শাহরিয়ার খাঁন কৌশিক ঃ
ইলিশ প্রজনন রক্ষায় চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার চরআলেকজেন্ডার পর্যন্ত ১শ’ কিলোমিটার গত ৭ অক্টোবর শনিবার রাত ১২টার থেকে শুরু করে ২২ দিন ইলিশসহ সকল ধরনের মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
সরকারের নিয়মনীতি ও আইন অমান্য করে অভয়াশ্রমের ২য় দিন থেকে শুরু করে শতশত জেলে নৌকা নিয়ে পদ্মা ও মেঘনা নদীতে মা ইলিশ নিধন করতে শুরু করে।
চাঁদপুরে নৌ পুলিশের সব গুলো ফাঁড়ি পুলিশকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে মেঘনা নদীতে জেলেরা মা ইলিশ নিধনে ব্যাস্ত সময় পার করছে।
জেলে ও আড়ৎদাররা প্রতিদিন বিকাশের মাধ্যমে নৌ পুলিশকে হাজার হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে ।
চাঁদপুর হরিনা, বহরিয়া, দোকানঘর ও পুরানবাজার রওনাঘোয়াল এলাকার জেলেরা জানায়, ২২ দিনের অভয়াশ্রম শুরু হলে নৌ পুলিশ ও ফাঁড়ি পুলিশের রমরমা বানিজ্য শুরু হয়। চাঁদপুর আলুবাজার, নিলকমল নৌ পুলিশকে প্রতিদিন নৌকা প্রতি ২ থেকে ৩ হাজার হরিনা ও নীলকমল নৌ পুলিশকে ১২শ টাকা, মহনপুর নৌ পুলিশকে ১৫ শত টাকা কন্ট্রাক করে জেলেরা তাদের নৌকা নিয়ে মেঘনা নদীতে ইলিশ মাছ ধরছে। নৌ পুলিশ সব জেলে নৌকাকে একটি করে স্লিপ দেয়। অভিযানের সময় নৌ পুলিশ কোন নৌকা ধরলে তাদেরকে সেই স্লিপ দেখালে ছেড়ে দেয়। পুলিশকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হয়।
এছাড়া হাইমচর থানা পুরানবাজার ফাড়িঁ পুলিশকে দালালের মাধ্যমে প্রতিদিন টাকা দিয়ে আড়ৎদাররা নদীর পারে মাছ বিক্রী করে থাকে। পুরানবাজার দোকানঘর রামদাসদী খাল ও সাখুয়া খালের ৩০/৪০ জেলে নৌকা থেকে পুলিশের নামে দুই দালাল টাকা উঠিয়ে নিয়ে ভাগভাটওয়ারা করে নেয়। যারা টাকা না দেয় শুধু তাদের নৌকা ও মাছ দাললরা পুলিশদের দিয়ে আটক করায়।
জানা যায়, ২২ দিনের অভয়াশ্রম শুরু হবার পরেই পুরানবাজার রনাগোয়াল খালে আড়ৎদার রফিক শেখ, শাহজাহান গাজি, জানু মাস্টার, ভুট্টু,লিটন গাজির মাধ্যমে ২০/৩০ টি জেলে নৌকা মাছ নিধন করে।
দোকানঘর রামদাসদী খাল ও সাখুয়া খালের ৩০/৪০ টি নৌকা মাছ নিধন করে।
সেই নৌকার মাছ বিক্রী করে আড়ৎদার আসলাম মাজি, নান্টু, ইসমাইল মিজি, মিজান পাটওয়ারী সহ আরো কয়েকজন।
বহরিয়ার মাছের সবচেয়ে বড় আড়ৎদার ছলেমান মাঝি,হাবিল মিজির ছেলে মুকছুদ,সহিদ বেপারি,কালু মাজির মাধ্যমে প্রায় ৬০/৭০ জন জেলে নদীতে মা ইলিশ নিধন করে নদীর পারে এসে পাইকারদের কাছে বিক্রী করে।
হরিনা ও লক্ষীপুর গ্রাম সংলগ্ন নন্দশখার খাল,নন্দিগো খাল, আখন্দ ঘাট মধ্য বাখরপুর খাল থেকে ৫০/৬০ টি জেলে নৌকা নদিতে নেমে কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ নিধন করে জেলেরা নিজেরাই নদীর পাড়ে এসে পাইকারদের কাছে মাছ বিক্রি করে।
এছাড়া রাজরাজেশ্বর লগ্মিমারার চর আনন্দবাজার ও সহ সবগুলো চর এলাকায় শতাধিক জেলেরা নৌকা নিয়ে অবস্থান করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনির অবস্থান নিশ্বিত হয়ে নদীতে মা ইলিশ নিধন করে।
চরাঞ্চলে বরফ না পাওয়ায় তারা লবন দিয়ে ইলিশ মাছ সংরক্ষন করে থাকে।
আলুরবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ফাঁড়ির পাশে একটি খাল থেকে জেলেরা নৌকা নিয়ে মাছ ধরার জন্য যাচ্ছে। নদীর পাড়ে মা ইলিশ কিনার জন্য শত শত ক্রেতা জরো হয়ে আছে। ইলিশ আসলেই পাইকাররা মাছ আড়ৎদারের কাছ থেকে ক্রয় করে বিভিন্ন বাড়িতে নিয়ে কেজি হিসেবে বিক্রি করছে।
এসময় কয়েকজন জেলে জানায়, আলুরবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এসআই শহিদুল ইসলাম প্রতি নৌকা থেকে ২ হাজার টাকা নেয়। টাকা দেওয়ার পরে জেলেরা মাছ ধরতে নদীতে যায়। নৌ পুলিশের সহযোগিতায় একমাত্র জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে সাহস পায়। এসআই শহিদুল এই কয়েকদিন প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা জেলেদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে।
এদিকে এসআই শহিদুল ইসলাম চাঁদপুর মাদ্রাসারোড নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে ইনচার্জ হিসেবে থাকা অবস্থায় কোড়ালিয়া রোডে নারী কেলেঙ্কারীর ঘটনায় স্থানীয় জনতার হাতে আটক হয়ে টাকা জরিমানা করেছে। পরে সেখান থেকে বদলি হওয়ার পরে আলুবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে যোগদান করে। তার পর থেকে সে লাখ লাখ টাকা মালিক হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আসাদুল বাকীর সাথে আলাপকালে তিনি জানান, চাঁদপুরে মতলবের ষাটনল থেকে হাইমচরের কাটাখালি পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার এলাকা এ অভয়াশ্রমের অন্তর্ভূক্ত। আর এর মধ্যে ৫১ হাজার ১শ’ ৯০ জন জেলে রয়েছে। আমরা মৎস্য অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও কোষ্ট গার্ড সহ যৌথ ভাবে চারটি টিম দিনে রাতে এ অভয়াশ্রম এলাকায় অভিযান অব্যহত রাখছে।
যে সব জেলেরা অভয়াশ্রমের নদীতে মাছ ধরবে তাদের আটক করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে।
এদিকে সরকার ইলিশ প্রজনন রক্ষায় নদীতে ২২ দিন অভয়াশ্রম ঘোষনা করেছে তা মাছ নিধন করার কারনে এই উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। সরকারের উদ্দেশ্য সফল করতে হলে চাঁদপুরের মেঘনা নদীর তীরে সব গুলো খালের মুখে পুলিশ পাহাড়া রাখতে হবে। যাতে করে জেলেরা নৌকা নিয়ে খাল থেকে বের হতে না পারে। তাহলেই মা ইলিশ রক্ষা পাবে ও ২২ দিন অভয়াশ্রম সফল করা সম্ভব হবে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।
