এ ব্যাপারে হরিজন সম্প্রদায়ের চাঁদপুর রেলওয়ে হরিসন কলোনীর বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ চাঁদপুর শাখার সভাপতি বিজয় হরিজন বলেন, আমাদের দলিত যুবক-যুবতীরা পূর্ব পুরুষের পেশা না পেয়ে ও শিক্ষিত যুবকরা তাদের সঠিক মর্যাদা অনুযায়ী চাকরী না পাওয়ায় বেঁচে থাকার তাগিদে বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে বিভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছে। এদেরকে এদেশের সকল পর্যায়ের মানুষ সহযোগীতা করলে এরা এদেশে সঠিক অধিকার পেয়ে বেঁচে থাকার উৎসাহ পাবে। রেলওয়ে হরিজন ঐক্যতান ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বিধান চন্দ্র হরিজন জনি বলেন, অধিকার বঞ্চিত দলিত যুবক-যুবতীসহ সকল পর্যায়ের এ সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে সমাজের মানুষ সহযোগীতা করলে তারা ভবিষ্যতে আরও ভাল কর্মদক্ষতা দেখাতে পারবে সকল পর্যায়ে। পুরাণবাজার হরিজন কলোনীর শীব মন্দির কমিটির সভাপতি কানায় হরিজন বলেন, দলিত সম্প্রদায়ের মানুষগুলো তাদের কোঠা অনুযায়ী চাকরী পাচ্ছে না। সরকার তাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ সম্প্রদায়ের যুবক-যুবতীরা সুশিক্ষা অর্জন করে সমাজের উচু আসনে বসার মর্যাদা পাচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের সরকার হিসেবে বর্তমান সরকার এদেরকে সঠিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে এদের কোঠা অনুযায়ী চাকুরির ব্যবস্থা করলে এরা এদেশে ন্যায্য অধিকার পাবে।

