শওকত আলী ঃ
চাঁদপুরে ধর্মীয় উৎসবগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ও ঘটাও করে পালন করা হয় প্রতি বছরই। এসব উৎসবগুলোতে স্নাতন ধর্মীয় যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা যেভাবে পালন করে, তার সাথে অন্য ধর্মের যুবক যুবতীসহ অন্যান্য ব্যক্তিরা ব্যাপক সহযোগিতা করে থাকে। এমনকি তারা নিজেরাও উৎসবগুলোতে অংশগ্রহণ করে উৎসবকে সাফল্য মণ্ডিত করে থাকে। যা’ অন্য জেলায় দেখা যায় না। এখানে ধর্ম নিয়ে তেমন একটা বাড়াবাড়ি ও দ্বন্ধের সৃষ্টি হয় না। সংখ্যালঘুদেরকে তাদের কাজে সাহস যোগিয়ে থাকে মুসলমান ধর্মের যুবক-যুবতীরা। স্নাতন ধর্ম পালনে গুরুতপূর্ণ ভুমিকা থাকে হিন্দুদের হাতে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা দলিত জনগোষ্ঠীকে ধর্মীয় উচ্চ পর্যায়ের কোন পদে স্থান দিতে দেখা যাচ্ছে না। তাদের প্রতি অনেকটা গুরুত্ব দেন না অন্য ধর্মের লোকেরা। এরা দলিত এদের প্রতি দৃষ্টি ভিন্ন। অনেকটা বৈশম্য সৃষ্টির মতো। এদেরকে ধর্মীয় উৎসবে সমাগম ঘটিয়ে ব্যবহার করা হয় এবং এদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে ধর্মীয় কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় উৎসব পালন করা হয়ে থাকে। দলিত জনগোষ্ঠীর লোকজনকে সাধারণ সদস্য পদ দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করে রাখা হয়ে থাকে বলে অনেকের ধারনা। দলিতরা ধর্মীয় অনুভুতিতে ও স্নাতন ধর্মের প্রতি বেশি আস্তা রয়েছে তাদের। চাঁদপুর শহরের পুরাণবাজার হরিসভা, পালপাড়া, ঘোষপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে দলিত জনগোষ্ঠীর বসবাস করে থাকে। তবে অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা দলিত জনগোষ্ঠীর সাথে চলাফেরা করতে দুরুত্ব বজায় রাখে। তারা তাদের তৈরি খাদ্য সামগ্রী খাওয়া থেকে বিরত থাকে। এতে প্রমানিত হয় এদের মধ্যে ভেদাবেদ রয়েছে। চাঁদপুর শহরে নতুন বাজার, পুরাণবাজার, তালতলা, স্বর্ণখোলা কলোনীসহ বিভিন্ন স্থানে স্নাতন ধর্মাবলম্বি হাজার হাজার মানুষের সাথে দলিত জনগোষ্ঠী একত্রিত হয়ে বসবাস করে এবং পারিবারিক উৎসবসহ সকল উৎসব পালন করে থাকে।
এব্যাপারে কথা হয় চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন রেলওয়ে হরিজন কলোনীর শ্রী শ্রী মহাবীর রাধা কৃষ্ণ মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিধান চন্দ্র দাস (জনি) হরিজনের সাথে। সে জানায় ধর্মীয় উৎসবে দলিত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ অনেক বেশি। ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎসব হচ্ছে দূর্গা পূজা। সে পূজা পালনে দূর্গা মায়ের আগমনির জন্য দলিত জনগোষ্ঠী খুব আগ্রহের সাথে অপেক্ষায় থাকে। দূর্গা পূজা পালনের জন্য অন্যান্য হিন্দু সম্প্রদায়ের চেয়ে বেশি উৎসাহ উদ্দীপনায় পালনের চেষ্টা করে। এ উৎসবে প্রচুর কেনা কাটা করে দলিত পরিবারের লোকেরা। দলিত হরিজন জনগোষ্ঠীর চাঁদপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাথে নিবীর অংশ গ্রহণ রয়েছে। চাঁদপুর শহরে হরিজনরা তিনটি স্থানে বসবাস করে থাকে। পুরাণবাজার হরিজন কলোনী, নতুন বাজার বড় স্টেশন রেলওয়ে হরিজন কলোনী ও তালতলা স্বর্ণখোলা হরিজন কলোনী। পূজা কমিটিতে তিন কলোনী থেকে একজন করে চাঁদপুর জেলা কমিটিতে সাধারণ সদস্য রাখা হয়েছে। যার সংখ্যায় কম। পূজা কমিটিতে আরও অংশগ্রহণ করানোর প্রয়োজন সদর পূজা উদযাপন পরিষদের নির্বাহী সদস্য বিধান চন্দ্র দাস জনি জানান, দলিতরা পূজা উদযাপন পরিষদে বড় পোস্ট নেই। বড় পোস্টে থাকতে তাদের আগ্রহ আছে। সব পূজাই তারা অংশগ্রহণ করে। জেলা কমিটির সাথে তারা পূজার ব্যাপারে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখে। কমিটি থেকে দূরে রাখা চেষ্টা করলেও তারা সু-সংগঠিত থাকার কারণে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ভাল আছে।
পুরাণবাজার হরিজন যুবক্লাবের সভাপতি শ্যামল চন্দ্র দাস হরিজন বলেন ধর্মীয় কর্মকান্ডে দলিত জনগুষ্ঠিকে সকল কাজে ডাকা হলেও তাদেরকে তাদের পুজা কমিটি ও মন্দির কমিটির ভালো কোনো দায়িত্ব অর্পন করা হয় না। যার ফলে এই জনগোষ্ঠি সবসময় অবহেলিত। উৎসবের সময় সকল প্রকার খরচ দলিত জনগোষ্ঠী থেকে নেওয়া হয়। সকল শ্রেণি নেতাদের সাথে আমাদের মিশতে দেয়না পুজা কমিটির লোকজন। আমরা অনেক দুর এ জন্য পিছিয়ে রয়েছি।
বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ চাঁদপুর শাখার সভাপতি বিজন চন্দ্র হরিজন বলেন ধর্মীয় উৎসব আমরা করি নিজেদের মন্দিরে। জেলা পুজা কমিটি বড়ধরণের কোনো মিটিংয়ে আমাদেরকে ডাকেন না। নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে হিন্দু নেতারা আমাদেরকে পালন করতে বলেন। শুধু মিছিল বা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ হলে আমাদেরকে বেশি করে অংশগ্রহণ করার জন্য বলা হয়। অর্থের প্রয়োজন হলে আমাদের কদর বেড়ে যায়। পুজা সহ সকল কার্যক্রম শেষ হলে আমরা হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় নেতাদের কাছ থেকে ছিটকে পড়তে হয়।
পুরান বাজার শীব মন্দির কমিটির সভাপতি কানাই চন্দ্র হরিজন জানান জেলা পুজা কমিটিতে থাকার যোগ্যতা আমাদের থাকার পরও আমাদেরকে কমিটিতে রাখা হয় না। দলিত হওয়ায় স্নাতন ধর্মাবলম্বী লোকেরা আমাদের অবহেলার চোখে দেখে। তাদের আচরণে মনে হয় আমরা অন্যদেশের নাগরিক। তবুও আমরা ধর্মীয় উৎসব করে থাকি এবং স্নাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু ও নেতা সুভাষ চন্দ্র রায়, জীবন কানাই চক্রবর্তী, গোপাল চন্দ্র সাহা, বজবল্লব, এডঃ বিনয় ভূষন মজুমদার, অ্যাডঃ রনজিত রায় চৌধুরীসহ সকল নেতাদের কথা মর্যাদার সাথে শুনি এবং তাদের নির্দেশ পালন করে ধর্মীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাই।

