
মিজান লিটন : ‘পুলিশের গুলি আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে দিলো রে, আমার রতন কই গেলি রে? আমরা যে তোর আশার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছি।’ নিহত রতনের বাবার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলো পুলিশের গুলিতে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের বাখরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হাজি মো. আনোয়ার উল্লাহ মাস্টার ছেলের এই করুণ মৃত্যু কোনমতেই মেনে নিতে পারছেন না। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, ছেলে শিক্ষিত হবে, ভালো চাকরি করবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু হায়নার মতো পুলিশ তার ছেলেকে ছিনিয়ে নিলো তার কাছ থেকে। নিজের শিক্ষকতা জীবনের সঞ্চিত সততা দিয়ে মানুষ করা রতন পরিবারের আর্থিক দৈন্যদশা দূর করবে- এই আশা শেষ হয়ে গেলো মাস্টার আনোয়ারের।
৫ ভাই ২ বোনের মধ্যে রতন ছিলো চতুর্থ। ছেলের এই করুণ মৃত্যুতে বাবা আনোয়ার উল্লাহ মাস্টার শোকে পাগলপ্রায়। কিছুক্ষণ পর-পর ‘রতন তুই কই গেলি রে, আমারে কি কইয়া গেলি, তাড়াতাড়ি ফিরা আসবি।’ এমনি প্রলাপ করছেন রতনের বাবা। তিনি বিচার চাইলেন আল্লাহতায়ালার কাছে। যারা নির্দয়ভাবে রতনকে খুন করলো তাদের বিচারের ভার তুলে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তার কাছে। কারণ, এ পর্যায়ে এ ধরনের রাজনৈতিক হত্যার বিচার আশা করেন না তিনি।
রতনের মা রৌশনা বেগম বিশ্বাস’ই করতে চাইছেন না যে রতন মারা গেছে। তিনি পাগলের মতো বিলাপ করছেন ‘আমার রতন মরে নাই, মরলে আমারে কইয়া যাইতো।’ কিছুক্ষণ পর-পর গগণবিদারী আর্তচিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারান তিনি।
এমনি নিহত রতনের বড় ভাই সেলিম, সুমন, নয়ন কেউ’ই যেন মেনে নিতে পারছে না ভাইয়ের এই করুণ মৃত্যু। তাদের সবারই একই আকুতি কেন এমন হলো? কি অপরাধ ছিল আমার ভাইয়ের?
‘তুই না বলে গেলি, আমি চাঁদপুর গেলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে দিবি। এখন কে দেবে আমাকে’। ভাইয়ের লাশ জড়িয়ে আর্তনাদ করে বলছে পুলিশের গুলিতে নিহত রতনের ছোট ভাই সাদ্দাম হোসেন। কিন্তু তারও অনেক আগে রতন চলে গেছে না ফেরার দেশে।
রতনের বড় দু’বোন সাহিদা ও নূরজাহান ভাইয়ের লাশ দেখে, হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। ভাইয়ের লাশ ধরে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘কি অপরাধ ছিল আমার ভাইয়ের, কেন পুলিশ আমার ভাইকে হত্যা করলো, কোথায় পাব আমাদের আদরের ভাইকে?’
চিৎকার করতে করতে ভাইয়ের লাশ দেখে বার বার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে দু’বোন। চাঁদপুরে মঙ্গলবার পুলিশের গুলিতে নিহত তাজুল ইসলাম পাটওয়ারী রতনের বাড়িতে মঙ্গলবার রাতে লাশ নিয়ে গেলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। লাশের সাথে যাওয়া নেতা-কর্মীসহ আশপাশের মানুষজনও এ সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি।
মঙ্গলবার চাঁদপুর শহরের কালিবাড়ি এলাকায় ১৮ দলের মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে ছাত্রদল কর্মী তাজুল ইসলাম রতন পাটওয়ারী ও আল-আমিন একাডেমির জেএসসি ফলপ্রার্থী সিয়াম হোসেন নিহত হয়। নিহত রতন সদর উপজেলার চান্দ্রা বাখরপুর এলাকার হাজী মো. আনোয়ার উল্লাহ মাস্টারের ছেলে। সে চাঁদপুর সরকারি কলেজের মাস্টার্স শেষ বর্ষের মেধাবী ছাত্র ছিলো।
