শীতের আমেজে গ্রাম-গঞ্জে চলছে
নবান্ন উৎসবব্যস্ত সময় পাড় করছে লেপ তোষক কারীগররা
শওকত আলী ॥
শীত জেঁকে বসছে প্রকৃতিতে। এখন বইছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। কয়েক দিনের মধ্যে শীত আরো তীব্রতা নিয়ে হাজির হবে। সে সময় বিপর্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে জনজীবন। বিশেষ করে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত কয়েক বছরে বাংলায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে। বেড়েছে ঠান্ডাজনিত নানা রোগও। শহর-গ্রাম সবখানেই শীত দারুণ বৈরী বার্তা নিয়ে আসে দরিদ্র মানুষের জন্য।
তাই বলে কি জীবন থেমে থাকে? শীতের এই রুক্ষ্ম রূপের বিপরীতে যে রয়েছে চিরায়ত আনন্দের রূপও! টাটকা শাকসবজি, খেজুরের তাজা রস, ঘরে ঘরে নতুন চালের পিঠা-পুলির জমকালো আয়োজন, আতিথ্য-নেমন্তন্য, গরম চায়ে চুমক দিতে দিতে গ্রামের ছোট্ট দোকানে সরগরম আড্ডা শীতের শত বৈরিতাকে তুচ্ছ করে জীবনের অমোঘ প্রবহমানতাকেই বারবার মনে করিয়ে দেয়।
শীত শুধু যে মানুষের জীবনেই বৈচিত্র আনে তা নয়, রুক্ষ্ম প্রকৃতিতেও আনে ভীষণ স্নিগ্ধ রঙ, রস ও গন্ধ। এখন গ্রামবাংলার যে দিকেই চোখ যায়, হলদে সরিষা ফুলের দিগন্ত জোড়া মাঠ মুগ্ধ করছে মানুষকে। ভোর থেকে কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকা বাংলার সবুজ রং যেমন ধূসর থাকে তেমনি রোদ উঠার সঙ্গে সঙ্গে চোখ ধাঁধাঁনো হলুদ ফুলের মাঠ রঙিন করে তোলে পুরো প্রকৃতি। এতে দর্শকের চোখ জুড়ায়, জুড়ায় মনও। হলুদ সরিষার বিস্তৃর্ণ ক্ষেতে ডানার গুণগুণ গুঞ্জরণে উড়ে মৌমাছির ঝাঁক। আর সেই মৌমাছি ফুলের গায়ে উড়ে উড়ে সঞ্চয় করছে মধু। শীতের শিশির ভেজা ঘাসে পা ভিজিয়ে ক্ষেতের আল ধরে হলুদ মাঠ পেরিয়ে ছুটে চলে দুরন্ত কিশোর-কিশোরীরা। এমন দৃশ্যের সঙ্গে একাত্ম হতে ভ্রমণপিয়াসীও প্রকৃতিপ্রেমিরা ছুটছেন হলদে ফুলের রাজ্যে। নগরের ক্রংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে সামান্য সময়ের জন্য হলেও প্রকৃতির অমন রূপসুধা পান করতে সপরিবারে গ্রাম অভিমুখী হচ্ছেন অনেকেই।
সাধারণত নগরে শীতের পরশটা একটু দেরিতে অনুভূত হলেও এবার প্রায় মাসখানেক আগেই শীতের আমেজ চলে আসে গ্রাম-গঞ্জে। শহরে এবার শীতের সঙ্গে সঙ্গে শীতের দূত- টাটকা সবজি আসতে শুরু করেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে শীতকালীন সবজি মুলা, গাজর, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শালগম, ওলকপি, শিম, পালং, পাতাসমেত পেঁয়াজ ইত্যাদির সমারোহ ঘটেছে কাঁচাবাজারে। যদিও এসবের বাজার এখনো চড়াই।
আমাদের দেশে শীতে তুষারপাত হয় না। শীতের ধবল রূপ এখানে নেই। কুয়াশার ধোঁয়াশা ও আবছায়া ঘোরে সকাল-সন্ধ্যায় দিগন্ত আচ্ছন্ন থাকে। হাড়কাঁপানো শীতও যে কত সুন্দর হতে পারে, তা দেখতে হলে যেতে হবে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে।
এবারের শীতে নতুন ফসল ওঠায় গ্রামের মানুষের নিত্য-অনটনের সংসারেও একটু স্বচ্ছলতার ছোঁয়া লেগেছে। ধান কাটা-মাড়াই, সবজির পরিচর্যা, বাজারজাত করা এসব নিয়ে কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠে চাষী পরিবারে দিনগুলো। অতিথি আপ্যায়নে পিঠাপুলির বিপুল আয়োজনে শীত উদযাপন করছে গ্রামের মানুষরা। সমপ্রীতির বন্ধনে আনন্দে-উৎসবের আমেজে প্রতিটি ঘর ভরে উঠেছে। শহর থেকে দূরে অবস্থিত বিভিন্ন হাওড়, বাউড়, ঝিলে এরই মধ্যে বসত জমিয়েছে বিশ্বের শীত প্রধান দেশ থেকে আসা পরিযায়ী অতিথি পাখিরা। দূর-দূরান্ত থেকে তারা দল বেঁধে আমাদের দেশে আসে একটু উষ্ণতার জন্য। সাইবেরিয়া বা হিমালয় অঞ্চলে যখন ভয়ঙ্কর শীত নামে তখন সেখানকার নানা জাতের পাখপাখালি ডানায় ভর করে চলে আসে আমাদের মতো অপেক্ষাকৃত কম শীতের দেশে। বহু শতাব্দী ধরে চলছে তাদের এই শীতকালীন ভ্রমণ। নদ, চর, হাওর, জলাশয়গুলো মুখর হয়ে ওঠে পরিযায়ী পাখীর কলতানে।
গ্রামজুড়ে বিচিত্র প্রকৃতি ঃ
রহস্যময় কুয়াশায় ছাতিম আর শিউলি ফুলের ঘ্রাণ অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। গ্রামবাংলার টিনের চালে রাতভর টুপটাপ শিশির ঝরে পড়ার শব্দ অপরূপ ব্যঞ্জনা তৈরি করে। ভোরের আলোয় ঝলমল করে ওঠে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু আনে অমুল্য স্নিগ্ধতা। কেবল হলুদ সরিষার ক্ষেত নয়, সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণীর মতোই লাউয়ের প্রতিটি ডগা যেন খিলখিল করে হেসে উঠছে ঘরের মাচায়। আর মাচার নিচে গজিয়ে উঠছে নাদুস-নুদুস হেলেঞ্চা শাক। গ্রামের মাঠঘাট, খাল-বিলে শীত আসে তার রূপের ডালি সাজিয়ে প্রকৃতির হাত ধরে। শিশিরের ভেজা ধানের চিরল পাতা বাতাসে নুয়ে পড়ে, শিশিরে ভিজে লাল টকটকে হয়ে ওঠে চিলেকোঠার টবের লাল গোলাপটিও। শীতের শুষ্ক-রুক্ষ্ম প্রকৃতির অপবাদ ঘোচাতে বিচিত্র রঙের গাঁদা, মল্লিকা, গোলাপ, সূর্যমুখী, ডালিয়া, কসমসের রঙ অপুর্ব জৌলুস এনে দিয়েছে। তবে শীতের স্নিগ্ধতা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে ঘাসে উৎকীর্ণ শিশির বিন্দুতেই।
রাস্তার দু’ধারে সারিবদ্ধ খেজুর গাছ। তাতে ঝুলন্ত মাটির হাঁড়ি। গাছীরা ব্যস্ত খেজুর সংগ্রহের কাজে। খেজুর রসের স্বাদ নিতে পাখিদের পাশাপাশি পিছিয়ে নেই শিশু-কিশোররাও। বছরের অন্য সময় গ্রামে এমন দৃশ্য দেখা মিলে না। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের এ দৃশ্য গ্রাম-বাংলার অতি প্রাচীন। রস সংগ্রহকারী এসব গাছিদের চেষ্টা আর পরিশ্রমই বলে দিচ্ছে প্রকৃতিতে লেগেছে শীতের ছোঁয়া।
এদিকে শীতে শীতবস্ত্র, তোশক লেপের দোকানে ভীর করছে মানুষ। এজন্য জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে লেপ-তোশক তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে।
এদিকে দিনের বেলায় রোদের কারণে আবহাওয়া কিছুটা গরম থাকলেও রাতের বেলায় কুয়াশার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অনেকাংশে বেড়ে যায় ঠান্ডার পরিমাণ। ফলে আক্রান্ত হচ্ছে সর্দিকাশি নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন প্রকার শীতজনিত রোগে শিশুদের পাশাপাশি আক্রান্ত হচ্ছে বয়স্করাও।
শীত মৌসুমের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল শৈশবের কিছু স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা। আমার হৃদয়ে শৈশবে শীতকালের জন্য ছিল এক আলাদা অনুভূতি। কুয়াশার চাঁদরে আবৃত শীতের সকাল! মুখ খুললেই ধোঁয়া বের হওয়া দেখে অবাক হয়ে যাওয়া। ভাপা, চিতই, পাটিসাপটাসহ রকমারি সব পিঠা । ঘুম ভাঙ্গলেও বিছানা ছেড়ে উঠতে না চাওয়া, লেপ কাঁথা কম্বলের সাথে জড়াজড়ি করে থাকা সে এক দারুন মজা।
তবে এই অপরুপ শীতের সৌন্দর্য্যের মহিমায় ভুলে গেলে চলবে না সেই সব ছিন্নমূল মানুষদের কথা যারা একটুকরো শীতের কাপড় বা মাথা গোঁজার ঠাই নেই। তাদের কাছে শীত আনন্দের নয় অভিশাপের। আর তাই সকলে নিজের সাধ্যমত হতদরিদ্র মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে পৃথিবীতে ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবতাকে সুদৃঢ় করি।
